ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের অর্থায়নে পরিচালিত প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা দুর্বল করা। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠীর হামলায় বহু মার্কিন সেনা নিহত ও আহত হয়েছেন। তবে রাশিয়া যদি ইরানকে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করে থাকে, সেই অভিযোগের প্রতি ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র দপ্তরের ভিন্ন অবস্থান
গত সপ্তাহে সিনেটের এক শুনানিতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, চীন ও রাশিয়া এমন কিছু উপায়ে ইরানকে সহায়তা করছে, যা তেহরানের কর্মকাণ্ডকে সক্ষম করে তুলছে।
এর দুই দিন পর রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ বিষয়ে করা প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি।
এরপর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেগসেথের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি জানান, তাঁর বিশ্বাস রাশিয়া ও চীন ইরান যুদ্ধের অংশ নয় এবং দুই দেশের নেতারা তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন যে তারা তেহরানকে অস্ত্র বিক্রি করছে না। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তিনি তাদের কথায় আস্থা রাখেন। যদিও তিনি স্বীকার করেন, কিছু সীমিত সহযোগিতা থাকতে পারে, তবে তা বড় আকারের নয় বলে তাঁর ধারণা।
স্যাটেলাইট তথ্য সরবরাহের অভিযোগ

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া ইরানকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহ করেছে।
সোমবার এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প অভিযোগটির গুরুত্ব কমিয়ে দেখান। তাঁর মতে, এমন তথ্যের প্রভাব খুব বেশি হতো না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, অভিযোগটি সত্য কি না, তা জানতে তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে জিজ্ঞাসা করবেন।
তবে বিষয়টি নতুন নয়। চলতি বছরের মার্চের শুরুতেই একাধিক মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, রাশিয়া ইরানকে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে। পরে নিউইয়র্ক টাইমসও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের বিশ্বাসের কথা প্রকাশ করে যে, মস্কো ইরানকে ড্রোন ও ড্রোনের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে। যদিও ক্রেমলিন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আগেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া
মার্চে প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়েও ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি এমন কোনো তথ্য পাননি। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, অভিযোগ সত্য হলেও যুদ্ধের ফলাফলে তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিটও সে সময় বলেন, অভিযোগটি সত্য কি না, সেটি বড় বিষয় নয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আলোচক স্টিভ উইটকফ জানান, তিনি রাশিয়াকে জোরালোভাবে সতর্ক করেছিলেন যাতে তারা ইরানকে লক্ষ্য নির্ধারণসংক্রান্ত তথ্য বা অন্য কোনো সহায়তা না দেয়। তবে ট্রাম্প নিজে প্রকাশ্যে একই ধরনের কঠোর অবস্থান নেননি।

প্রথম মেয়াদের ঘটনার সঙ্গে মিল
সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্সির সময়ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে পুরস্কার ঘোষণা বা ‘বাউন্টি’ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
ট্রাম্প তখন দাবি করেছিলেন, তাঁকে এ বিষয়ে মৌখিকভাবে অবহিত করা হয়নি এবং তিনি প্রতিবেদনটিকে ‘ভুয়া খবর’ বলেও অভিহিত করেছিলেন। পরে তিনি স্বীকার করেন, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপে বিষয়টি তোলেননি।
যদিও পরবর্তী সময়ে বাইডেন প্রশাসন জানায়, সিআইএ ওই গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে কেবল ‘নিম্ন থেকে মাঝারি মাত্রার’ আস্থা পেয়েছিল, তবু সম্ভাবনাটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।
বর্তমান বিতর্কে সমালোচকদের বক্তব্য, রাশিয়া যদি সত্যিই ইরানকে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করে থাকে, তাহলে ট্রাম্পের সংযত প্রতিক্রিয়া মস্কোর কাছে এমন বার্তা দিতে পারে যে এই ধরনের পদক্ষেপ তাঁর প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট ‘লাল রেখা’ নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















