দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের ভূমিকা এবং সেই যুদ্ধের দায়বদ্ধতা নিয়ে দেশটিকে আরও গভীরভাবে অতীতের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা। তাঁর মতে, ইতিহাসের কঠিন অধ্যায় এড়িয়ে গেলে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়।
প্রতি বছর ১৫ আগস্ট এশিয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি নতুন করে সামনে আসে। জাপানে দিনটি যুদ্ধের সমাপ্তি স্মরণের দিন হলেও জাপানের সাবেক উপনিবেশ ও আগ্রাসনের শিকার দেশগুলোতে একই দিন স্বাধীনতা ও মুক্তির স্মৃতি বহন করে। ফলে যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে জাপান ও প্রতিবেশী দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এখনো স্পষ্ট।
লি কুয়ান ইউয়ের প্রশ্ন বদলে দিয়েছিল ইশিবার দৃষ্টিভঙ্গি
ইশিবা জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউয়ের সঙ্গে তাঁর এক সাক্ষাৎ যুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন এনেছিল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালে সিঙ্গাপুরে এক বৈঠকের সময় লি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান সিঙ্গাপুরে কী করেছিল তিনি জানেন কি না।
ইশিবা তখন বিদ্যালয়ে শেখা ইতিহাসের ভিত্তিতে উত্তর দেন। কিন্তু তাঁর উত্তর শুনে লি দুঃখ প্রকাশ করে জানতে চান, তিনি কি এর চেয়ে বেশি কিছু জানেন না। এই ঘটনায় ইশিবা গভীরভাবে বিব্রত হন এবং যুদ্ধকালীন জাপানের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আরও বইপত্র পড়তে শুরু করেন।যুদ্ধের পেছনের কারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন
ইশিবার ইতিহাসবিষয়ক অবস্থান শুধু অনুশোচনায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, জাপান যখন বুঝতে পেরেছিল যে যুদ্ধে পরাজয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, তখন দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব কেন তবুও যুদ্ধের পথে এগিয়ে গেল।
তিনি মনে করেন, যুদ্ধের দিকে জাপানের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে বেসামরিক সরকারের দুর্বলতা, সামরিক বাহিনীর ওপর পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের অভাব, সংসদের কার্যকারিতা কমে যাওয়া, সংবাদমাধ্যমের যুদ্ধপন্থী ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ব্যর্থতার মতো কারণ কাজ করেছিল।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাগিদ
ইশিবার মতে, শুধু আইন বা প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই গণতন্ত্র ও বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হয় না। রাজনীতিবিদদের দায়িত্বশীল থাকতে হবে এবং জনতুষ্টিবাদী চাপের কাছে নতি স্বীকার করা যাবে না। একই সঙ্গে সংসদ ও সংবাদমাধ্যমকে সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ হিসেবে কাজ করতে হবে।
জাপানের যুদ্ধকালীন ইতিহাস নিয়ে ইশিবার এই অবস্থান দেশটির রক্ষণশীল রাজনীতির একটি অংশের সঙ্গে মতপার্থক্যও তৈরি করেছে। তবে তাঁর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—অতীতের ভুল স্বীকার ও সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া ভবিষ্যতের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি।
এশিয়ায় পুরোনো ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি
জাপান অতীতে যুদ্ধ ও উপনিবেশবাদের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করলেও চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত দেশের সঙ্গে ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি। যুদ্ধকালীন নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম এবং অন্যান্য ঘটনাকে ঘিরে প্রশ্ন এখনো দুই পক্ষের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।
ইশিবার বক্তব্য তাই শুধু জাপানের অতীত নিয়ে আত্মসমালোচনা নয়; এটি এশিয়ায় ইতিহাসের স্মৃতি, জাতীয় পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। তাঁর বার্তা হলো, ইতিহাসকে ভুলে যাওয়ার পরিবর্তে তার দিকে সরাসরি তাকিয়েই ভবিষ্যতের পথ তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে জাপানের এই আত্মসমালোচনা এশিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ অতীতকে কীভাবে স্মরণ করা হবে, তার ওপরই অনেক সময় বর্তমান সম্পর্কের বিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি নির্ভর করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















