০৮:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
পারি মনির ধর্ষণচেষ্টা মামলা: ৩০ নভেম্বর ফের জেরার মুখোমুখি অভিনেত্রী কিছুই ঘটবে না—এই বাজি কি ফেডের জন্য বিপজ্জনক? ৪৩ বছর বয়সেও ‘চিরকিশোর’ রাজনীতিক! জ্যাক পোলানস্কিকে ঘিরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক হরমুজ ও লোহিত সাগরের ঝুঁকি বাড়তেই বিশ্বজুড়ে তেল পাইপলাইনে বিনিয়োগের হিড়িক চাঁদের মাটিতে রকেট, পৃথিবীতে ধাক্কা—মাস্কের মহাকাশ সাম্রাজ্য নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন শঙ্কা জাপানকে ঘিরে চীনের আগ্রাসী চাপ, আসল লক্ষ্য কি যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় আধিপত্য? দক্ষিণ কোরিয়ার প্রসাধনী শিল্পে টিএসএমসির কৌশল, যেভাবে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনে বিশ্বজয় গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান ইসরায়েলের, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার নয় দ্বৈত কৌশলগত সিদ্ধান্ত: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সংঘাত নয়, শান্তির পথ বেছে নেওয়ার সময় গ্র্যামির ‘এশিয়ান পপ’ খাঁচায় বিটিএসকে বন্দি করা কি সত্যিই স্বীকৃতি?

হলিউডে এআইয়ের নতুন যুগ: সিনেমা বানানো থেকে তারকাদের পরিচয়—সবকিছুতেই বদলের হাওয়া

হলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমন নিয়ে উত্তেজনা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে ভয়, সন্দেহ ও তীব্র বিরোধিতাও। একদিকে অনেক নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী আশঙ্কা করছেন, এই প্রযুক্তি একদিন মানুষের সৃজনশীলতা, অভিনয় এবং কাজের জায়গা দখল করে নিতে পারে। অন্যদিকে চলচ্চিত্র শিল্পের ভেতরে নীরবে এমন এক পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতিমধ্যে সিনেমা তৈরির নানা ধাপে ব্যবহৃত হচ্ছে।

চিত্রনাট্য লেখা, নির্মাণের পরিকল্পনা, দৃশ্য তৈরি, সম্পাদনা, পুরোনো ফুটেজের নতুন ব্যবহার—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিটির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বাড়ছে। ফলে হলিউডের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঠেকানো যাবে কি না, তা নয়; বরং মানুষের সৃজনশীলতার সঙ্গে এই প্রযুক্তির সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হবে।

ধর্মঘটের ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে হলিউডের বর্তমান বিতর্কের পেছনে ২০২৩ সালের অভিনয়শিল্পী ও চিত্রনাট্যকারদের ধর্মঘটের বড় ভূমিকা রয়েছে। সে সময় শিল্পীদের অন্যতম উদ্বেগ ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে চিত্রনাট্য তৈরি করা হবে এবং অভিনয়শিল্পীদের মুখ, কণ্ঠ বা শারীরিক অবয়বের কৃত্রিম প্রতিরূপ তৈরি করে তাদের অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা হবে।

সেই সময় থেকেই হলিউডে প্রযুক্তিটির বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমতে থাকে। এখনও অনেক নির্মাতা প্রকাশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমালোচনা করছেন।

‘ব্যাকরুমস’ চলচ্চিত্রের পরিচালক কেন পারসনস সম্প্রতি বলেছেন, সুযোগ পেলে তিনি যেন আঙুলের চুটকিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অদৃশ্য করে দিতে চাইতেন। আর ‘দ্য অডিসি’ চলচ্চিত্রের পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান প্রযুক্তিটিকে ‘ট্রোজান হর্স’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তিটির পক্ষে যারা প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্য নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

Hollywood is entering its AI era

প্রকাশ্যে আপত্তি, আড়ালে ব্যাপক ব্যবহার

কিন্তু হলিউডের দৃশ্যমান বিতর্কের আড়ালে বাস্তবতা অনেকটাই আলাদা। বড় বড় স্টুডিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।

নেটফ্লিক্স চলতি বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ইন্টারপজিটিভ অধিগ্রহণ করেছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারে। পরে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, চলতি বছরই প্রায় ৩০০টি নির্মাণকাজে কোনো না কোনোভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়েছে।

জুনে গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগার ডিপমাইন্ড চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এটুয়েন্টিফোরে প্রায় সাড়ে সাত কোটি ডলার বিনিয়োগ করে। এর উদ্দেশ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যবহারের জন্য নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরঞ্জাম তৈরি করা।

অর্থাৎ প্রযুক্তিটিকে নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, হলিউডের অর্থনীতি এবং নির্মাণব্যবস্থায় এটি ইতিমধ্যে প্রবেশ করেছে।

