পাকিস্তানে নতুন প্রদেশ গঠনের আলোচনা প্রায়ই প্রশাসনিক সুবিধার প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসে। কিন্তু বিষয়টি আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রাদেশিক সীমানা পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের পরিচয়, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সম্পদের বণ্টন, কেন্দ্র ও প্রদেশের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বৈধতা। তাই এমন সিদ্ধান্ত শুধু সংসদ বা প্রাদেশিক পরিষদের রাজনৈতিক সমীকরণের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত নয়। যাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এই পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, সেই জনগণের মতামতই হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস দেখায়, প্রাদেশিক সীমানা কখনোই চিরস্থায়ী ছিল না। ব্রিটিশ শাসনামলে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের প্রয়োজন অনুযায়ী ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল বারবার পুনর্গঠিত হয়েছে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে এবং এমন একটি সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করে, যা পরবর্তী সময়ে ভারত ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করে।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় ভারত ও পাকিস্তান যে প্রদেশগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল, সেগুলো মূলত ঔপনিবেশিক প্রশাসনের প্রয়োজনে গড়ে উঠেছিল। স্বাধীনতার পর দুই দেশের সামনে তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়ায়—ঔপনিবেশিক আমলের সীমানা কি বহাল থাকবে, নাকি ভাষা, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে নতুনভাবে অঞ্চল সাজানো হবে?
ভারত ধীরে ধীরে দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয়। পাকিস্তানের পথ ছিল ভিন্ন।
ভারতের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে প্রাদেশিক সীমানা পরিবর্তনকে জাতীয় ঐক্যের জন্য স্বয়ংক্রিয় হুমকি হিসেবে দেখা হয়নি। ভারতের সংবিধান দেশটিকে ‘রাজ্যগুলোর ইউনিয়ন’ হিসেবে বর্ণনা করে এবং সংসদকে নতুন রাজ্য গঠন, বিদ্যমান রাজ্যের আয়তন পরিবর্তন, সীমানা পুনর্নির্ধারণ কিংবা নাম পরিবর্তনের ক্ষমতা দিয়েছে।

১৯৫৩ সালে গঠিত স্টেটস রিঅর্গানাইজেশন কমিশন ১৯৫৫ সালে সুপারিশ দেয়। পরের বছর স্টেটস রিঅর্গানাইজেশন অ্যাক্ট এবং সংবিধানের সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে ভারতের অভ্যন্তরীণ মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। ভাষা ও আঞ্চলিক বাস্তবতা সেখানে প্রাদেশিক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার সময় ব্রিটিশ ভারতের ১৭টি প্রদেশের উত্তরাধিকার পাওয়া ভারত এখন ২৮টি রাজ্য ও ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ সীমানার বহু পরিবর্তন সত্ত্বেও ভারতের ইউনিয়ন ভেঙে পড়েনি; বরং আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষাকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে জায়গা দেওয়ার মাধ্যমে ফেডারেল ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হয়েছে।
পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা প্রায় বিপরীত।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রাথমিক প্রাদেশিক কাঠামোর মধ্যে ছিল পূর্ববঙ্গ, পশ্চিম পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং বেলুচিস্তান। কিন্তু আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে ধাপে ধাপে সাংবিধানিকভাবে সামঞ্জস্য করার পরিবর্তে পাকিস্তান একসময় ব্যাপক কেন্দ্রীয়করণের পথে হাঁটে।
১৯৫৫ সালে ওয়ান ইউনিট পরিকল্পনার মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশকে একত্র করে একটি বৃহৎ প্রদেশে পরিণত করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক সমতা তৈরি করা। ফলে পুরো পাকিস্তান কার্যত দুটি বড় প্রশাসনিক অংশে বিভক্ত হয়ে যায়।
কিন্তু প্রশাসনিকভাবে একীভূত করলেই ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিচয় মুছে ফেলা যায় না। পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের পৃথক পরিচয়কে এক কাঠামোর মধ্যে চাপা দেওয়ার চেষ্টা ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করে। প্রায় ১৫ বছর পর ওয়ান ইউনিট বাতিল করতে হয়।
ততদিনে অবশ্য পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়ে উঠেছিল। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছেদের পর বর্তমান পাকিস্তানের চারটি প্রদেশই প্রধান সাংবিধানিক একক হিসেবে থেকে যায়।

