একসময় তিনি ভেবেছিলেন, সংগীতজীবন হয়তো ছেড়েই দিতে হবে। জনপ্রিয়তার প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছিল না, বিপুল অর্থ খরচ করেও সফর থেকে কাঙ্ক্ষিত আয় আসছিল না, আর নিজের শিল্পীসত্তা নিয়েও তৈরি হচ্ছিল অনিশ্চয়তা। সেই কঠিন সময় পেরিয়ে অবশেষে তৃতীয় অ্যালবাম দিয়ে নিজের প্রাপ্য শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে গেছেন মার্কিন পপতারকা স্লেয়্যাটার।
২৯ বছর বয়সী এই শিল্পীর নতুন অ্যালবাম ‘ওয়ার্স্ট গার্ল ইন আমেরিকা’ শুধু তাঁর সংগীতজীবনে নতুন মোড় আনেনি, বরং নিজের পরিচয়, সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণা এবং তারকা হয়ে ওঠার চাপের বিরুদ্ধেও এক ধরনের সৃজনশীল অবস্থান তৈরি করেছে।
নিজেকে আর চরিত্র বানিয়ে রাখতে চান না
স্লেয়্যাটারের শুরুর দিনগুলোতে শিল্পী পরিচয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় যেন আলাদা ছিল। তিনি মনে করতেন, শ্রোতাদের সামনে একটি নির্দিষ্ট চরিত্র তৈরি করেই হয়তো পপতারকা হিসেবে টিকে থাকা সম্ভব।
কিন্তু নতুন অ্যালবামে সেই ধারণা বদলে গেছে। এখন তিনি আর নিজেকে নিখুঁত, আকর্ষণীয় ও সাজানো-গোছানো পপতারকার প্রচলিত ছাঁচে ঢোকাতে চান না। বরং নিজের অগোছালো, অস্বস্তিকর ও কখনো কখনো কুৎসিত দিকগুলোকেও শিল্পের অংশ করে তুলেছেন।
তাঁর ভাষায়, তিনি কখনোই ‘সুন্দর ও আভিজাত্যপূর্ণ পপতারকা’র নির্দিষ্ট কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই ছিলেন না। তাই এবার তিনি ইচ্ছা করেই সংগীতকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, যেখানে কিছুটা অস্বস্তি, বিশৃঙ্খলা এবং কদর্যতাও থাকতে পারে।
এই পরিবর্তন তাঁর পোশাকেও স্পষ্ট। নিউইয়র্কে সাক্ষাৎকার দিতে এসে তাঁকে দেখা যায় পুরোনো পোশাকের দোকান থেকে সংগ্রহ করা পোশাক, নিজে নকশা করা বুট ও খানিকটা অগোছালো চেহারায়। আগের ঝলমলে তারকা-ভাবমূর্তির বদলে এখন তিনি অনেক বেশি স্বাভাবিক ও নিজের মতো থাকতে স্বচ্ছন্দ।
সাফল্যের পরও এসেছিল হাল ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা
স্লেয়্যাটারের সংগীতজীবনের শুরুটা হয়েছিল স্বাধীনভাবে প্রকাশ করা একটি প্রথম গানের সংকলন দিয়ে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত সেই সংকলনের কয়েকটি গান তাঁকে বিকল্প পপসংগীতের শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করে তোলে।
মিসৌরিতে বেড়ে ওঠার সময় থেকেই তিনি ইন্টারনেটে বিভিন্ন শিল্পীর উত্থান দেখতেন। অনলাইনের জনপ্রিয়তা কীভাবে একজন শিল্পীর ক্যারিয়ার বদলে দিতে পারে, সেটি তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। পরে লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে তিনি আরও বড় সাফল্যের প্রত্যাশা পান।
কিন্তু প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম ‘ট্রাবলড প্যারাডাইস’ কিংবা পরের অ্যালবাম ‘স্টারফাকার’—কোনোটিই তাঁকে সেই মূলধারার সাফল্য এনে দিতে পারেনি, যার জন্য তিনি অপেক্ষা করছিলেন।
একপর্যায়ে তাঁর মনে হতে শুরু করে, হয়তো মানুষ তাঁকে খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে না। সংগীতজীবন শেষ করে পোশাক তৈরি শেখার কথা পর্যন্ত ভেবেছিলেন তিনি।