অভিনেতাদের কি সত্যিই সরিয়ে দেবে এআই?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সবচেয়ে বড় ভয়গুলোর একটি হলো, ভবিষ্যতে বাস্তব অভিনেতাদের প্রয়োজন কমে যাবে কি না।

এখন পর্যন্ত অবশ্য এমন কোনো শক্ত প্রমাণ নেই যে অদূর ভবিষ্যতে কৃত্রিম অভিনেতারা বাস্তব অভিনেতাদের জায়গা পুরোপুরি নিয়ে নেবে। গত বছর কৃত্রিমভাবে তৈরি অভিনেত্রী টিলি নরউডকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা ও আতঙ্ক তৈরি হলেও বিষয়টি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়েই রয়েছে।

নেটফ্লিক্সের সহপ্রধান টেড সারানডোসের বক্তব্য, ভালো কিছু তৈরি করতে এখনো প্রয়োজন ভালো শিল্পীর। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই বাস্তবতাকে বদলে দিচ্ছে না। বরং এটি নির্মাতাদের নিজেদের কল্পনাকে আরও কার্যকরভাবে পর্দায় তুলে ধরার জন্য উন্নত সরঞ্জাম দিচ্ছে।

এই ধারণার সঙ্গে একমত অনেক নির্মাতাও। তাদের মতে, ক্যামেরা, কম্পিউটার বা ডিজিটাল সম্পাদনা যেমন মানুষের সৃজনশীলতার বিকল্প হয়নি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও তেমনভাবে মানুষের জায়গা নেওয়ার বদলে নতুন সহায়ক প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে।

বিপজ্জনক দৃশ্যেও এআইয়ের ব্যবহার

এরই মধ্যে কিছু নির্মাতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করছেন।

পরিচালক জন আরউইন তাঁর নতুন চলচ্চিত্র ‘ইয়ং ওয়াশিংটন’-এ একটি ভয়ংকর পানির স্রোতের দৃশ্য তৈরি করতে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করেছেন। দৃশ্যটিতে ৫০ ফুট গভীর একটি খাদের ওপর প্রবল পানির স্রোত দেখানো হয়েছে।

এর ফলে অভিনেতাদের বাস্তবে বিপজ্জনক স্টান্ট করতে হয়নি। এমন দৃশ্য আগে তৈরি করতে বড় সেট, বিশেষ প্রভাব, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দীর্ঘ সময়ের শুটিং প্রয়োজন হতে পারত।

আরউইনের কাছে প্রযুক্তিটির এই সম্ভাবনা এতটাই আকর্ষণীয় যে তিনি রাত জেগেও এর নানা ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা চালান।

Survey: 22% of Consumers Say Gen AI Could Create Better Shows, Movies

অর্ধেক খরচে অর্ধেক সময়ে কাজ?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় সুবিধা হিসেবে যে বিষয়টি সামনে আসছে, সেটি হলো সময় ও অর্থ সাশ্রয়।

নেটফ্লিক্সের ‘দ্য আমেরিকান এক্সপেরিমেন্ট’ নামের তথ্যচিত্রধর্মী ধারাবাহিকে প্রায় ১৭ মিনিটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-উন্নত দৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ঐতিহাসিক যুদ্ধের দৃশ্যও রয়েছে।

নেটফ্লিক্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রচলিত বিকল্প পদ্ধতির তুলনায় এসব দৃশ্য প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত এবং অর্ধেক খরচে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

আরেকটি পরীক্ষায় মাত্র ১০ সেকেন্ডের একটি দৃশ্য তৈরি করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সময় লেগেছে প্রায় চার মিনিট। দৃশ্যটিতে ব্রিটিশ পুলিশ একজন কৃত্রিম অভিনেতাকে গ্রেপ্তার করছে।

বাস্তবে একই দৃশ্য কোনো স্থানে গিয়ে শুট করতে প্রায় অর্ধেক দিন লেগে যেতে পারত। অবশ্য পেশাদার মানের একটি দৃশ্য তৈরির ক্ষেত্রে সফটওয়্যার দিয়ে একাধিকবার চেষ্টা করতে হতে পারে। ফলে প্রযুক্তিটি এখনই প্রচলিত শুটিংয়ের সম্পূর্ণ বিকল্প নয়।

হলিউডের ব্যয়বহুল ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা

হলিউডে চলচ্চিত্র নির্মাণের খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ায় প্রযোজকেরা ঝুঁকি নিতে আগের চেয়ে বেশি সতর্ক। বড় বাজেটের চলচ্চিত্র ব্যর্থ হলে ক্ষতির পরিমাণও বিশাল।

এ কারণেই একই গল্পের পরবর্তী কিস্তি, পুনর্নির্মাণ বা জনপ্রিয় চরিত্রের ওপর নির্ভরশীল চলচ্চিত্রের সংখ্যা বাড়ছে। নির্মাতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই ব্যয়বহুল কাঠামো বদলে দিতে পারে।

