১১:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
বেস্ট-বিফোর তারিখ পেরোলেই খাবার ফেলে দেবেন না, জানুন কোন খাবার কতদিন ভালো থাকে চোখের সামনে নয়, মনের ভেতরও নয়—প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে জানা ‘অ্যাফ্যান্টাসিয়া’র কথা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন আজ ২০২৯ থেকে বদলাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থবছর, এপ্রিল-মার্চ চক্রে যাচ্ছে সরকার যুদ্ধের দীর্ঘ মিশনে বিপাকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী, নাবিকদের জীবনযাপন ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ ইউরোপীয় অ্যাথলেটিকসে ব্রিটিশদের সোনালি ঝড়, নতুন তারকা অ্যামি হান্ট পাকিস্তানে আরও প্রদেশ? সিদ্ধান্ত নিক জনগণ সিঙ্গাপুরের অর্থনীতিতে বড় গতি, প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৫.৫ শতাংশ; শেয়ারবাজারে ৭,০০০ পয়েন্টের হাতছানি হরমুজের পর বদলে যাচ্ছে তেলের বিশ্বমানচিত্র মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য: বয়সের সঙ্গে ক্ষয় নয়, আগেভাগে যত্ন নেওয়ার নতুন বিজ্ঞান

হরমুজের পর বদলে যাচ্ছে তেলের বিশ্বমানচিত্র

যুদ্ধ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র বদলায় না, জ্বালানি সরবরাহের পথও নতুন করে আঁকে। পারস্য উপসাগরে সাম্প্রতিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা সেই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথগুলোর একটি যখন নিরাপত্তার প্রশ্নে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন তেল আমদানিকারক দেশগুলোর কাছে বিকল্প সরবরাহ আর কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকে না; সেটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে এমন সব দেশ, যাদের এত দিন বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে প্রভাব সীমিত ছিল। দক্ষিণ আমেরিকার গায়ানা তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। মাত্র প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার জনসংখ্যার এই দেশটি এখন প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে। সমুদ্রপথে আটলান্টিকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকায় হরমুজের ঝুঁকি এড়িয়ে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দেশটির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে।

তেলের বাজারে নতুন শক্তির উত্থান

হরমুজ সংকটের তাৎক্ষণিক অভিঘাত ছিল বড়। প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধ-পরবর্তী জ্বালানি সংকটের পর সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি পাঁচ দশকেরও বেশি আগের তুলনায় ভিন্ন। তখন বিকল্প সরবরাহ সীমিত ছিল; এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ আমেরিকা মহাদেশের কয়েকটি দেশ দ্রুত উৎপাদন বাড়িয়েছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বিশেষ করে ফ্র্যাকিং, যুক্তরাষ্ট্রকে আমদানিনির্ভর দেশ থেকে বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্রাজিল, কানাডা, আর্জেন্টিনা ও গায়ানার উৎপাদন বৃদ্ধি। গত দেড় দশকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ব্রাজিল বিশ্বের শীর্ষ দশ তেল রপ্তানিকারকের তালিকায় উঠে এসেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলেও বাজার পুরোপুরি অচল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আগের তুলনায় কমেছে।

ব্রাজিলের গভীর সমুদ্রভিত্তিক তেল উৎপাদন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর চীন ও ভারত দ্রুত ব্রাজিলের দিকে ঝুঁকেছে। চীন এক পর্যায়ে ব্রাজিল থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করেছে। অন্যদিকে গায়ানার মজুত প্রায় ১১ বিলিয়ন ব্যারেল এবং ২০১৯ সালে প্রথম উৎপাদন শুরু হওয়ার পর দেশটির অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। উৎপাদন ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হওয়ারও পূর্বাভাস রয়েছে।

আফ্রিকার নতুন তেল মানচিত্র

একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে। লিবিয়া, নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলা এখনো মহাদেশটির প্রধান তেল উৎপাদক। কিন্তু নামিবিয়া, আইভরি কোস্ট ও সেনেগালের মতো তুলনামূলক নতুন খেলোয়াড়দের গুরুত্ব বাড়ছে।

নামিবিয়ার উপকূলের কাছে আবিষ্কৃত নতুন তেলক্ষেত্রগুলোর মজুত প্রায় ২০ বিলিয়ন ব্যারেল হতে পারে। আইভরি কোস্টের বালেইন ফিল্ডে সম্ভাব্য মজুত ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত হতে পারে। সেনেগালের প্রমাণিত মজুত প্রায় এক বিলিয়ন ব্যারেল। উগান্ডাও প্রায় ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ব্যারেল মজুতের ভিত্তিতে উৎপাদন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই দেশগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ভৌগোলিক অবস্থান। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল মজুত থাকলেও সেখানকার তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ এমন একটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল, যা সামরিক সংঘাতের সময় সহজেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিপরীতে কানাডার ভ্যানকুভার, আর্জেন্টিনার পুয়ের্তো রোসালেস কিংবা তানজানিয়ার তাঙ্গা বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্যাংকারগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও উন্মুক্ত সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে পারে।

