দুবাইকে নিরাপদ শহর হিসেবে জানেন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। কিন্তু অপরাধীদের জন্য এই শহর যে কোনো নিরাপদ আশ্রয় নয়—সাম্প্রতিক বছরগুলোর কয়েকটি বড় গ্রেপ্তার ও প্রত্যর্পণের ঘটনায় সেটিই আবারও স্পষ্ট হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় থাকা মাদক সম্রাট, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের হোতা ও আন্তর্জাতিক পলাতকদের খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এবং বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে এসব অভিযান পরিচালিত হয়েছে। পরে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অনেককেই প্রত্যর্পণ করা হয়েছে।
বিশ্বের আলোচিত কয়েকজন অপরাধীকে কীভাবে আমিরাতের মাটিতে খুঁজে বের করা হয়েছিল, তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা সামনে এসেছে।
ড্যানিয়েল কিনাহান: মাদক সাম্রাজ্যের অন্যতম হোতা
আয়ারল্যান্ডের পলাতক অপরাধী ড্যানিয়েল কিনাহানকে দুবাই থেকে গ্রেপ্তার করে আইরিশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ, অপরাধী সংগঠন পরিচালনা, হত্যা ও মাদক পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগে তার বিচার হওয়ার কথা রয়েছে।

কিনাহানকে ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র আয়ারল্যান্ডের কুখ্যাত কিনাহান সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের তিন নেতার একজন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তাকে গ্রেপ্তারে তথ্যের জন্য ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
২০১৬ সালে দুবাইয়ে পালিয়ে আসার পর কিনাহান দীর্ঘদিন এখানেই অবস্থান করছিলেন। তার নেতৃত্বাধীন অপরাধচক্র দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আয়ারল্যান্ডে কোকেন ও হেরোইন পাচার দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। পরে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে। মাদক পাচারের পাশাপাশি অর্থপাচার, অস্ত্র পাচার ও হত্যার সঙ্গেও এই চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
শন ম্যাকগভর্ন: রেড নোটিশ প্রকাশের এক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার
কিনাহান চক্রের অন্যতম আলোচিত সদস্য শন ম্যাকগভর্ন এখন আয়ারল্যান্ডের একটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে বন্দি।
২০১৬ সালে প্রতিদ্বন্দ্বী একটি অপরাধচক্রের সদস্যকে হত্যার অভিযোগ এবং একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠী পরিচালনার অভিযোগে তিনি দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের নজরে ছিলেন। পরে তিনি পালিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলে আসেন।
ম্যাকগভর্নের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করার পর দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এর আগে তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য ইন্টারপোল ব্লু নোটিশও জারি করেছিল।
ইন্টারপোলের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের আগে দুবাই পুলিশ, আইরিশ পুলিশ ও ইন্টারপোল কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক বৈঠক হয়েছিল। এই সমন্বিত অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন হারভেস্ট’।

২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর রেড নোটিশ প্রকাশের মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অপরাধীদের বিরুদ্ধে আমিরাতের দ্রুত অভিযানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে আছে।
‘কোকেন কিং’ ওথমান এল বালৌতি
বেলজিয়ামের অন্যতম শীর্ষ আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী ওথমান এল বালৌতিকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচালিত এক দীর্ঘ অভিযানের পর।
বেলজিয়ামের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি হয়েছিল। আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ ও মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে খুঁজছিল বেলজিয়াম।
ইন্টারপোল ও ইউরোপীয় পুলিশের তালিকায় থাকা বালৌতির বিরুদ্ধে বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প বন্দরের মাধ্যমে বিশাল মাদক পাচারচক্র পরিচালনার অভিযোগ ছিল। ইউরোপে মাদক প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে পরিচিত এই বন্দরের সঙ্গে তার অপরাধী নেটওয়ার্কের যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
দুবাই পুলিশ ও আমিরাতের বিচার মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভাগের সমন্বিত অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে দুবাইয়ের পাবলিক প্রসিকিউশনের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বেলজিয়াম ও আমিরাতের মধ্যে ২০২১ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বালৌতিকে আরও দুই উচ্চপ্রোফাইল অপরাধীর সঙ্গে বেলজিয়ামে প্রত্যর্পণ করা হয়।