কম খরচে দৃশ্য তৈরি করা গেলে ছোট বাজেটের গল্প নিয়েও কাজ করার সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পরীক্ষামূলক নির্মাণের ঝুঁকিও কমতে পারে।

তবে এর বিপরীত আশঙ্কাও রয়েছে।

নিম্নমানের কনটেন্টের বন্যার ভয়

প্রযুক্তি যত সহজলভ্য হবে, তত বেশি মানুষ খুব অল্প সময়ে ভিডিও তৈরি করতে পারবেন। এতে একদিকে সৃষ্টিশীলতার সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে নিম্নমানের কৃত্রিম কনটেন্টের বিশাল স্রোত তৈরি হতে পারে।

চীনে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়া স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটক ও অতিরঞ্জিত গল্পনির্ভর ভিডিওকে অনেকেই এর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে খুব দ্রুত এসব ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।

তবে টেলিভিশন প্রযোজক ইভান শাপিরো মনে করেন, এই ধরনের নিম্নমানের কনটেন্ট হলিউডকে ধ্বংস করবে না। দর্শক শেষ পর্যন্ত ভালো গল্প, ভালো অভিনয় ও মানসম্পন্ন নির্মাণের প্রতিই আকৃষ্ট থাকবে।

ইউটিউব ও টিকটকের সঙ্গে পাল্লা

হলিউডের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে দর্শকের পরিবর্তিত অভ্যাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা।

ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম এখন মানুষের বিনোদনের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ দর্শকেরা দীর্ঘ চলচ্চিত্র বা ধারাবাহিক দেখার পাশাপাশি ছোট ভিডিওতে বেশি সময় দিচ্ছেন।

একটি হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের সাতটি বড় বাজারে ১৩ থেকে ৫৪ বছর বয়সী দর্শকেরা এখন ইউটিউব দেখার পেছনে ডিজনি, ফক্স, প্যারামাউন্ট, এনবিসিইউনিভার্সাল ও ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির সম্মিলিত কনটেন্ট দেখার চেয়েও বেশি সময় ব্যয় করছেন।

এই বাস্তবতা হলিউডকে পুরোনো কনটেন্ট নতুনভাবে পরিবেশনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

পুরোনো সিনেমা-ধারাবাহিকেও নতুন জীবন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পুরোনো ধারাবাহিকের দীর্ঘ পর্বকে ছোট ছোট দৃশ্যে ভাগ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক একটি নতুন প্রতিষ্ঠান স্টুডিওগুলোকে পুরোনো ধারাবাহিকের দৃশ্য আলাদা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে সহায়তা করছে।

এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি বিশেষ সুবিধা হলো, আড়াআড়ি পর্দার ভিডিওকে মুঠোফোনে দেখার উপযোগী লম্বা পর্দার ভিডিওতে দ্রুত রূপান্তর করা যায়।

ফলে বহু বছর আগের একটি ধারাবাহিকও নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে নতুনভাবে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে।

তারকারাও এখন সুযোগ দেখতে শুরু করেছেন

২০২৩ সালের ধর্মঘটের সময় অভিনয়শিল্পীদের অন্যতম ভয় ছিল নিজেদের মুখ ও কণ্ঠের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো। এখন পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে।

প্রতিভাবান ও জনপ্রিয় অনেক অভিনেতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তবে তাদের প্রধান শর্ত হলো, প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিল্পীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

শিল্পী প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থাগুলোর মতে, এই ব্যবস্থায় তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সম্মতি, নিয়ন্ত্রণ ও পারিশ্রমিক।

অর্থাৎ কোনো শিল্পীর মুখ, কণ্ঠ বা পরিচিতি কৃত্রিমভাবে ব্যবহার করার আগে তাঁর অনুমতি থাকতে হবে। ব্যবহারের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে এবং সেই ব্যবহারের জন্য যথাযথ অর্থ দিতে হবে।

কপিরাইট নিয়ে নতুন সংঘাত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের সঙ্গে কপিরাইটের প্রশ্নও আরও জটিল হয়ে উঠছে।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে টম ক্রুজ ও ব্র্যাড পিটকে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ভবনের ছাদে লড়াই করতে দেখা যায়—এমন একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু ভিডিওটি আসলে বাস্তব শুটিংয়ের ফল ছিল না। এটি তৈরি করা হয়েছিল বাইটড্যান্সের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

এরপর ডিজনি, প্যারামাউন্ট এবং চলচ্চিত্র শিল্পের একটি বড় সংগঠনসহ কয়েকটি পক্ষ বাইটড্যান্সের কাছে চিঠি পাঠিয়ে কথিত কপিরাইট লঙ্ঘন বন্ধ করার দাবি জানায়।