হরমুজের ছায়ায় বদলে যাচ্ছে জ্বালানি রাজনীতির মানচিত্র

নিরাপত্তার দামও আছে

তবে বিকল্প সরবরাহের অর্থ সস্তা তেল নয়। নিরাপদ পথের জন্য ক্রেতা ও জাহাজ মালিকদের অতিরিক্ত ব্যয় মেনে নিতে হচ্ছে। আফ্রিকার তেলের প্রতি চীন, ভারত ও জাপানের চাহিদা বেড়েছে। ইউরোপও আফ্রিকা থেকে বিপুল তেল আমদানি করে। কিন্তু এশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা সরবরাহের ওপর চাপ বাড়িয়েছে এবং বছরের বড় অংশজুড়ে দাম তুলনামূলকভাবে বেশি থেকেছে।

এই পরিস্থিতিতে তেল কোম্পানিগুলোও লাভবান হয়েছে। সরবরাহের ঘাটতি ও উচ্চমূল্যের সময়ে বড় কোম্পানিগুলোর মুনাফা বেড়েছে। একই সঙ্গে আমদানিকারক দেশগুলো বুঝতে পারছে, শুধু কম দামে তেল পাওয়া যথেষ্ট নয়; সরবরাহ কতটা নির্ভরযোগ্য, তা-ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মধ্যপ্রাচ্যও বসে নেই

হরমুজের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তাদের তেল শিল্পের ভবিষ্যৎ রক্ষায় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে বিকল্প পাইপলাইন ও বন্দর অবকাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান থেকে ফুজাইরাহ পর্যন্ত পাইপলাইন হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ দেয়। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনও উপসাগর এড়িয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠাতে পারে। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ দিয়ে যে বিপুল পরিমাণ তেল যায়, তার তুলনায় এই বিকল্প পরিবহন সক্ষমতা এখনো অনেক কম। উপরন্তু, বিকল্প অবকাঠামোও হামলার ঝুঁকিমুক্ত নয়।

ইরাকও কয়েকটি বিকল্প রুট পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে—এর মধ্যে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর, তুরস্কের জেইহান এবং জর্ডানের আকাবা বন্দরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। অঞ্চলটিতে বিবেচনাধীন নতুন পাইপলাইনগুলো বাস্তবায়িত হলে ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ হরমুজের ওপর নির্ভরশীল তেলের একটি বড় অংশ বিকল্প পথে সরানো সম্ভব হতে পারে।

কিন্তু ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হবে না। লোহিত সাগরও নিরাপদ নয়। ইয়েমেনভিত্তিক হুথিদের হুমকি এবং সামুদ্রিক বীমার ঝুঁকি নতুন করিডোরগুলোকেও অনিশ্চিত করে তুলছে। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর সবচেয়ে বড় ক্রেতারা এশিয়ায়। তাই তেলকে লোহিত সাগর বা ভূমধ্যসাগরের দিকে ঘুরিয়ে দিলে অনেক ক্ষেত্রে পরিবহনপথ দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হয়ে যায়।

শুধু তেলের বাজার নয়, বদলাচ্ছে ক্ষমতার কাঠামো

হরমুজ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তাই কেবল তেলের দাম দিয়ে বিচার করা যাবে না। এটি বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে নির্ভরতার কাঠামোও বদলাতে পারে।

চীন, ভারত ও জাপানের মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলো ইতোমধ্যে সরবরাহের নতুন উৎস খুঁজছে। একই সময়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ছে। ফলে একদিকে নতুন তেল উৎপাদকরা বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টাও তীব্র হচ্ছে।

এখানেই হরমুজ সংকটের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা। কোনো একটি সংকীর্ণ ভৌগোলিক পথ যদি বিশ্বের জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তবে সেই নির্ভরতা নিজেই একটি কৌশলগত দুর্বলতা। ইরানের হাতে থাকা হরমুজ ছিল সেই দুর্বলতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। এখন যদি উৎপাদক ও ক্রেতারা বিকল্প রুট তৈরি করে, তাহলে সেই চাপ প্রয়োগের ক্ষমতাও কমে যাবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য করেছিল। উপসাগরীয় সংঘাত একইভাবে বিশ্বকে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা দেখিয়েছে—নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহের জন্য শুধু মজুত থাকাই যথেষ্ট নয়, বিকল্প পথও থাকতে হয়।

