প্রাণীরা অসুস্থ হলে সব সময় মানুষের মতো চিকিৎসকের কাছে যেতে পারে না। কিন্তু প্রকৃতি যেন তাদের হাতে তুলে দিয়েছে নিজস্ব এক চিকিৎসাব্যবস্থা। ক্ষত সারাতে গাছের পাতা ব্যবহার, শরীরের পরজীবী দূর করতে বিশেষ উদ্ভিদ খাওয়া কিংবা পেটের অস্বস্তি কমাতে মাটি খাওয়া—বন্য প্রাণীদের এমন আচরণ বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিন ধরেই কৌতূহলী করে আসছে।
প্রাণীদের নিজেদের অসুস্থতা বা শারীরিক অস্বস্তি কমাতে উদ্ভিদ, মাটি কিংবা অন্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারের এই আচরণকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘জুফার্মাকোগনসি’। সহজ ভাষায়, এর অর্থ হলো প্রাণীদের নিজেদের জন্য ওষুধ খুঁজে নেওয়ার জ্ঞান।
ক্ষত সারাতে গাছের পাতা ও লালা
ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রার বনাঞ্চলে ওরাংওটাংয়ের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখেছেন। একটি পুরুষ ওরাংওটাং শরীরের ক্ষতস্থানে একটি ঔষধি গাছের পাতা ব্যবহার করেছে। পাতার সঙ্গে লালা মিশিয়ে সেটি শরীরে লাগানোর এই আচরণকে প্রাণীর আত্মচিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গবেষণায় যে উদ্ভিদের কথা এসেছে, সেটি ড্রাসিনা গোত্রের একটি চিরসবুজ উদ্ভিদ। এটি অ্যাসপারাগাস পরিবারের সদস্য। উদ্ভিদটির বিভিন্ন রাসায়নিক গুণ নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে। এতে জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করার পাশাপাশি ছত্রাক প্রতিরোধী ও জারণরোধী বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ওরাংওটাংয়ের আচরণটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ প্রাণীটি সন্তানকে বহন করার সময় শরীরের পেশি ও জোড়ায় অস্বস্তি কমাতেও উদ্ভিদটি ব্যবহার করে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরজীবী তাড়াতেও উদ্ভিদের ব্যবহার
শুধু ওরাংওটাং নয়, আফ্রিকার কিছু শিম্পাঞ্জির মধ্যেও আত্মচিকিৎসার এমন আচরণ দেখা গেছে। পরজীবীর আক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষা করতে তারা বিশেষ ধরনের পাতা খেয়ে থাকে।
ভারতে পরিচিত শালপর্ণী নামের একটি উদ্ভিদও এ ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে। প্রাচীন আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় এই উদ্ভিদ ও এর বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হতো। হাঁপানি, অর্শ ও টাইফয়েডের মতো নানা সমস্যার চিকিৎসায় এর প্রয়োগের উল্লেখ পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, বহু প্রাচীন সময়ে প্রাণীরা যে ধরনের উদ্ভিদ ব্যবহার করে নিজেদের শারীরিক সমস্যা সামলাত, মানুষের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থাতেও তার কিছু প্রতিফলন দেখা গেছে।
ঘাস খাওয়া থেকে মাটি খাওয়া

প্রাণীদের আত্মচিকিৎসা শুধু ঔষধি গাছের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বানর, ভেড়া, কুকুর ও বিড়ালকে অসুস্থতা বা পরজীবী থেকে মুক্তি পেতে ঘাস খেতে দেখা যায়। শরীরের ক্ষতিকর কৃমি বা অন্যান্য পরজীবী দূর করার ক্ষেত্রে এই আচরণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
অনেক প্রাণী আবার মাটি বা কাদার কণাও খায়। শরীরে প্রয়োজনীয় খনিজ গ্রহণ কিংবা পেটের অস্বস্তি ও ক্ষতিকর উপাদান কমানোর সঙ্গে এই আচরণের সম্পর্ক থাকতে পারে। প্রাণীদের মাটি খাওয়ার এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘জিওফ্যাজি’—অর্থাৎ পৃথিবী বা মাটি গ্রহণ।
হাতির মতো বড় প্রাণীকেও বিভিন্ন উদ্ভিদের পাতা চিবিয়ে খেতে দেখা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গাছের পাতা খাওয়ার সঙ্গে শরীরের অস্বস্তি কমানোর সম্পর্ক থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
প্রাণীর চিকিৎসাজ্ঞান থেকেই নতুন ওষুধের সম্ভাবনা
প্রাণীরা কীভাবে নিজেদের অসুস্থতা সামলায়, তা নিয়ে গবেষণার গুরুত্ব শুধু প্রাণীবিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের জন্য নতুন ওষুধ আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও এ ধরনের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