বাইটড্যান্স অবশ্য মেধাস্বত্বকে সম্মান করার কথা জানিয়ে প্রযুক্তিটিতে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করে।

বড় প্রযুক্তি কোম্পানিরও বড় স্বার্থ

হলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের সঙ্গে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থও জড়িয়ে আছে।

অ্যামাজন একই সঙ্গে চলচ্চিত্র স্টুডিও, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং ক্লাউড অবকাঠামোর মাধ্যমে বিনোদন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এর ক্লাউড সেবা বিশ্বের বড় বড় স্টুডিওকে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো সরবরাহ করে।

অ্যামাজনের একজন নির্বাহী বিনোদন শিল্পে তাদের ক্লাউড অবকাঠামোকে ‘অদৃশ্য মেরুদণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভিডিও তৈরিতে বিপুল কম্পিউটার শক্তি প্রয়োজন। তাই চলচ্চিত্র শিল্পে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি বিশাল তথ্যকেন্দ্রগুলোর ব্যবসাও বাড়তে পারে।

গুগলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘পাংকি ডাক’ নিয়ে বিতর্ক

হলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো ‘পাংকি ডাক’ নামের একটি অ্যানিমেশন প্রকল্প।

অ্যামাজন ও MGM এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সমর্থিত অ্যানিমেশন প্রকল্পকে অনুমোদন দেওয়ার পর মাত্র দুই দিনের মধ্যে এর পরিচালক প্রকল্পটি ছেড়ে দেন। তিনি হুমকির মুখে পড়েছিলেন বলে জানা যায়।

ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে হলিউডে শুধু নৈতিক বা সৃজনশীল বিতর্কই নেই; এর সঙ্গে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও পেশাগত ঝুঁকিও জড়িয়ে পড়ছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তিও একসময় বিতর্কিত ছিল

হলিউডের ইতিহাস বলছে, নতুন প্রযুক্তির প্রতি প্রথমে ভয় বা বিরোধিতা থাকলেও সময়ের সঙ্গে সেটিই স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে।

পরিচালক জন আরউইন যখন ১৯৯০-এর দশকে চলচ্চিত্র জগতে কাজ শুরু করেন, তখন তিনি ৩৫ মিলিমিটারের প্রায় ৩ লাখ ডলারের ক্যামেরার বদলে ৩ হাজার ডলারের ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করেছিলেন।

সে সময় প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনেকে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে চলচ্চিত্রের শিল্পমানের জন্য হুমকি মনে করতেন।

আজ ডিজিটাল প্রযুক্তি ছাড়া আধুনিক চলচ্চিত্র নির্মাণ কল্পনা করাই কঠিন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও হয়তো একই ঘটনা ঘটতে পারে।

ভবিষ্যতের হলিউড কেমন হবে?

‘স্টার ওয়ার্স’-এর স্রষ্টা জর্জ লুকাস মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব নয়। তাঁর যুক্তি, একসময় ঘোড়ার গাড়ির চেয়ে গাড়ি বেশি বিপজ্জনক—এই যুক্তিতে অনেকে গাড়ির বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত থামেনি।

হলিউডেও হয়তো একই বাস্তবতা অপেক্ষা করছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো আগামী দিনে সব অভিনেতাকে প্রতিস্থাপন করবে না, সব চিত্রনাট্যকারের কাজ কেড়ে নেবে না এবং পরিচালককে অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে না। বরং এটি মানুষের সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের নতুন ভাষা তৈরি করতে পারে।

তবে সেই ভবিষ্যৎ কতটা ইতিবাচক হবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ম, শিল্পীদের অধিকার, কপিরাইট সুরক্ষা এবং মানুষের সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ কতটা বজায় থাকে তার ওপর।

হলিউডের জন্য তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর দূরের কোনো ভবিষ্যৎ নয়। এটি ইতিমধ্যেই চলচ্চিত্র শিল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। সামনে হয়তো প্রযুক্তিটিকে প্রত্যাখ্যান করার চেয়ে তাকে কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা যায়, সেই প্রশ্নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

হলিউডের একসময়কার ভয় হয়তো শেষ পর্যন্ত তার নতুন শক্তিতে পরিণত হবে। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়ে উঠতে পারে এমন এক হাতিয়ার, যার সাহায্যে কম সময়ে, কম খরচে এবং আরও বিস্তৃত কল্পনাকে পর্দায় তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।

হলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে এই প্রতিবেদনটি এখন মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক পাঠকের জন্যও সহজে ব্যবহারযোগ্য।

হলিউডে শুরু হয়ে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন যুগ!

চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে বিপজ্জনক দৃশ্য তৈরি, সম্পাদনা, পুরোনো সিনেমার নতুন ব্যবহার—সব ক্ষেত্রেই ঢুকে পড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। একসময় যে প্রযুক্তিকে হলিউডের অনেকেই হুমকি মনে করেছিলেন, এখন সেই প্রযুক্তিই হয়ে উঠছে সময় ও খরচ কমানোর নতুন হাতিয়ার।

কিন্তু প্রশ্নও কম নয়—এআই কি একদিন অভিনেতা ও নির্মাতাদের জায়গা নেবে? শিল্পীদের মুখ ও কণ্ঠের অধিকার কে রক্ষা করবে? আর কৃত্রিম ভিডিওর বন্যায় কি হারিয়ে যাবে আসল সৃজনশীলতা?

জনপ্রিয় সংবাদ

পারি মনির ধর্ষণচেষ্টা মামলা: ৩০ নভেম্বর ফের জেরার মুখোমুখি অভিনেত্রী

হলিউডে এআইয়ের নতুন যুগ: সিনেমা বানানো থেকে তারকাদের পরিচয়—সবকিছুতেই বদলের হাওয়া

০৬:২৮:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

হলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমন নিয়ে উত্তেজনা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে ভয়, সন্দেহ ও তীব্র বিরোধিতাও। একদিকে অনেক নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী আশঙ্কা করছেন, এই প্রযুক্তি একদিন মানুষের সৃজনশীলতা, অভিনয় এবং কাজের জায়গা দখল করে নিতে পারে। অন্যদিকে চলচ্চিত্র শিল্পের ভেতরে নীরবে এমন এক পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতিমধ্যে সিনেমা তৈরির নানা ধাপে ব্যবহৃত হচ্ছে।

চিত্রনাট্য লেখা, নির্মাণের পরিকল্পনা, দৃশ্য তৈরি, সম্পাদনা, পুরোনো ফুটেজের নতুন ব্যবহার—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিটির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বাড়ছে। ফলে হলিউডের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঠেকানো যাবে কি না, তা নয়; বরং মানুষের সৃজনশীলতার সঙ্গে এই প্রযুক্তির সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হবে।

ধর্মঘটের ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে হলিউডের বর্তমান বিতর্কের পেছনে ২০২৩ সালের অভিনয়শিল্পী ও চিত্রনাট্যকারদের ধর্মঘটের বড় ভূমিকা রয়েছে। সে সময় শিল্পীদের অন্যতম উদ্বেগ ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে চিত্রনাট্য তৈরি করা হবে এবং অভিনয়শিল্পীদের মুখ, কণ্ঠ বা শারীরিক অবয়বের কৃত্রিম প্রতিরূপ তৈরি করে তাদের অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা হবে।

সেই সময় থেকেই হলিউডে প্রযুক্তিটির বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমতে থাকে। এখনও অনেক নির্মাতা প্রকাশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমালোচনা করছেন।

‘ব্যাকরুমস’ চলচ্চিত্রের পরিচালক কেন পারসনস সম্প্রতি বলেছেন, সুযোগ পেলে তিনি যেন আঙুলের চুটকিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অদৃশ্য করে দিতে চাইতেন। আর ‘দ্য অডিসি’ চলচ্চিত্রের পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান প্রযুক্তিটিকে ‘ট্রোজান হর্স’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তিটির পক্ষে যারা প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্য নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

Hollywood is entering its AI era

প্রকাশ্যে আপত্তি, আড়ালে ব্যাপক ব্যবহার

কিন্তু হলিউডের দৃশ্যমান বিতর্কের আড়ালে বাস্তবতা অনেকটাই আলাদা। বড় বড় স্টুডিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।

নেটফ্লিক্স চলতি বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ইন্টারপজিটিভ অধিগ্রহণ করেছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারে। পরে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, চলতি বছরই প্রায় ৩০০টি নির্মাণকাজে কোনো না কোনোভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়েছে।

জুনে গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগার ডিপমাইন্ড চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এটুয়েন্টিফোরে প্রায় সাড়ে সাত কোটি ডলার বিনিয়োগ করে। এর উদ্দেশ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যবহারের জন্য নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরঞ্জাম তৈরি করা।

অর্থাৎ প্রযুক্তিটিকে নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, হলিউডের অর্থনীতি এবং নির্মাণব্যবস্থায় এটি ইতিমধ্যে প্রবেশ করেছে।

অভিনেতাদের কি সত্যিই সরিয়ে দেবে এআই?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সবচেয়ে বড় ভয়গুলোর একটি হলো, ভবিষ্যতে বাস্তব অভিনেতাদের প্রয়োজন কমে যাবে কি না।

এখন পর্যন্ত অবশ্য এমন কোনো শক্ত প্রমাণ নেই যে অদূর ভবিষ্যতে কৃত্রিম অভিনেতারা বাস্তব অভিনেতাদের জায়গা পুরোপুরি নিয়ে নেবে। গত বছর কৃত্রিমভাবে তৈরি অভিনেত্রী টিলি নরউডকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা ও আতঙ্ক তৈরি হলেও বিষয়টি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়েই রয়েছে।

