ব্রিটেনের রাজনীতিতে এবার এক অদ্ভুত নির্বাচনী লড়াই নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। মাথায় রুপালি আবর্জনার ঝুড়ির মতো পোশাক, গায়ে চাদর আর নিজেকে ভিনগ্রহের যোদ্ধা দাবি করা ‘কাউন্ট বিনফেস’ এখন দেশটির ডানপন্থী পপুলিস্ট নেতা নাইজেল ফারাজের সবচেয়ে আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বী।
ইংল্যান্ডের পূর্ব উপকূলের ক্ল্যাকটন আসনে অনুষ্ঠিত বিশেষ সংসদীয় নির্বাচনে ফারাজের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন এই ব্যতিক্রমী প্রার্থী। যদিও ফারাজের বিপুল ব্যবধানে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি, তবু প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জনের কারণে নির্বাচনে কার্যত তার প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছেন কাউন্ট বিনফেস।
কাউন্ট বিনফেস আসলে কোনো ভিনগ্রহের প্রাণী নন। চরিত্রটির আড়ালে রয়েছেন ৪৬ বছর বয়সী লেখক ও কৌতুকশিল্পী জন হার্ভে। বহু বছর ধরে তিনি ব্রিটেনের বিভিন্ন নির্বাচনে এই চরিত্রে অংশ নিয়ে আসছেন। তবে ক্ল্যাকটনের এই নির্বাচন তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ।
ফারাজের বিরুদ্ধে অদ্ভুত প্রতিদ্বন্দ্বিতা
নাইজেল ফারাজ এই নির্বাচনকে ‘জনগণ বনাম প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা’র লড়াই হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তাদের অভিযোগ, ফারাজ নিজের বিরুদ্ধে চলা একটি সংসদীয় তদন্ত থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতেই এই নির্বাচন আয়োজন করেছেন।
ফারাজ গত জুলাইয়ে ক্ল্যাকটনের সংসদীয় আসন থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর একই আসনে আবার নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি এই আসনে ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন।
তার বিরুদ্ধে তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাঁচ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি অর্থ উপহার, যা তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে থাইল্যান্ডভিত্তিক এক ক্রিপ্টোকারেন্সি ধনকুবেরের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, ওই অর্থ তিনি যথাযথভাবে ঘোষণা করেছিলেন কি না।
ফারাজ অবশ্য কোনো অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, ক্ল্যাকটনের জনগণই তার কর্মকাণ্ডের বিচার করবেন।
‘ফারাজ জিতলেও কে আসলে জয়ী?’
কাউন্ট বিনফেস পুরোপুরি নিজের চরিত্রে থেকেই সাক্ষাৎকার দেন। তার ভাষায়, এবারের নির্বাচন তার জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক উৎসব।
তিনি মজা করে বলেন, ফারাজ যদি ৩৩ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়াই করে আগের চেয়েও বড় ব্যবধানে জয়ী হন, তাহলেও প্রশ্ন থাকবে—একজন আবর্জনার ঝুড়ির মতো দেখতে ভিনগ্রহের চরিত্রসহ এত প্রার্থীর বিরুদ্ধে জিতে আসলে কে জয়ী হলো?
ফারাজের দল অবশ্য এই ব্যঙ্গাত্মক যুক্তির সঙ্গে একমত নয়। দলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এর আগে বলেছেন, অন্য দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়নি কারণ তারা ফারাজকে ভয় পাচ্ছে।
ব্রিটিশ রাজনীতিতে হাস্যরসের পুরোনো ঐতিহ্য
ব্রিটেনে নির্বাচনে বিচিত্র পোশাক ও অদ্ভুত নামের প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নতুন কিছু নয়। দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরেই এমন প্রার্থীরা মূলধারার রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করে আসছেন।
ব্রিটিশ ব্যঙ্গাত্মক সাময়িকীর সম্পাদক ইয়ান হিসলপের ভাষায়, রাজনীতিবিদদের ভোট দেওয়ার মতোই তাদের নিয়ে হাসতে পারাটাও গুরুত্বপূর্ণ।
কাউন্ট বিনফেস এর আগেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। লন্ডনের মেয়র নির্বাচনে তিনি বর্তমান মেয়র সাদিক খানের বিরুদ্ধেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। চলতি গ্রীষ্মে মেকারফিল্ডের উপনির্বাচনেও তিনি প্রার্থী ছিলেন। সেখানে লেবার পার্টির প্রার্থী অ্যান্ডি বার্নহামের কাছে তিনি বড় ব্যবধানে হেরে যান। বিনফেস পেয়েছিলেন মাত্র শূন্য দশমিক দুই শতাংশ ভোট।
ব্যঙ্গের আড়ালে গুরুতর রাজনৈতিক বার্তা
জন হার্ভে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। পরে ব্রিটিশ ব্যঙ্গাত্মক অনুষ্ঠানগুলোর লেখক হিসেবে কাজ করেন।