বন্য প্রাণীরা দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের পরিবেশে থাকা উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে আসছে। কোনো নির্দিষ্ট প্রাণী বারবার একটি গাছের পাতা বা শিকড় অসুস্থ অবস্থায় খেলে বিজ্ঞানীদের কাছে সেটি নতুন গবেষণার দরজা খুলে দিতে পারে।
এই কারণেই প্রাণীদের আত্মচিকিৎসার আচরণকে এখন শুধু কৌতূহলের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর সঙ্গে উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণীবিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞান এবং ভবিষ্যতের ওষুধ আবিষ্কারের সম্ভাবনাও জড়িয়ে আছে।
গাছও কিন্তু নীরব নয়
প্রাণীদের তুলনায় উদ্ভিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও রহস্যময়। উদ্ভিদের স্নায়ুতন্ত্র নেই, কিন্তু তারা পরিবেশের পরিবর্তন বুঝতে পারে এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়।
পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে অনেক উদ্ভিদ নিজেদের রক্ষায় রাসায়নিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। তৃণভোজী প্রাণীর আক্রমণ থেকেও তারা নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করে। ফলে উদ্ভিদকে নিছক স্থির ও নিষ্ক্রিয় জীব হিসেবে দেখার ধারণা ক্রমেই বদলে যাচ্ছে।
প্রকৃতি যেন তার প্রতিটি জীবকে টিকে থাকার জন্য আলাদা আলাদা কৌশল দিয়েছে। প্রাণীর আত্মচিকিৎসা সেই বিস্ময়কর কৌশলগুলোরই একটি।
প্রাণীর মনেও সুরের প্রভাব
প্রাণীদের আচরণ নিয়ে গবেষণায় আরও একটি মজার তথ্য উঠে এসেছে। কিছু বানর মানুষের মতো শব্দের ধারাবাহিকতা বা সুরের কাঠামো বুঝতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে মানুষের মতো ছন্দের প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া একই নয়।
কুকুরের ক্ষেত্রেও সংগীতের প্রভাব লক্ষ্য করা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের সংগীত শুনলে তাদের আচরণ, হৃদস্পন্দন ও মানসিক চাপের মাত্রায় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তবে কোন ধরনের সংগীতে কী প্রতিক্রিয়া হবে, তা প্রাণীর ধরন ও ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে।
বিড়ালের ক্ষেত্রে আবার শব্দের প্রতি সংবেদনশীলতা মানুষের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। ফলে প্রাণীদের জন্য পরিবেশ তৈরি করার সময় মানুষের পছন্দের শব্দ বা সংগীতই সব সময় সবচেয়ে উপযোগী নাও হতে পারে।
আশ্রয়কেন্দ্র ও চিকিৎসাকেন্দ্রে বদল আনতে পারে সংগীত
প্রাণীদের মানসিক চাপের বিষয়টিও এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্র, পশু চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা অপরিচিত পরিবেশে থাকা প্রাণীরা সহজেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারে। সেখানে উপযুক্ত ধরনের সংগীত তাদের শান্ত রাখতে সহায়তা করতে পারে।
বিশেষ করে পোষা কুকুরের ক্ষেত্রে মালিকের কণ্ঠস্বর, পরিচিত পরিবেশের পাশাপাশি শান্ত সুরও তাদের মানসিক স্বস্তি দিতে পারে। তাই প্রাণীদের যত্নে শুধু খাবার ও চিকিৎসাই নয়, তাদের মানসিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকৃতির দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাণীরা শুধু আমাদের সহানুভূতির অপেক্ষায় থাকা জীব নয়। নিজেদের শরীর ও পরিবেশ সম্পর্কে তাদের রয়েছে দীর্ঘ বিবর্তনের অভিজ্ঞতা। গাছের পাতা দিয়ে ক্ষত সামলানো থেকে শুরু করে ঘাস খেয়ে পরজীবী দূর করার চেষ্টা—এসব আচরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির ভেতরেই লুকিয়ে আছে বহু প্রাচীন চিকিৎসাজ্ঞান।
মানুষের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যত এগোচ্ছে, প্রাণীদের এই স্বাভাবিক আচরণ ততই নতুন প্রশ্ন তুলছে। হয়তো আগামী দিনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের সূত্রও লুকিয়ে আছে এমন কোনো বনের পাতায়, যা একটি প্রাণী বহু আগেই নিজের প্রয়োজনে চিনে নিয়েছে।
প্রকৃতি আমাদের অনেক আগেই চিকিৎসার ভাষা শিখিয়ে দিয়েছে—এখন বিজ্ঞান সেই ভাষা পড়তে শিখছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