নেটফ্লিক্সের সহপ্রধান টেড সারানডোসের বক্তব্য, ভালো কিছু তৈরি করতে এখনো প্রয়োজন ভালো শিল্পীর। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই বাস্তবতাকে বদলে দিচ্ছে না। বরং এটি নির্মাতাদের নিজেদের কল্পনাকে আরও কার্যকরভাবে পর্দায় তুলে ধরার জন্য উন্নত সরঞ্জাম দিচ্ছে।

এই ধারণার সঙ্গে একমত অনেক নির্মাতাও। তাদের মতে, ক্যামেরা, কম্পিউটার বা ডিজিটাল সম্পাদনা যেমন মানুষের সৃজনশীলতার বিকল্প হয়নি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও তেমনভাবে মানুষের জায়গা নেওয়ার বদলে নতুন সহায়ক প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে।

বিপজ্জনক দৃশ্যেও এআইয়ের ব্যবহার

এরই মধ্যে কিছু নির্মাতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করছেন।

পরিচালক জন আরউইন তাঁর নতুন চলচ্চিত্র ‘ইয়ং ওয়াশিংটন’-এ একটি ভয়ংকর পানির স্রোতের দৃশ্য তৈরি করতে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করেছেন। দৃশ্যটিতে ৫০ ফুট গভীর একটি খাদের ওপর প্রবল পানির স্রোত দেখানো হয়েছে।

এর ফলে অভিনেতাদের বাস্তবে বিপজ্জনক স্টান্ট করতে হয়নি। এমন দৃশ্য আগে তৈরি করতে বড় সেট, বিশেষ প্রভাব, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দীর্ঘ সময়ের শুটিং প্রয়োজন হতে পারত।

আরউইনের কাছে প্রযুক্তিটির এই সম্ভাবনা এতটাই আকর্ষণীয় যে তিনি রাত জেগেও এর নানা ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা চালান।

Survey: 22% of Consumers Say Gen AI Could Create Better Shows, Movies

অর্ধেক খরচে অর্ধেক সময়ে কাজ?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় সুবিধা হিসেবে যে বিষয়টি সামনে আসছে, সেটি হলো সময় ও অর্থ সাশ্রয়।

নেটফ্লিক্সের ‘দ্য আমেরিকান এক্সপেরিমেন্ট’ নামের তথ্যচিত্রধর্মী ধারাবাহিকে প্রায় ১৭ মিনিটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-উন্নত দৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ঐতিহাসিক যুদ্ধের দৃশ্যও রয়েছে।

নেটফ্লিক্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রচলিত বিকল্প পদ্ধতির তুলনায় এসব দৃশ্য প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত এবং অর্ধেক খরচে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

আরেকটি পরীক্ষায় মাত্র ১০ সেকেন্ডের একটি দৃশ্য তৈরি করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সময় লেগেছে প্রায় চার মিনিট। দৃশ্যটিতে ব্রিটিশ পুলিশ একজন কৃত্রিম অভিনেতাকে গ্রেপ্তার করছে।

বাস্তবে একই দৃশ্য কোনো স্থানে গিয়ে শুট করতে প্রায় অর্ধেক দিন লেগে যেতে পারত। অবশ্য পেশাদার মানের একটি দৃশ্য তৈরির ক্ষেত্রে সফটওয়্যার দিয়ে একাধিকবার চেষ্টা করতে হতে পারে। ফলে প্রযুক্তিটি এখনই প্রচলিত শুটিংয়ের সম্পূর্ণ বিকল্প নয়।

হলিউডের ব্যয়বহুল ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা

হলিউডে চলচ্চিত্র নির্মাণের খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ায় প্রযোজকেরা ঝুঁকি নিতে আগের চেয়ে বেশি সতর্ক। বড় বাজেটের চলচ্চিত্র ব্যর্থ হলে ক্ষতির পরিমাণও বিশাল।

এ কারণেই একই গল্পের পরবর্তী কিস্তি, পুনর্নির্মাণ বা জনপ্রিয় চরিত্রের ওপর নির্ভরশীল চলচ্চিত্রের সংখ্যা বাড়ছে। নির্মাতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই ব্যয়বহুল কাঠামো বদলে দিতে পারে।

কম খরচে দৃশ্য তৈরি করা গেলে ছোট বাজেটের গল্প নিয়েও কাজ করার সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পরীক্ষামূলক নির্মাণের ঝুঁকিও কমতে পারে।

তবে এর বিপরীত আশঙ্কাও রয়েছে।

নিম্নমানের কনটেন্টের বন্যার ভয়

প্রযুক্তি যত সহজলভ্য হবে, তত বেশি মানুষ খুব অল্প সময়ে ভিডিও তৈরি করতে পারবেন। এতে একদিকে সৃষ্টিশীলতার সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে নিম্নমানের কৃত্রিম কনটেন্টের বিশাল স্রোত তৈরি হতে পারে।

