যুক্তরাষ্ট্রে ভোটার তালিকায় নাম থাকা অ-নাগরিকদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযান আরও জোরদার করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এমনকি কেউ ভুলবশত ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে থাকলেও কিংবা কখনো ভোট না দিলেও তাকে শনাক্ত করে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই পদক্ষেপকে ঘিরে অভিবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনে অ-নাগরিকদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করা বা নির্বাচনে ভোট দেওয়া নিষিদ্ধ। তবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নিরীক্ষা ও গবেষণায় দেখা গেছে, অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি যে অ-নাগরিকদের ভোট কোনো নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভুল করে নিবন্ধিত হলেও ছাড় নেই
অভিবাসন নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের প্রশাসনগুলো সাধারণত কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে ভোটার তালিকায় যুক্ত হলে তার উদ্দেশ্য, বয়স, মানসিক সক্ষমতা ও অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনা করত। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে কর্মকর্তাদের সেই বিবেচনার সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়েছে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
অনেক অভিবাসী আইনজীবীর ভাষ্য, গাড়ির লাইসেন্স নেওয়া বা নবায়নের সময় অসাবধানতাবশত ভোটার নিবন্ধনের ফরমে স্বাক্ষর করে ফেলেছেন এমন ব্যক্তিও এখন আইনি ঝুঁকিতে পড়ছেন। কেউ কেউ ইংরেজিতে দুর্বল হওয়ায় কোন কাগজে কী উদ্দেশ্যে স্বাক্ষর করছেন, তা বুঝতে পারেননি বলেও দাবি করেছেন।
নিউ জার্সির ৬১ বছর বয়সী আলতাগ্রাসিয়া হোয়াইটের ঘটনাটি এমন উদ্বেগের একটি উদাহরণ। তিনি জানান, নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার পর অভিবাসন কর্মকর্তা তাকে জানান যে তিনি ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত। পরে অঙ্গরাজ্যের নথিতে তিনি দেখতে পান, এক দশকেরও বেশি আগে গাড়ির লাইসেন্স নবায়নের সময় তার নামে ভোটার নিবন্ধনের আবেদন করা হয়েছিল।
হোয়াইট দাবি করেছেন, তিনি জানতেন না যে ওই কাগজে স্বাক্ষর করার অর্থ ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত হওয়া। তার বিরুদ্ধে এখন বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সীমান্তেও নজরদারি
অভিবাসন কর্মকর্তারা ভোটার তালিকায় থাকা সন্দেহভাজন অ-নাগরিকদের বিষয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছেন। আইনজীবীদের দাবি, সীমান্ত তল্লাশিচৌকিতেও এমন ব্যক্তিদের আটক করা হয়েছে।
এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা গ্রিন কার্ডধারীদের নাগরিকত্বের আবেদনও ভোটার নিবন্ধনের কারণে আটকে দেওয়া হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বহিষ্কার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের আবদুল্লাহ এমরে বাসারের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি নাগরিকত্বের সাক্ষাৎকারের সময় প্রথম জানতে পারেন যে তার নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে। পরে জানা যায়, ২০১৪ সালে স্থানীয় মোটরযান দপ্তরে ঠিকানা পরিবর্তনের সময় তার নাম নিবন্ধিত হয়েছিল।
বাসার দাবি, তিনি কখনো ভোট দেননি এবং নিজে ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের অনুরোধও করেননি। স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, তার নামে থাকা নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে এবং তার নামে কোনো ব্যালট দেওয়ার রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
তদন্তে অভিবাসন কর্মকর্তাদের নতুন ভূমিকা
ভোটার নিবন্ধন ও নির্বাচনী জালিয়াতির তদন্তে এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ এবং বিচার বিভাগ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এর ফলে অভিবাসন ও সীমান্ত অপরাধ তদন্তে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের একটি অংশকে ভোটার জালিয়াতি খুঁজে বের করার কাজেও যুক্ত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অভিবাসন তদন্তকারী সংস্থাগুলোর প্রচলিত দায়িত্বের তুলনায় বড় ধরনের পরিবর্তন। আগে মানবপাচার, মাদক চোরাচালান ও আন্তঃদেশীয় অপরাধের মতো গুরুতর অপরাধ তদন্তে যেসব কর্মকর্তার মূল দায়িত্ব ছিল, তাদের এখন ভোটার তালিকা যাচাই ও নির্বাচনী অপরাধ অনুসন্ধানেও ব্যবহার করা হচ্ছে।
