লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকটকে এখন আর কেবল আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগরের নৌপথও বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা ও হুমকির কারণে এই পথ দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবার সৌদি আরব একটি বহুজাতিক নৌজোট গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই জোট কি সত্যিই লোহিত সাগরের নৌপথকে নিরাপদ করতে পারবে?
সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জড়িত থাকার পর এখন রিয়াদকে একই সঙ্গে নিজের নিরাপত্তা, তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে তেহরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিচ্ছে। ফলে বাব আল-মান্দাব থেকে সুয়েজ খাল পর্যন্ত সমুদ্রপথটি শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক চাপ তৈরিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
লোহিত সাগর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
বাব আল-মান্দাব প্রণালি ভারত মহাসাগর ও সুয়েজ খালের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংযোগ তৈরি করেছে। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও কনটেইনারবাহী পণ্য পরিবহন হয়। হরমুজ প্রণালির সংকটের পর এই রুটের ওপর জ্বালানি পরিবহনের নির্ভরতা আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের কনটেইনার পরিবহনের একটি বড় অংশও এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল।
সুতরাং হুতিদের হামলার কারণে যদি জাহাজগুলোকে দীর্ঘতর বিকল্প পথে যেতে হয়, তার প্রভাব শুধু জাহাজ মালিকদের ওপর পড়ে না। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, সরবরাহব্যবস্থায় বিলম্ব তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের দামেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সৌদি জোটের সম্ভাবনা
রিয়াদে সাম্প্রতিক বৈঠকের পর প্রায় ৫০টি দেশ ও সংগঠনের মধ্যে ১৪টি এই নতুন উদ্যোগে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। সম্ভাব্য জোটে রয়েছে মিসর, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো বড় নৌ-সামরিক শক্তি। পাশাপাশি কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডানের মতো আরব দেশগুলোর নৌবাহিনীও এতে যুক্ত হচ্ছে।
এই জোটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে এর বহুজাতিক চরিত্র। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর নৌবাহিনী ইতোমধ্যে যৌথ মহড়া ও অভিযানের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তবে নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব সৌদি আরবকেই নিতে হবে। লোহিত সাগরে দেশটির নৌঘাঁটি ও সরবরাহ অবকাঠামো এই অভিযানের কার্যকর ভিত্তি হতে পারে।
সৌদি নৌবাহিনীর আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ফ্রিগেট, করভেট ও টহলজাহাজ রয়েছে। তাদের বিমানবাহিনীতেও সমুদ্রভিত্তিক অভিযানের সক্ষমতা আছে। তবে একটি বাস্তব সমস্যা রয়েছে—সৌদি নৌবাহিনী পূর্ব ও পশ্চিম দুই বহরে বিভক্ত। পারস্য উপসাগরকেন্দ্রিক পূর্বাঞ্চলীয় বহর এই মুহূর্তে লোহিত সাগরের অভিযানে সরাসরি কাজে লাগানো কঠিন। ফলে জেদ্দাভিত্তিক পশ্চিমাঞ্চলীয় বহরের ওপরই মূল চাপ পড়বে।
মিসর ও তুরস্কের ভূমিকা
লোহিত সাগরের নিরাপত্তায় মিসরের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুয়েজ খাল দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সম্পদ। ফলে নৌপথে অস্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত হলে মিসর সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বে। দেশটির শক্তিশালী নৌবাহিনী, হেলিকপ্টারবাহী জাহাজ ও সাবমেরিন এই জোটকে উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা দিতে পারে।
তুরস্কও এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হতে পারে। দেশটির আধুনিক নৌবহরে সাবমেরিন, ফ্রিগেট ও করভেট রয়েছে। বিশেষ করে উভচর হামলাজাহাজ টিসিজি আনাদোলু বহুজাতিক অভিযানে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। সুয়েজ খাল দিয়ে দ্রুত লোহিত সাগরে প্রবেশের সক্ষমতাও তুরস্ককে কৌশলগত সুবিধা দেবে।
