গভীর ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ উঠে বসা, চোখ বড় বড় করে চিৎকার করা, আতঙ্কিত আচরণ কিংবা শরীরের অস্বাভাবিক নড়াচড়া—এমন ঘটনা অনেকের কাছেই দুঃস্বপ্নের মতো মনে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর পরিচিত নাম ‘নাইট টেরর’। এটি সাধারণ দুঃস্বপ্ন বা ঘুমের মধ্যে হাঁটার মতো নয়; বরং গভীর ঘুমের একটি বিশেষ পর্যায়ে ঘটে যাওয়া ভিন্ন ধরনের ঘুমজনিত সমস্যা।
ফরাসি দৈনিক ল্য মোঁদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ১৫ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময় নাইট টেররের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এটি দেখা যায়, যদিও হার তুলনামূলকভাবে কম—প্রায় ২.২ শতাংশ।
গভীর ঘুমেই শুরু হয় আতঙ্ক
প্যারিসের পিতিয়ে-সালপেত্রিয়ের হাসপাতালের ঘুমজনিত রোগ বিভাগের প্রধান ইসাবেল আরনুলফের ভাষ্য অনুযায়ী, নাইট টেররের ঘটনা সাধারণত রাতের প্রথম ভাগে, গভীর স্লো-ওয়েভ ঘুম থেকে বেরিয়ে আসার সময় হঠাৎ শুরু হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি আচমকা উঠে বসতে পারেন, চোখ খোলা থাকতে পারে, জোরে চিৎকার করতে পারেন বা আতঙ্কগ্রস্ত আচরণ করতে পারেন।
প্রতিবেদনে একটি তরুণীর ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। গভীর ঘুমে থাকা অবস্থায় তিনি হঠাৎ বিছানায় উঠে বসেন, চোখ বিস্ফারিত করে চিৎকার শুরু করেন এবং দুই হাত দিয়ে নিজের চুল বারবার আঁচড়াতে থাকেন, যেন মাথা থেকে কোনো ভয়ঙ্কর প্রাণী সরানোর চেষ্টা করছেন। চিকিৎসকদের মতে, এটি নাইট টেররের একটি আদর্শ উদাহরণ।
ঘুম পরীক্ষায় যা ধরা পড়ে
এই ধরনের একটি ঘটনা ঘুম পর্যবেক্ষণের সময় ভিডিওতে ধারণ করা হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় একই সঙ্গে হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, পেশির কার্যকলাপ, চোখের নড়াচড়াসহ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় সূচক পর্যবেক্ষণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাইট টেরর শুরু হওয়ার ঠিক আগে শরীরে তীব্র শারীরবৃত্তীয় উত্তেজনা তৈরি হয়। স্নায়ুতন্ত্র সম্ভাব্য বিপদের সংকেত অনুভব করলে যে স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, তার অংশ হিসেবেই হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে যায়, রক্তনালি সংকুচিত হয় এবং চোখের মণি প্রসারিত হতে পারে। এই পরিবর্তনের পরই আতঙ্কজনক আচরণ দেখা দিতে পারে।

নাইট টেরর, দুঃস্বপ্ন ও ঘুমের মধ্যে হাঁটার পার্থক্য
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাইট টেররকে অনেক সময় ঘুমের মধ্যে হাঁটা বা দুঃস্বপ্নের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু এদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ঘুমের মধ্যে হাঁটার সময় আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত শান্তভাবে চলাফেরা করেন। অন্যদিকে নাইট টেররে আচরণ হয় হঠাৎ, তীব্র এবং ভীতিকর। এতে চিৎকার, আতঙ্ক বা অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখা দিতে পারে।
এ কারণে নাইট টেররকে ঘুমজনিত অন্যান্য সমস্যার সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। চিকিৎসকদের মতে, এটি গভীর ঘুমের নির্দিষ্ট পর্যায়ে ঘটে যাওয়া একটি স্বতন্ত্র অবস্থা, যা শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও প্রাপ্তবয়স্কদেরও আক্রান্ত করতে পারে।
রাতের আতঙ্ক বা নাইট টেরর সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