চীনে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়া স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটক ও অতিরঞ্জিত গল্পনির্ভর ভিডিওকে অনেকেই এর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে খুব দ্রুত এসব ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।

তবে টেলিভিশন প্রযোজক ইভান শাপিরো মনে করেন, এই ধরনের নিম্নমানের কনটেন্ট হলিউডকে ধ্বংস করবে না। দর্শক শেষ পর্যন্ত ভালো গল্প, ভালো অভিনয় ও মানসম্পন্ন নির্মাণের প্রতিই আকৃষ্ট থাকবে।

ইউটিউব ও টিকটকের সঙ্গে পাল্লা

হলিউডের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে দর্শকের পরিবর্তিত অভ্যাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা।

ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম এখন মানুষের বিনোদনের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ দর্শকেরা দীর্ঘ চলচ্চিত্র বা ধারাবাহিক দেখার পাশাপাশি ছোট ভিডিওতে বেশি সময় দিচ্ছেন।

একটি হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের সাতটি বড় বাজারে ১৩ থেকে ৫৪ বছর বয়সী দর্শকেরা এখন ইউটিউব দেখার পেছনে ডিজনি, ফক্স, প্যারামাউন্ট, এনবিসিইউনিভার্সাল ও ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির সম্মিলিত কনটেন্ট দেখার চেয়েও বেশি সময় ব্যয় করছেন।

এই বাস্তবতা হলিউডকে পুরোনো কনটেন্ট নতুনভাবে পরিবেশনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

পুরোনো সিনেমা-ধারাবাহিকেও নতুন জীবন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পুরোনো ধারাবাহিকের দীর্ঘ পর্বকে ছোট ছোট দৃশ্যে ভাগ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক একটি নতুন প্রতিষ্ঠান স্টুডিওগুলোকে পুরোনো ধারাবাহিকের দৃশ্য আলাদা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে সহায়তা করছে।

এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি বিশেষ সুবিধা হলো, আড়াআড়ি পর্দার ভিডিওকে মুঠোফোনে দেখার উপযোগী লম্বা পর্দার ভিডিওতে দ্রুত রূপান্তর করা যায়।

ফলে বহু বছর আগের একটি ধারাবাহিকও নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে নতুনভাবে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে।

তারকারাও এখন সুযোগ দেখতে শুরু করেছেন

২০২৩ সালের ধর্মঘটের সময় অভিনয়শিল্পীদের অন্যতম ভয় ছিল নিজেদের মুখ ও কণ্ঠের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো। এখন পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে।

প্রতিভাবান ও জনপ্রিয় অনেক অভিনেতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তবে তাদের প্রধান শর্ত হলো, প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিল্পীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

শিল্পী প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থাগুলোর মতে, এই ব্যবস্থায় তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সম্মতি, নিয়ন্ত্রণ ও পারিশ্রমিক।

অর্থাৎ কোনো শিল্পীর মুখ, কণ্ঠ বা পরিচিতি কৃত্রিমভাবে ব্যবহার করার আগে তাঁর অনুমতি থাকতে হবে। ব্যবহারের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে এবং সেই ব্যবহারের জন্য যথাযথ অর্থ দিতে হবে।

কপিরাইট নিয়ে নতুন সংঘাত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের সঙ্গে কপিরাইটের প্রশ্নও আরও জটিল হয়ে উঠছে।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে টম ক্রুজ ও ব্র্যাড পিটকে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ভবনের ছাদে লড়াই করতে দেখা যায়—এমন একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু ভিডিওটি আসলে বাস্তব শুটিংয়ের ফল ছিল না। এটি তৈরি করা হয়েছিল বাইটড্যান্সের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

এরপর ডিজনি, প্যারামাউন্ট এবং চলচ্চিত্র শিল্পের একটি বড় সংগঠনসহ কয়েকটি পক্ষ বাইটড্যান্সের কাছে চিঠি পাঠিয়ে কথিত কপিরাইট লঙ্ঘন বন্ধ করার দাবি জানায়।

বাইটড্যান্স অবশ্য মেধাস্বত্বকে সম্মান করার কথা জানিয়ে প্রযুক্তিটিতে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করে।

বড় প্রযুক্তি কোম্পানিরও বড় স্বার্থ

হলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের সঙ্গে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থও জড়িয়ে আছে।

অ্যামাজন একই সঙ্গে চলচ্চিত্র স্টুডিও, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং ক্লাউড অবকাঠামোর মাধ্যমে বিনোদন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এর ক্লাউড সেবা বিশ্বের বড় বড় স্টুডিওকে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো সরবরাহ করে।