১৯৭৩ সালের সংবিধান বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখাওয়া, পাঞ্জাব ও সিন্ধুকে পাকিস্তানের প্রদেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে বিদ্যমান কোনো প্রদেশের সীমানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংবিধান অত্যন্ত কঠোর প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে।
সংবিধানের ২৩৯(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে একটি প্রদেশের সীমানা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদের মোট সদস্যসংখ্যার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সংসদ একাই কোনো প্রদেশকে ভাগ করে দিতে পারে না। সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদের সম্মতি অপরিহার্য।
এখানেই পাকিস্তানের ক্ষেত্রে নতুন প্রদেশ গঠনের প্রশ্নটি জটিল হয়ে ওঠে।
মূল প্রশ্ন শুধু ‘ছোট প্রদেশ ভালো কি না’—এটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, একটি প্রদেশের সীমানা পরিবর্তনের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ক্ষমতা কার হাতে থাকবে?
বিভিন্ন ফেডারেশনে এর উত্তর ভিন্ন। ভারতে কেন্দ্রীয় সংসদের ভূমিকা সবচেয়ে শক্তিশালী। যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সম্মতিও প্রয়োজন। যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক কাঠামো আবার আলাদা। পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সংসদ ও সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষয়—উভয়ের ভূমিকা রয়েছে।
ছোট প্রদেশ গঠনের পক্ষে যুক্তিও কম নয়। সমর্থকদের মতে, ছোট প্রশাসনিক একক হলে সরকার সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। স্থানীয় সমস্যার প্রতি প্রশাসনের নজর বাড়তে পারে, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব আরও সরাসরি হতে পারে এবং উন্নয়ন বৈষম্য কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বড় প্রদেশগুলোর ভেতরে অনেক সময় রাজধানী বা প্রধান শহরগুলোর সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্য ব্যাপক হয়। নতুন প্রদেশ হলে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলো নিজেদের উন্নয়ন অগ্রাধিকার নির্ধারণে বেশি রাজনৈতিক ক্ষমতা পেতে পারে। স্থানীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ঐতিহাসিক বা ভাষাগত পরিচয়ের রাজনৈতিক স্বীকৃতিও এর মাধ্যমে বাড়তে পারে।
কিন্তু এর বিপরীত যুক্তিগুলোও অত্যন্ত শক্তিশালী।
নতুন প্রদেশ মানেই নতুন প্রশাসনিক কাঠামো। প্রতিটি নতুন প্রদেশের জন্য প্রয়োজন হতে পারে আলাদা প্রাদেশিক পরিষদ, মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিসভা, আমলাতন্ত্র এবং উচ্চ আদালতসহ বিস্তৃত প্রতিষ্ঠান। এসব কাঠামো তৈরি ও পরিচালনার ব্যয় ছোট প্রদেশগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
আরও বড় ঝুঁকি হলো রাজনীতির জাতিগতীকরণ।

পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিচয় আগে থেকেই রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী। নতুন সীমানা যদি মূলত জাতিগত বা ভাষাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আঁকা হয়, তাহলে তা সমস্যা সমাধানের বদলে নতুন সংঘাত তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সিন্ধুতে যেকোনো ধরনের সীমানা পুনর্গঠন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক ভারসাম্য, ভূমি, সম্পদ ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
সেনেটের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের ফেডারেল কাঠামোয় উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্ব কেবল জনসংখ্যার অনুপাতে নির্ধারিত নয়। ফলে নতুন প্রদেশ সৃষ্টি হলে সেনেটে ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে যেতে পারে। নতুন প্রদেশগুলো কেন্দ্র ও প্রদেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক প্রভাবের হিসাবেও পরিবর্তন আনতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ। এমন পরিস্থিতিতে প্রাদেশিক সীমানা পরিবর্তনের উদ্যোগ সহজেই দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। প্রশাসনিকভাবে যুক্তিসংগত কোনো প্রস্তাবও যদি জনগণের কাছে কোনো নির্দিষ্ট দলকে দুর্বল করা, নির্বাচনী সুবিধা নেওয়া কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব পুনর্বণ্টনের কৌশল বলে মনে হয়, তাহলে তার গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
তাই নতুন প্রদেশের প্রশ্নে শুধু ফলাফল নয়, প্রক্রিয়াটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আইন মেনে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেই সেটি যে গণতান্ত্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে, এমন নয়। প্রাদেশিক সীমানা কোটি মানুষের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জীবনে প্রভাব ফেলে। ফলে এমন সিদ্ধান্ত যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সীমিত আলোচনার মধ্যেই চূড়ান্ত হয়, তাহলে তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
এ কারণেই পাকিস্তানের উচিত বড় ধরনের প্রাদেশিক পুনর্গঠনের আগে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার ব্যবস্থা করা।
সংবিধানের ৪৮(৬) অনুচ্ছেদ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়ার একটি সাংবিধানিক পথ তৈরি করে। পাকিস্তানে যদি সত্যিই নতুন প্রদেশ গঠনের প্রশ্ন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়, তাহলে প্রথমে জনগণকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে—তারা আদৌ দেশের বর্তমান প্রাদেশিক কাঠামো পরিবর্তন করতে চান কি না।

জনগণ যদি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেয়, তবুও তাতে সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রদেশ তৈরি হয়ে যাবে না। পরবর্তী ধাপে সংবিধান নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদের প্রয়োজনীয় অনুমোদনও নিতে হবে। তবে গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস নিশ্চিত করতে পারে—সিদ্ধান্তটি কেবল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নয়, জনগণেরও।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু চারটি প্রদেশ থাকবে, নাকি ছয়টি কিংবা আরও বেশি হবে—এমন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কি এমনভাবে তার ফেডারেল কাঠামো সংস্কার করতে পারে, যাতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ে কিন্তু আঞ্চলিক বিভাজন আরও তীব্র না হয়?
ইতিহাস দেখিয়েছে, প্রাদেশিক সীমানা পরিবর্তন করা সম্ভব। একই সঙ্গে ইতিহাস এটাও দেখিয়েছে যে জনগণের পরিচয় ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া প্রশাসনিক কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে সংকট আরও বাড়াতে পারে।
তাই পাকিস্তানে নতুন প্রদেশ গঠনের বিতর্কে তাড়াহুড়ো করে কোনো মানচিত্র নির্ধারণের চেয়ে আগে জনগণের কাছে প্রশ্ন করাই বেশি যুক্তিসঙ্গত। সরকারকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন প্রদেশ কার্যকর হতে পারে, কিন্তু জনগণের সম্মতি ছাড়া সেই পরিবর্তন নতুন অসন্তোষেরও জন্ম দিতে পারে।
শেষ কথা একটাই—পাকিস্তানের মানচিত্র বদলানোর আগে পাকিস্তানের মানুষ কী চায়, সেটিই জানতে হবে।
জাওয়াদ সোহরাব মালিক 



