জুন মাসে ওহাইওর একটি ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংগঠনের কার্যালয়ে তল্লাশির সময় অভিবাসন তদন্তকারীরাও অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কয়েক হাজার নিবন্ধন নিয়ে নিউ জার্সিতে বিতর্ক
নিউ জার্সিতে একটি সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার ৬০০ অ-নাগরিক ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত হয়ে পড়েছিলেন বলে রাজ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৪০০ জন পরে ভোট দিয়েছিলেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে। তবে নিউ জার্সির গভর্নর মিকি শেরিল কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এসব নিবন্ধিত ব্যক্তির নাম হস্তান্তরের দাবির বিরোধিতা করেছেন। তার বক্তব্য, সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে যারা তালিকায় উঠে এসেছেন, তাদের অনেকেরই এতে কোনো দোষ ছিল না।
ভোটার যাচাইয়ের প্রযুক্তি নিয়েও প্রশ্ন
ট্রাম্প প্রশাসন অঙ্গরাজ্যগুলোকে বিপুলসংখ্যক ভোটার তথ্য একটি কেন্দ্রীয় অভিবাসন যাচাই ব্যবস্থায় পাঠানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। এই ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ব্যবহার করে ভোটার তালিকায় অ-নাগরিকদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
তবে সেই যাচাই ব্যবস্থার নির্ভুলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। টেক্সাসে এমন একটি যাচাইয়ের মাধ্যমে ২ হাজার ৭২৪ জন সম্ভাব্য অ-নাগরিক ভোটার শনাক্ত করা হয়েছিল। পরে স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তারা অনুসন্ধান করে দেখতে পান, শনাক্ত হওয়া অনেকেই আসলে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।
অস্টিনের ট্রাভিস কাউন্টিতে স্বাধীন এক তদন্তে দেখা যায়, ওই ব্যবস্থায় অ-নাগরিক হিসেবে শনাক্ত ব্যক্তিদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসলে নাগরিক ছিলেন।
এ ধরনের ভুল শনাক্তকরণ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগকে ঘিরে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে আদালতে একের পর এক বিরোধও তৈরি হয়েছে।
২ লাখ ৫০ হাজারের দাবি নিয়ে প্রশ্ন
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি দাবি করা হয়েছে, চারটি অঙ্গরাজ্যে ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি অ-নাগরিক ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। তবে এই দাবির পক্ষে বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। বরং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বিভাগের কিছু চিঠিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, প্রাথমিক যাচাইয়ের ভিত্তিতে এই সংখ্যা বেশি দেখাতে পারে।
এ নিয়ে প্রশাসনের বক্তব্য এবং স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের তথ্যের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও অঙ্গরাজ্যভিত্তিক তদন্তে অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়ার ঘটনা খুবই সীমিত বলে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তিতে অ-নাগরিকদের ভোটার তালিকা থেকে শনাক্ত ও অপসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্যে অ-নাগরিক ভোটার নিবন্ধনের সংখ্যা অনেক বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিবাসীদের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক
আইনজীবীরা বলছেন, ভোট না দিয়েও শুধু ভোটার তালিকায় নাম থাকার কারণে অনেক গ্রিন কার্ডধারী নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। কারও কারও বিরুদ্ধে বহিষ্কারের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইচ্ছাকৃতভাবে আইন ভেঙে ভোট দেওয়া এবং ভুলবশত ভোটার তালিকায় নাম ওঠার বিষয়কে একইভাবে দেখা হলে বহু নির্দোষ মানুষ গুরুতর আইনি সমস্যায় পড়তে পারেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন অবস্থান তাই শুধু নির্বাচনী নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন বসবাসকারী অভিবাসীদের নাগরিকত্ব, স্থায়ী বসবাসের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তাও তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অ-নাগরিক ভোটার নিবন্ধন নিয়ে অভিযান এখন নির্বাচনী নিরাপত্তার বিতর্কের পাশাপাশি অভিবাসন নীতিরও বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
Sarakhon Report 



