ফলে হরমুজ হয়তো শেষ পর্যন্ত বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথের মর্যাদা হারাবে না। কিন্তু এর চারপাশে যে বিকল্প নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে, তা তেলের বাজারের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। আগামী দিনের জ্বালানি রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো শুধু সবচেয়ে বেশি তেল যার হাতে, তারই থাকবে না; বরং যার তেল নিরাপদে, নিরবচ্ছিন্নভাবে এবং একাধিক পথে বাজারে পৌঁছাতে পারে, তার হাতেই ক্রমশ বেশি প্রভাব জমা হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বেস্ট-বিফোর তারিখ পেরোলেই খাবার ফেলে দেবেন না, জানুন কোন খাবার কতদিন ভালো থাকে

হরমুজের পর বদলে যাচ্ছে তেলের বিশ্বমানচিত্র

১০:০০:৫০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

যুদ্ধ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র বদলায় না, জ্বালানি সরবরাহের পথও নতুন করে আঁকে। পারস্য উপসাগরে সাম্প্রতিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা সেই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথগুলোর একটি যখন নিরাপত্তার প্রশ্নে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন তেল আমদানিকারক দেশগুলোর কাছে বিকল্প সরবরাহ আর কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকে না; সেটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে এমন সব দেশ, যাদের এত দিন বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে প্রভাব সীমিত ছিল। দক্ষিণ আমেরিকার গায়ানা তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। মাত্র প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার জনসংখ্যার এই দেশটি এখন প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে। সমুদ্রপথে আটলান্টিকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকায় হরমুজের ঝুঁকি এড়িয়ে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দেশটির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে।

তেলের বাজারে নতুন শক্তির উত্থান

হরমুজ সংকটের তাৎক্ষণিক অভিঘাত ছিল বড়। প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধ-পরবর্তী জ্বালানি সংকটের পর সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি পাঁচ দশকেরও বেশি আগের তুলনায় ভিন্ন। তখন বিকল্প সরবরাহ সীমিত ছিল; এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ আমেরিকা মহাদেশের কয়েকটি দেশ দ্রুত উৎপাদন বাড়িয়েছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বিশেষ করে ফ্র্যাকিং, যুক্তরাষ্ট্রকে আমদানিনির্ভর দেশ থেকে বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্রাজিল, কানাডা, আর্জেন্টিনা ও গায়ানার উৎপাদন বৃদ্ধি। গত দেড় দশকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ব্রাজিল বিশ্বের শীর্ষ দশ তেল রপ্তানিকারকের তালিকায় উঠে এসেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলেও বাজার পুরোপুরি অচল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আগের তুলনায় কমেছে।

ব্রাজিলের গভীর সমুদ্রভিত্তিক তেল উৎপাদন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর চীন ও ভারত দ্রুত ব্রাজিলের দিকে ঝুঁকেছে। চীন এক পর্যায়ে ব্রাজিল থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করেছে। অন্যদিকে গায়ানার মজুত প্রায় ১১ বিলিয়ন ব্যারেল এবং ২০১৯ সালে প্রথম উৎপাদন শুরু হওয়ার পর দেশটির অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। উৎপাদন ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হওয়ারও পূর্বাভাস রয়েছে।

আফ্রিকার নতুন তেল মানচিত্র

একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে। লিবিয়া, নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলা এখনো মহাদেশটির প্রধান তেল উৎপাদক। কিন্তু নামিবিয়া, আইভরি কোস্ট ও সেনেগালের মতো তুলনামূলক নতুন খেলোয়াড়দের গুরুত্ব বাড়ছে।

নামিবিয়ার উপকূলের কাছে আবিষ্কৃত নতুন তেলক্ষেত্রগুলোর মজুত প্রায় ২০ বিলিয়ন ব্যারেল হতে পারে। আইভরি কোস্টের বালেইন ফিল্ডে সম্ভাব্য মজুত ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত হতে পারে। সেনেগালের প্রমাণিত মজুত প্রায় এক বিলিয়ন ব্যারেল। উগান্ডাও প্রায় ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ব্যারেল মজুতের ভিত্তিতে উৎপাদন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই দেশগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ভৌগোলিক অবস্থান। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল মজুত থাকলেও সেখানকার তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ এমন একটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল, যা সামরিক সংঘাতের সময় সহজেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিপরীতে কানাডার ভ্যানকুভার, আর্জেন্টিনার পুয়ের্তো রোসালেস কিংবা তানজানিয়ার তাঙ্গা বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্যাংকারগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও উন্মুক্ত সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে পারে।

