উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসবাদ-সম্পর্কিত কনটেন্ট অপসারণে ব্যর্থতার অভিযোগে জনপ্রিয় বার্তাবিনিময় প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রামের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটির ই-নিরাপত্তা কমিশনার জুলি ইনম্যান-গ্রান্ট অভিযোগ করেছেন, বারবার সতর্ক করার পরও টেলিগ্রাম এমন বহু ভিডিও ও কনটেন্ট সরিয়ে নিতে দেরি করেছে, যেগুলো বিশ্বের কয়েকটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত।
তিনি বলেন, অনলাইন নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী প্রতিটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব ব্যবহারকারীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু টেলিগ্রাম সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠানটিকে সর্বোচ্চ ৫ কোটি ৪৬ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার জরিমানা গুনতে হতে পারে।
“কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়”
জুলি ইনম্যান-গ্রান্ট বলেন, “কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।” তাঁর মতে, অনলাইনে সন্ত্রাসবাদ-সমর্থক বা উগ্রবাদী কনটেন্ট দীর্ঘ সময় ধরে উন্মুক্ত থাকলে তা শুধু সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলে না, বরং নতুন করে মানুষকে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এমন কনটেন্ট সহজেই খুঁজে পাওয়া গেলে তা তরুণ ব্যবহারকারীসহ সাধারণ মানুষের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্ল্যাটফর্ম হামলার পরিকল্পনা বা সমন্বয়ের জন্যও ব্যবহার করা হতে পারে।
এক বছরের বেশি সময় ধরে নজরদারি
ই-নিরাপত্তা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকেই টেলিগ্রামের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তারা কীভাবে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদী কনটেন্ট দমন করছে। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ মাস প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে কার্যকর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
পরে টেলিগ্রাম কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ শুরু করলেও কমিশনের দাবি, প্ল্যাটফর্মটিতে এখনও এমন একটি পরিবেশ রয়েছে যেখানে উগ্রবাদী কনটেন্ট খুব সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। ফলে ব্যবহারকারীরা এসব সহিংস ভিডিও ও প্রচারণার মুখোমুখি হচ্ছেন।
যেসব ভিডিও নিয়ে আপত্তি
অস্ট্রেলিয়ার অভিযোগে বলা হয়েছে, টেলিগ্রামে এমন কিছু ভিডিও দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছিল, যার মধ্যে রয়েছে ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে হামলার ভিডিও, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো শহরের বন্দুক হামলার দৃশ্য এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের ভিডিও।
কর্তৃপক্ষের মতে, এ ধরনের কনটেন্ট কেবল অতীতের সহিংস ঘটনাকে ছড়িয়ে দেয় না, বরং উগ্রবাদী প্রচারণাকেও শক্তিশালী করে।
টেলিগ্রামের বক্তব্য
/file/dailymaverick/wp-content/uploads/2024/08/GettyImages-2168604017.jpg)
সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে টেলিগ্রাম। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেছেন, সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত কনটেন্ট মোকাবিলায় তাদের বিস্তৃত ব্যবস্থা রয়েছে এবং এ বিষয়ে তাদের কার্যক্রম সবার জানা। তিনি জানান, আদালতে তারা এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করবে।
সেবা বন্ধের পথও খোলা
জুলি ইনম্যান-গ্রান্ট বলেন, অস্ট্রেলিয়া সরাসরি কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বার্তাবিনিময় প্ল্যাটফর্মকে লাইসেন্স দেয় না। তবে প্রয়োজন হলে ফেডারেল আদালতের কাছে আবেদন করে কোনো সেবার কার্যক্রম বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত এমন ক্ষমতা কখনও ব্যবহার করা হয়নি। তবে আদালতের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয় এবং পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপর ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
আগেও জরিমানার মুখে পড়েছিল টেলিগ্রাম

এটি টেলিগ্রামের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ব্যবস্থা নয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিশু নির্যাতন এবং উগ্রবাদী কনটেন্ট মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে নির্ধারিত সময়ে তথ্য না দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার জরিমানা করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে
শুধু অস্ট্রেলিয়াই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও টেলিগ্রামের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সম্প্রতি রাশিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে ফ্রান্সেও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমনে পর্যাপ্ত নজরদারি না করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা বার্তাবিনিময় প্ল্যাটফর্মগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। অস্ট্রেলিয়ার এই মামলা সেই বৈশ্বিক বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