অ্যামাজনের একজন নির্বাহী বিনোদন শিল্পে তাদের ক্লাউড অবকাঠামোকে ‘অদৃশ্য মেরুদণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভিডিও তৈরিতে বিপুল কম্পিউটার শক্তি প্রয়োজন। তাই চলচ্চিত্র শিল্পে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি বিশাল তথ্যকেন্দ্রগুলোর ব্যবসাও বাড়তে পারে।

গুগলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘পাংকি ডাক’ নিয়ে বিতর্ক

হলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো ‘পাংকি ডাক’ নামের একটি অ্যানিমেশন প্রকল্প।

অ্যামাজন ও MGM এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সমর্থিত অ্যানিমেশন প্রকল্পকে অনুমোদন দেওয়ার পর মাত্র দুই দিনের মধ্যে এর পরিচালক প্রকল্পটি ছেড়ে দেন। তিনি হুমকির মুখে পড়েছিলেন বলে জানা যায়।

ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে হলিউডে শুধু নৈতিক বা সৃজনশীল বিতর্কই নেই; এর সঙ্গে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও পেশাগত ঝুঁকিও জড়িয়ে পড়ছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তিও একসময় বিতর্কিত ছিল

হলিউডের ইতিহাস বলছে, নতুন প্রযুক্তির প্রতি প্রথমে ভয় বা বিরোধিতা থাকলেও সময়ের সঙ্গে সেটিই স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে।

পরিচালক জন আরউইন যখন ১৯৯০-এর দশকে চলচ্চিত্র জগতে কাজ শুরু করেন, তখন তিনি ৩৫ মিলিমিটারের প্রায় ৩ লাখ ডলারের ক্যামেরার বদলে ৩ হাজার ডলারের ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করেছিলেন।

সে সময় প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনেকে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে চলচ্চিত্রের শিল্পমানের জন্য হুমকি মনে করতেন।

আজ ডিজিটাল প্রযুক্তি ছাড়া আধুনিক চলচ্চিত্র নির্মাণ কল্পনা করাই কঠিন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও হয়তো একই ঘটনা ঘটতে পারে।

ভবিষ্যতের হলিউড কেমন হবে?

‘স্টার ওয়ার্স’-এর স্রষ্টা জর্জ লুকাস মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব নয়। তাঁর যুক্তি, একসময় ঘোড়ার গাড়ির চেয়ে গাড়ি বেশি বিপজ্জনক—এই যুক্তিতে অনেকে গাড়ির বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত থামেনি।

হলিউডেও হয়তো একই বাস্তবতা অপেক্ষা করছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো আগামী দিনে সব অভিনেতাকে প্রতিস্থাপন করবে না, সব চিত্রনাট্যকারের কাজ কেড়ে নেবে না এবং পরিচালককে অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে না। বরং এটি মানুষের সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের নতুন ভাষা তৈরি করতে পারে।

তবে সেই ভবিষ্যৎ কতটা ইতিবাচক হবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ম, শিল্পীদের অধিকার, কপিরাইট সুরক্ষা এবং মানুষের সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ কতটা বজায় থাকে তার ওপর।

হলিউডের জন্য তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর দূরের কোনো ভবিষ্যৎ নয়। এটি ইতিমধ্যেই চলচ্চিত্র শিল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। সামনে হয়তো প্রযুক্তিটিকে প্রত্যাখ্যান করার চেয়ে তাকে কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা যায়, সেই প্রশ্নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

হলিউডের একসময়কার ভয় হয়তো শেষ পর্যন্ত তার নতুন শক্তিতে পরিণত হবে। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়ে উঠতে পারে এমন এক হাতিয়ার, যার সাহায্যে কম সময়ে, কম খরচে এবং আরও বিস্তৃত কল্পনাকে পর্দায় তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।

হলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে এই প্রতিবেদনটি এখন মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক পাঠকের জন্যও সহজে ব্যবহারযোগ্য।

হলিউডে শুরু হয়ে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন যুগ!

চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে বিপজ্জনক দৃশ্য তৈরি, সম্পাদনা, পুরোনো সিনেমার নতুন ব্যবহার—সব ক্ষেত্রেই ঢুকে পড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। একসময় যে প্রযুক্তিকে হলিউডের অনেকেই হুমকি মনে করেছিলেন, এখন সেই প্রযুক্তিই হয়ে উঠছে সময় ও খরচ কমানোর নতুন হাতিয়ার।

কিন্তু প্রশ্নও কম নয়—এআই কি একদিন অভিনেতা ও নির্মাতাদের জায়গা নেবে? শিল্পীদের মুখ ও কণ্ঠের অধিকার কে রক্ষা করবে? আর কৃত্রিম ভিডিওর বন্যায় কি হারিয়ে যাবে আসল সৃজনশীলতা?