রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। দুই বৈঠকেই যুদ্ধ, সামরিক সহায়তা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বৈঠক দুটিকে ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেছে হোয়াইট হাউস। একই সময়ে দুই নেতার সফরের পেছনে ছিল প্রয়াত মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে অনুমতি চান জেলেনস্কি
ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। রাশিয়ার ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়ে আসছে।
জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেনের মাটিতে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে যৌথ উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ট্রাম্প বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বৈঠকটি খুব ভালো হয়েছে বলে জানান। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইউক্রেনকে নতুন সামরিক সহায়তার বিষয়ে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
রুশ হামলা ঠেকাতে বাড়ছে ইউক্রেনের চাপ
রাশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ড্রোনের পাশাপাশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে প্যাট্রিয়ট অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
একটি প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা একই সময়ে একাধিক লক্ষ্য শনাক্ত ও অনুসরণ করতে পারে। তবে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের আনুমানিক মূল্য ৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
ইউক্রেনের সামরিক নেতৃত্বের হিসাবে, রুশ হামলা মোকাবিলায় তাদের প্রায় ২৫টি প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। দেশটির নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হলে সরবরাহের ওপর বিদেশি নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে ইউক্রেনে এসব ব্যবস্থা কোথায় উৎপাদন করা হবে এবং রাশিয়ার নজর এড়িয়ে কত দ্রুত উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে—তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।
রুশ জ্বালানির ক্রেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ

জেলেনস্কি ওয়াশিংটনে কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতার সঙ্গেও বৈঠক করেন। এর আগে মার্কিন সিনেটে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ক্রেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন দেখা যায়।
জেলেনস্কি এই উদ্যোগকে ইউরোপ ও ইউক্রেনের জন্য বড় ধরনের সমর্থনের বার্তা হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, রুশ জ্বালানি বাণিজ্যের ওপর চাপ বাড়ানো যুদ্ধের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরান নিয়ে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর আলোচনা
জেলেনস্কির বৈঠকের পর হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নেতানিয়াহু। তাদের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কেও কিছুটা টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং যুদ্ধবিরতি নিয়ে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।
বৈঠকের পর নেতানিয়াহু বলেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে—এ বিষয়ে দুই নেতার অভিন্ন লক্ষ্য রয়েছে। আলোচনাটিকে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার অন্যতম সেরা কথোপকথন বলেও উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পও বৈঠকটিকে খুব ভালো বলে মন্তব্য করেছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে নতুন উত্তেজনা
নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার খবর আসে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানি বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর আকস্মিক হামলার চেষ্টা করেছিল। তবে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় ড্রোন হামলার অভিযোগে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পূর্ব ইরাকে মার্কিন ও সৌদি বাহিনী অভিযান চালিয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কি ও নেতানিয়াহুর পৃথক বৈঠক সেই দুই সংকটের গুরুত্বই নতুন করে সামনে এনেছে।
ইউক্রেনের জন্য প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের অনুমতি বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হবে এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