পাকিস্তানেরও রয়েছে কার্যকর নৌ সক্ষমতা। ফ্রিগেট, সাবমেরিন এবং সামুদ্রিক টহলবিমান নিয়ে দেশটি উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক সহযোগিতা করে আসছে।
তবে জোটের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিতিও রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এতে যোগ দেয়নি। অথচ দেশটির আধুনিক করভেট ও টহলজাহাজ লোহিত সাগরের নিরাপত্তা অভিযানে কার্যকর হতে পারত। সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চাপ এই অনুপস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখছে। ওমানও জোটে নেই, যদিও আঞ্চলিক বিরোধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির আলাদা কূটনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
শুধু যুদ্ধজাহাজ দিয়ে সমাধান হবে না
এই জোটের প্রথম প্রয়োজন হবে শক্তিশালী গোয়েন্দা সক্ষমতা। বাব আল-মান্দাব থেকে মধ্য লোহিত সাগর পর্যন্ত হুতিদের নৌ ও ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রমের ধরন বুঝতে হবে। কোথা থেকে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ হচ্ছে, কোন ধরনের জাহাজকে কখন লক্ষ্য করা হচ্ছে এবং হামলার ধরন কী—এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ছাড়া কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইট সক্ষমতা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অপারেশন অ্যাসপিডেসের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বহুজাতিক বাহিনীর জন্য একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড ও গোয়েন্দা সমন্বয় কাঠামোও প্রয়োজন হবে। সেটি জেদ্দার সৌদি নৌঘাঁটিতে অথবা তুরস্কের আনাদোলুর মতো বড় জাহাজে স্থাপন করা যেতে পারে।
এরপর আসবে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা। বড় তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে সশস্ত্র পাহারায় কনভয়ের মাধ্যমে পরিচালনা করা হতে পারে। দ্রুতগতির টহলজাহাজের সঙ্গে অন্তত একটি গাইডেড-মিসাইল ফ্রিগেট থাকলে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। বাণিজ্যিক জাহাজেও সীমিত প্রতিরক্ষা দল রাখা যেতে পারে, যাতে বোর্ডিং বা ছোট আকারের হামলা মোকাবিলা করা যায়।
আমেরিকা ও ইউরোপ কতটা যুক্ত হবে
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সাফল্যের একটি বড় শর্ত হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ভূমিকা। সরাসরি সামরিক নেতৃত্ব না নিলেও গোয়েন্দা তথ্য, যোগাযোগ, সমন্বয় ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় পশ্চিমা শক্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শুধু প্রতিরক্ষামূলক নৌ টহল হুতিদের নিরুৎসাহিত করার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। যদি হামলা অব্যাহত থাকে, তখন ইয়েমেনের ভেতরে হুতিদের ঘাঁটিতে বিমান হামলার প্রশ্ন সামনে আসবে। কিন্তু সেই পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ইরান ও হুতিদের পাল্টা প্রতিক্রিয়া আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার ঝুঁকি তৈরি করবে।
লোহিত সাগরের সংকট তাই একটি সামরিক অভিযানের চেয়ে অনেক বড় বিষয়। সৌদি আরবকে একই সঙ্গে নৌনিরাপত্তা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু হুতিদের হামলা প্রতিহত করা নয়, বরং এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা যাতে বাণিজ্যিক নৌপথ সচল থাকে এবং নতুন করে বড় আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি না বাড়ে।
লোহিত সাগরের পশ্চিম প্রান্তে ইরানকেন্দ্রিক উত্তেজনা যখন আরও তীব্র হচ্ছে, তখন সৌদি আরবের নতুন নৌজোট একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এটি সফল হলে রিয়াদ শুধু নিজের বাণিজ্যিক স্বার্থই রক্ষা করতে পারবে না, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের জন্যও একটি নিরাপদ করিডর পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু ব্যর্থ হলে লোহিত সাগর আরও বড় সামরিক সংঘাতের নতুন মঞ্চে পরিণত হতে পারে।
জেমস স্ট্যাভরিডিস 


















