০৪:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আমন মৌসুমে বিএডিসির কর্মবিরতি, সার সরবরাহে বিঘ্নের শঙ্কা জাপানের বন্ডে ৩০ বছরের রেকর্ড, বিশ্বজুড়ে ঋণবাজারে ধস আরও গভীর ফ্ল্যাট ব্যালে জুতার দিন শেষ, শরৎজুড়ে তারকাদের পায়ে এবার হিল ট্রাম্পকে ‘না’ বলার সাহস দেখাতে হবে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে: সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান হেগসেথের সঙ্গে বিরোধ, পদত্যাগ করলেন মার্কিন সেনাসচিব মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত, বাড়ল তেলের দাম; মিশ্র এশিয়ার শেয়ারবাজার স্থানীয় নির্বাচনে জোট নয়, আলাদা প্রার্থী দেবে দলগুলো: গোলাম পরওয়ার যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধ: ট্রাম্পের নীতিতে ভুলের পর ভুল বাংলাদেশে কাতারের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ, স্থগিতাদেশ সেপ্টেম্বরের পরও বহাল প্রিমিয়াম ক্রীড়াপোশাকের বাজারে নতুন অস্ট্রেলীয় ব্র্যান্ডের চ্যালেঞ্জ

চাপে ইউরোপ: শক্তিশালী সেনাবাহিনী চাইলেও খরচের বোঝা নিতে রাজি নন অনেক নাগরিক

রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি এবং ইউরোপের নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আলোচিত। ইউরোপের অধিকাংশ দেশ শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে চাইলেও সেই লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে গেলে কর বৃদ্ধি, সামাজিক খাতে ব্যয় কমানো কিংবা আরও বেশি ঋণ নেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা রাজনৈতিক ও জনসমর্থনের দিক থেকে সহজ নয়।

যুদ্ধের প্রস্তুতিতে বদলে যাচ্ছে ইউরোপ

ইউরোপজুড়ে প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বহু বছর আগে যেসব কারখানা টিকে থাকার জন্য ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছিল, এখন সেগুলো দ্রুত উৎপাদন বাড়াচ্ছে। সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ট্যাংক এবং যুদ্ধজাহাজের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগও দ্রুত বাড়ছে।

নতুন লক্ষ্য অনুযায়ী ইউরোপীয় দেশগুলোকে আগামী বছরগুলোতে জাতীয় আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করতে হবে। এর ফলে প্রতিরক্ষা শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোর অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

Defending Europe with less America – European Council on Foreign Relations

নিরাপত্তা নাকি সামাজিক কল্যাণ

তবে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রশ্নে ইউরোপের ভেতরে মতভেদও স্পষ্ট। অনেক দেশে নাগরিকেরা মনে করছেন, অতিরিক্ত অর্থ যুদ্ধ প্রস্তুতির বদলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় হওয়া উচিত।

বিভিন্ন দেশে প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বড় আকারের বিক্ষোভও হয়েছে। সমালোচকদের মতে, কল্যাণমূলক ব্যয় কমিয়ে সামরিক খাতে অর্থ সরিয়ে নেওয়া সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

তিন ভাগে বিভক্ত ইউরোপ

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপের দেশগুলোকে মোটামুটি তিনটি ভাগে দেখা হচ্ছে।

প্রথম দলে রয়েছে সেই দেশগুলো, যারা দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পথে এগোচ্ছে। রাশিয়ার কাছাকাছি অবস্থান করা দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এদের কেউ নতুন কর আরোপ করছে, আবার কেউ স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় কমিয়ে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াচ্ছে। তুলনামূলক কম ঋণগ্রস্ত কয়েকটি দেশ আবার ঋণ নিয়েও এই ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।

দ্বিতীয় দলে রয়েছে এমন দেশ, যারা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। এসব দেশের সরকারি ঋণ ইতোমধ্যেই বেশি, আবার কর বাড়ানো বা সামাজিক ব্যয় কমানোর পক্ষেও জনসমর্থন কম। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।

A European defence industrial strategy in a hostile world

তৃতীয় দলে রয়েছে এমন কিছু দেশ, যারা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কেউ কম ব্যয়ের বিশেষ অনুমতি নিয়েছে, আবার কেউ হিসাবের কৌশল ব্যবহার করে কাগজে-কলমে ব্যয় বাড়ানোর চিত্র দেখিয়েছে।

দেরি হলে বাড়বে ব্যয়

বিশ্লেষকদের মতে, অনেক দেশ এখন কঠিন সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে একসঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা করলে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাবে। এতে দাম বাড়বে, সরবরাহে বিলম্ব হবে এবং দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও তীব্র হবে।

এর আগে একই ধরনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শেষ সময়ে বড় আকারে কেনাকাটা শুরু হলে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলতেও বেশি সময় লাগে।

রাজনৈতিক বাস্তবতা বড় বাধা

Why is Germany trying to build 'Europe's strongest conventional army'?