রাফায়েলে ইম্পেরিয়ালে: ভুয়া পরিচয়েও শেষ রক্ষা হয়নি
ইতালির অন্যতম মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী রাফায়েলে ইম্পেরিয়ালে এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী রাফায়েলে মরিয়েল্লোকে ২০২১ সালের আগস্টে দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
কুখ্যাত কামোরা সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত ইম্পেরিয়ালের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ ছিল। ২০১৬ সাল থেকেই তার নাম ইন্টারপোলের রেড নোটিশ তালিকায় ছিল।
দুবাইয়ে তিনি ভুয়া পরিচয়ে ‘আন্তোনিও রোকো’ নামে বসবাস করছিলেন। নিরাপত্তা সংস্থার নজর এড়াতে গাড়ি পরিবর্তন করে চলাফেরা করতেন এবং নির্জন একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। এমনকি নিজের ঠিকানাও নিবন্ধন করেননি।
কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির কাছে তার কৌশলও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
দুবাই পুলিশের ‘ওয়ুন’ প্রকল্পের স্মার্ট ক্যামেরার বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তার গতিবিধি নজরদারি করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ তার চলাফেরা ও নিরাপত্তা এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল শনাক্ত করে।
অভিযানের চূড়ান্ত মুহূর্তে তার বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, দামি ঘড়ি, মূল্যবান সামগ্রী এবং বেশ কিছু চিত্রকর্মও জব্দ করা হয়।
মাইকেল পল মুগান: আট বছর পর ধরা
যুক্তরাজ্যের অন্যতম আলোচিত কোকেন পাচারকারী মাইকেল পল মুগানকে ২০২১ সালে দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করে। প্রায় আট বছর ধরে তিনি পলাতক ছিলেন।
‘অপারেশন ক্যাপচারা’ অভিযানের অংশ হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আন্তর্জাতিক মাদক পাচারচক্রে জড়িত থাকার অভিযোগে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করার পর তার অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয় আমিরাতের কর্তৃপক্ষ।

রটারডামের একটি ক্যাফেতে অভিযান চালানোর পর তিনি আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। ওই ক্যাফেটি মাদক পাচারকারী ও বিভিন্ন অপরাধীচক্রের বৈঠকের আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছিল। যুক্তরাজ্যে প্রতি সপ্তাহে বিপুল পরিমাণ কোকেন পাচারের একটি বড় পরিকল্পনার সঙ্গেও তার নাম জড়িয়েছিল।
মুগান আমিরাতে প্রবেশের সময় ভিন্ন নাম ও ভিন্ন জাতীয়তা ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু তদন্তকারীরা তার পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হন এবং শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ পলাতক জীবনের অবসান ঘটে।
কীভাবে অপরাধীদের খুঁজে বের করে আমিরাত?
আন্তর্জাতিক অপরাধীদের ধরতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।
ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এ ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও রেড নোটিশ পাওয়ার পর দুবাই ও শারজাহর পুলিশসহ স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সন্দেহভাজন ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করে দ্রুত অভিযান চালায়।
এর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। মাদক পাচার, অর্থপাচার ও আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র ভেঙে দিতে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা ও পুলিশ সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে আমিরাতের কর্তৃপক্ষ।
আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ক্যামেরা এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ও এসব অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ফলে বিশ্বের কোনো প্রান্তে অপরাধ করে দুবাইয়ে এসে আত্মগোপন করলেই যে নিরাপদ থাকা যাবে—সাম্প্রতিক এসব ঘটনা সেই ধারণাকে কার্যত ভেঙে দিয়েছে। বরং আন্তর্জাতিক অপরাধীদের জন্য আমিরাত এখন ক্রমেই এমন এক জায়গা হয়ে উঠছে, যেখানে নিরাপদ আশ্রয়ের আড়ালও প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার চোখ এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