হরমুজের ছায়ায় বদলে যাচ্ছে জ্বালানি রাজনীতির মানচিত্র

নিরাপত্তার দামও আছে

তবে বিকল্প সরবরাহের অর্থ সস্তা তেল নয়। নিরাপদ পথের জন্য ক্রেতা ও জাহাজ মালিকদের অতিরিক্ত ব্যয় মেনে নিতে হচ্ছে। আফ্রিকার তেলের প্রতি চীন, ভারত ও জাপানের চাহিদা বেড়েছে। ইউরোপও আফ্রিকা থেকে বিপুল তেল আমদানি করে। কিন্তু এশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা সরবরাহের ওপর চাপ বাড়িয়েছে এবং বছরের বড় অংশজুড়ে দাম তুলনামূলকভাবে বেশি থেকেছে।

এই পরিস্থিতিতে তেল কোম্পানিগুলোও লাভবান হয়েছে। সরবরাহের ঘাটতি ও উচ্চমূল্যের সময়ে বড় কোম্পানিগুলোর মুনাফা বেড়েছে। একই সঙ্গে আমদানিকারক দেশগুলো বুঝতে পারছে, শুধু কম দামে তেল পাওয়া যথেষ্ট নয়; সরবরাহ কতটা নির্ভরযোগ্য, তা-ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মধ্যপ্রাচ্যও বসে নেই

হরমুজের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তাদের তেল শিল্পের ভবিষ্যৎ রক্ষায় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে বিকল্প পাইপলাইন ও বন্দর অবকাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান থেকে ফুজাইরাহ পর্যন্ত পাইপলাইন হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ দেয়। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনও উপসাগর এড়িয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠাতে পারে। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ দিয়ে যে বিপুল পরিমাণ তেল যায়, তার তুলনায় এই বিকল্প পরিবহন সক্ষমতা এখনো অনেক কম। উপরন্তু, বিকল্প অবকাঠামোও হামলার ঝুঁকিমুক্ত নয়।

ইরাকও কয়েকটি বিকল্প রুট পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে—এর মধ্যে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর, তুরস্কের জেইহান এবং জর্ডানের আকাবা বন্দরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। অঞ্চলটিতে বিবেচনাধীন নতুন পাইপলাইনগুলো বাস্তবায়িত হলে ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ হরমুজের ওপর নির্ভরশীল তেলের একটি বড় অংশ বিকল্প পথে সরানো সম্ভব হতে পারে।

কিন্তু ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হবে না। লোহিত সাগরও নিরাপদ নয়। ইয়েমেনভিত্তিক হুথিদের হুমকি এবং সামুদ্রিক বীমার ঝুঁকি নতুন করিডোরগুলোকেও অনিশ্চিত করে তুলছে। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর সবচেয়ে বড় ক্রেতারা এশিয়ায়। তাই তেলকে লোহিত সাগর বা ভূমধ্যসাগরের দিকে ঘুরিয়ে দিলে অনেক ক্ষেত্রে পরিবহনপথ দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হয়ে যায়।

শুধু তেলের বাজার নয়, বদলাচ্ছে ক্ষমতার কাঠামো

হরমুজ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তাই কেবল তেলের দাম দিয়ে বিচার করা যাবে না। এটি বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে নির্ভরতার কাঠামোও বদলাতে পারে।

চীন, ভারত ও জাপানের মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলো ইতোমধ্যে সরবরাহের নতুন উৎস খুঁজছে। একই সময়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ছে। ফলে একদিকে নতুন তেল উৎপাদকরা বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টাও তীব্র হচ্ছে।

এখানেই হরমুজ সংকটের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা। কোনো একটি সংকীর্ণ ভৌগোলিক পথ যদি বিশ্বের জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তবে সেই নির্ভরতা নিজেই একটি কৌশলগত দুর্বলতা। ইরানের হাতে থাকা হরমুজ ছিল সেই দুর্বলতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। এখন যদি উৎপাদক ও ক্রেতারা বিকল্প রুট তৈরি করে, তাহলে সেই চাপ প্রয়োগের ক্ষমতাও কমে যাবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য করেছিল। উপসাগরীয় সংঘাত একইভাবে বিশ্বকে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা দেখিয়েছে—নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহের জন্য শুধু মজুত থাকাই যথেষ্ট নয়, বিকল্প পথও থাকতে হয়।

ফলে হরমুজ হয়তো শেষ পর্যন্ত বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথের মর্যাদা হারাবে না। কিন্তু এর চারপাশে যে বিকল্প নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে, তা তেলের বাজারের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। আগামী দিনের জ্বালানি রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো শুধু সবচেয়ে বেশি তেল যার হাতে, তারই থাকবে না; বরং যার তেল নিরাপদে, নিরবচ্ছিন্নভাবে এবং একাধিক পথে বাজারে পৌঁছাতে পারে, তার হাতেই ক্রমশ বেশি প্রভাব জমা হবে।