প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক বাধাও রয়েছে। একদিকে বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির একটি অংশ সামাজিক খাতে ব্যয় কমানোর বিরোধিতা করছে। অন্যদিকে ডানপন্থী কিছু গোষ্ঠী রাশিয়াকে বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে না। ফলে অনেক সরকারের জন্য প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

একই সঙ্গে যেসব দেশ ঋণের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে চাইছে, তাদের ভবিষ্যতে সুদের চাপ এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তি সরকারি ব্যয়ও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে ইউরোপ এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য থাকলেও সেই নিরাপত্তার মূল্য কে বহন করবে—এই প্রশ্নের সহজ উত্তর এখনও মিলছে না।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

আমন মৌসুমে বিএডিসির কর্মবিরতি, সার সরবরাহে বিঘ্নের শঙ্কা

চাপে ইউরোপ: শক্তিশালী সেনাবাহিনী চাইলেও খরচের বোঝা নিতে রাজি নন অনেক নাগরিক

১২:২৫:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি এবং ইউরোপের নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আলোচিত। ইউরোপের অধিকাংশ দেশ শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে চাইলেও সেই লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে গেলে কর বৃদ্ধি, সামাজিক খাতে ব্যয় কমানো কিংবা আরও বেশি ঋণ নেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা রাজনৈতিক ও জনসমর্থনের দিক থেকে সহজ নয়।

যুদ্ধের প্রস্তুতিতে বদলে যাচ্ছে ইউরোপ

ইউরোপজুড়ে প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বহু বছর আগে যেসব কারখানা টিকে থাকার জন্য ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছিল, এখন সেগুলো দ্রুত উৎপাদন বাড়াচ্ছে। সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ট্যাংক এবং যুদ্ধজাহাজের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগও দ্রুত বাড়ছে।

নতুন লক্ষ্য অনুযায়ী ইউরোপীয় দেশগুলোকে আগামী বছরগুলোতে জাতীয় আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করতে হবে। এর ফলে প্রতিরক্ষা শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোর অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

Defending Europe with less America – European Council on Foreign Relations

নিরাপত্তা নাকি সামাজিক কল্যাণ

তবে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রশ্নে ইউরোপের ভেতরে মতভেদও স্পষ্ট। অনেক দেশে নাগরিকেরা মনে করছেন, অতিরিক্ত অর্থ যুদ্ধ প্রস্তুতির বদলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় হওয়া উচিত।

বিভিন্ন দেশে প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বড় আকারের বিক্ষোভও হয়েছে। সমালোচকদের মতে, কল্যাণমূলক ব্যয় কমিয়ে সামরিক খাতে অর্থ সরিয়ে নেওয়া সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

তিন ভাগে বিভক্ত ইউরোপ

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপের দেশগুলোকে মোটামুটি তিনটি ভাগে দেখা হচ্ছে।

প্রথম দলে রয়েছে সেই দেশগুলো, যারা দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পথে এগোচ্ছে। রাশিয়ার কাছাকাছি অবস্থান করা দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এদের কেউ নতুন কর আরোপ করছে, আবার কেউ স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় কমিয়ে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াচ্ছে। তুলনামূলক কম ঋণগ্রস্ত কয়েকটি দেশ আবার ঋণ নিয়েও এই ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।

দ্বিতীয় দলে রয়েছে এমন দেশ, যারা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। এসব দেশের সরকারি ঋণ ইতোমধ্যেই বেশি, আবার কর বাড়ানো বা সামাজিক ব্যয় কমানোর পক্ষেও জনসমর্থন কম। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।

A European defence industrial strategy in a hostile world

তৃতীয় দলে রয়েছে এমন কিছু দেশ, যারা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কেউ কম ব্যয়ের বিশেষ অনুমতি নিয়েছে, আবার কেউ হিসাবের কৌশল ব্যবহার করে কাগজে-কলমে ব্যয় বাড়ানোর চিত্র দেখিয়েছে।

দেরি হলে বাড়বে ব্যয়

বিশ্লেষকদের মতে, অনেক দেশ এখন কঠিন সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে একসঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা করলে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাবে। এতে দাম বাড়বে, সরবরাহে বিলম্ব হবে এবং দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও তীব্র হবে।

এর আগে একই ধরনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শেষ সময়ে বড় আকারে কেনাকাটা শুরু হলে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলতেও বেশি সময় লাগে।

রাজনৈতিক বাস্তবতা বড় বাধা

Why is Germany trying to build 'Europe's strongest conventional army'?

প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক বাধাও রয়েছে। একদিকে বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির একটি অংশ সামাজিক খাতে ব্যয় কমানোর বিরোধিতা করছে। অন্যদিকে ডানপন্থী কিছু গোষ্ঠী রাশিয়াকে বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে না। ফলে অনেক সরকারের জন্য প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

একই সঙ্গে যেসব দেশ ঋণের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে চাইছে, তাদের ভবিষ্যতে সুদের চাপ এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তি সরকারি ব্যয়ও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে ইউরোপ এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য থাকলেও সেই নিরাপত্তার মূল্য কে বহন করবে—এই প্রশ্নের সহজ উত্তর এখনও মিলছে না।