কাউন্ট বিনফেস হিসেবে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোও সাধারণত ব্যঙ্গাত্মক। তিনি অন্তত একটি সাশ্রয়ী বাড়ি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন, যা ধারাবাহিক ব্রিটিশ সরকারগুলোর আবাসন প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার প্রতি কটাক্ষ।
তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন গায়িকা অ্যাডেলকে জাতীয়করণ করার এবং ‘নিজের কর কমিয়ে অন্য সবার কর বাড়ানোর’।
তবে এই হাস্যরসের পেছনে রয়েছে আধুনিক রাজনীতির একটি গুরুতর প্রশ্ন। সব ভোটারকে একসঙ্গে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা কতটা অসম্ভব এবং রাজনীতির অনেক বক্তব্য কীভাবে শেষ পর্যন্ত হাস্যকর হয়ে উঠতে পারে—তারই ব্যঙ্গাত্মক প্রতিফলন কাউন্ট বিনফেসের প্রচারণায়।

‘এটি ফারাজের এলাকা’
ক্ল্যাকটন দীর্ঘদিন ধরেই ফারাজের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের আগে অভিবাসনবিরোধী ও ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী প্রচারণায় ফারাজ এই এলাকার শক্তিশালী সমর্থন পেয়েছিলেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি বিপুল ব্যবধানে আসনটি জয় করেন। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল কনজারভেটিভ পার্টি।
ভোটারদের একটি অংশ অবশ্য এবারের নির্বাচন নিয়ে বিরক্ত। স্থানীয় এক বাগানকর্মী বলেন, তিনি এমন একজন প্রার্থীকে ভোট দিতে চান, যিনি সত্যিই স্থানীয় মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবেন। তার অভিযোগ, ফারাজ ও কাউন্ট বিনফেস—দুজনকেই ঘিরে নির্বাচনটি অনেকটা তামাশায় পরিণত হয়েছে।
তার মতে, এটি কোনো হাসির বিষয় নয়। মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ এর সঙ্গে জড়িত।
পাঁচ শতাংশ ভোট পেলেই সাফল্য
কাউন্ট বিনফেসের আগের সর্বোচ্চ ভোট ছিল ২০২১ সালের লন্ডন মেয়র নির্বাচনে প্রায় এক শতাংশ। ক্ল্যাকটনে এবার পাঁচ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়া তার জন্য বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ সে ক্ষেত্রে নির্বাচনী জামানত হিসেবে জমা দেওয়া ৫০০ পাউন্ড ফেরত পাবেন তিনি।
প্রচারণায় তিনি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে দেখা করেছেন, ভিডিও তৈরি করেছেন এবং ফারাজকে লক্ষ্য করে বেশ কিছু ব্যঙ্গাত্মক প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
তার অন্যতম প্রতিশ্রুতি হলো, কোনো সংসদ সদস্য মাঝপথে পদত্যাগ করলে সেই পদে আয়োজিত বিশেষ নির্বাচনে তার প্রার্থী হওয়া নিষিদ্ধ করা। ফারাজের পদত্যাগকে লক্ষ্য করেই এই বক্তব্য।
তিনি আরও বলেছেন, ফারাজের মতো যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে সময় কাটানোর বদলে তিনি ক্ল্যাকটন-অন-সি এলাকায় বেশি সময় কাটাবেন। পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সি ধনকুবেরদের কাছ থেকে পাঁচ মিলিয়ন পাউন্ডের উপহার গ্রহণ না করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
ফারাজ জিতলেও প্রশ্ন থেকে যাবে
সব হিসাব অনুযায়ী, ফারাজের জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি জনমত জরিপে তার সম্ভাব্য ভোট ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত দেখানো হয়েছে।
তবে নির্বাচনের ফল তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের ভবিষ্যৎ বদলাবে না। উপহারের অর্থ যথাযথভাবে ঘোষণা না করার অভিযোগে তিনি নিয়ম ভেঙেছেন বলে প্রমাণিত হলে সংসদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত হতে পারেন এবং আবারও বিশেষ নির্বাচনের মুখোমুখি হতে পারেন।
কাউন্ট বিনফেসও জানেন, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর তাকে ঘিরে গণমাধ্যমের আগ্রহ কমে যেতে পারে। তবে এবারের প্রচারণা নিয়ে তিনি বেশ আনন্দিত।
তার ভাষায়, এত বড় ‘খাওয়াদাওয়ার উৎসব’ বা প্রচারের সুযোগ আগে কাউন্ট বিনফেস কখনো পাননি।
তবে সব ব্যঙ্গের মধ্যেও তিনি ভোটারদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করার কথা বলেছেন। তার মতে, ফারাজের বক্তব্য নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীর কাছে অত্যন্ত শক্তিশালী। মানুষ যদি তাকে ভোট দিতে চায়, সেটিই গণতন্ত্র।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