নতুন অ্যালবামটি তাই তিনি এক অর্থে নিজের বিদায়ী কাজ হিসেবেই তৈরি করতে শুরু করেছিলেন। অ্যালবাম তৈরির সময় তিনি গভীর হতাশা ও অসহায়ত্বের মধ্যে ছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, অন্তত একটি অসাধারণ অ্যালবাম রেখে যেতে পারবেন, সেটি বড় সাফল্য না পেলেও তাতে আফসোস থাকবে না।
কিন্তু গল্পটা সেখানেই শেষ হয়নি।
কোচেলায় বদলে গেল সব হিসাব
চলতি বছরের কোচেলা সংগীত উৎসবে স্লেয়্যাটারের পরিবেশনা তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
মোজাভে তাঁবুতে তাঁর পরিবেশনা দেখতে হাজারো মানুষ ভিড় করেন। পরপর দুই সপ্তাহান্তে মঞ্চে তাঁর তীব্র, উচ্ছ্বসিত পরিবেশনা দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
‘ক্র্যাঙ্ক’ ও ‘ইয়েস গড’ গানের সময় দর্শকদের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভেন্যুতে। অন্যদিকে ‘ব্রিটানি মারফি’ ও ‘গ্যাস স্টেশন’-এর মতো গানে উঠে আসে মৃত্যু, পরিত্যক্ত হওয়া এবং ব্যক্তিগত অস্থিরতার মতো গভীর অনুভূতি।
মঞ্চ থেকে নামার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি স্লেয়্যাটার। বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। তাঁর মনে হচ্ছিল, এতদিনের সংগ্রামের পর অবশেষে তিনি সত্যিই কিছু করে দেখাতে পেরেছেন।
তারকা হওয়ার চেয়ে নিজের মতো থাকাই এখন গুরুত্বপূর্ণ
হঠাৎ পাওয়া এই জনপ্রিয়তা তাঁকে নতুন সংগীত তৈরিতেও অনুপ্রাণিত করছে। তবে জনপ্রিয়তার সঙ্গে আসা নতুন শ্রোতাদের সবাই যে তাঁর সংগীতের প্রকৃত অনুরাগী, তা নিয়েও তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত নন।
তবু এবার তিনি সেই জনপ্রিয়তাকে নিজের মতো করে উপভোগ করতে চান। তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নতুন কাজ যেন তাঁর নিজের বলে মনে হয়।

এই আত্মবিশ্বাসের জায়গাটি তাঁর নতুন অ্যালবামে বিশেষভাবে স্পষ্ট। অ্যালবামের অনেক গান এসেছে এমন অনুভূতি থেকে, যেখানে নিজেকে মনে হয় পার্টিতে একটু বেশি জোরে কথা বলা সেই বিরক্তিকর মেয়ে, অথবা এমন একজন, যে কোনো দলের সঙ্গে ঠিকমতো মানিয়ে নিতে পারে না।
নিজের সেই অস্বস্তিকর অনুভূতিগুলোকেই তিনি এবার দুর্বলতা হিসেবে লুকাননি। বরং সেগুলোকে সংগীত ও দৃশ্যভাষার শক্তিতে পরিণত করেছেন।
সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধেও লড়াই
নতুন অ্যালবামের জন্য নির্মিত তাঁর নিজস্ব পরিচালিত দৃশ্যগুলোতে রক্তাক্ত ও ভয়ংকর শারীরিক দৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক ও সৌন্দর্যের মানদণ্ডকে প্রশ্ন করেছেন তিনি।
ভৌতিক চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর আগ্রহও প্রবল। এমন দৃশ্যই তাঁর পছন্দ, যা দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে, একটু ভয় দেখায় কিংবা মনে করিয়ে দেয়—এটি হয়তো দেখা উচিত নয়।
এই নান্দনিকতা তাঁর সংগীতের সঙ্গে মিশে গিয়ে আলাদা এক পরিচয় তৈরি করেছে। তিনি আর প্রচলিত অর্থে নিখুঁত পপতারকা হওয়ার চেষ্টা করছেন না; বরং নিজের অস্বাভাবিকতা, অস্বস্তি ও বিদ্রোহী মনোভাবকেই পরিচয়ের কেন্দ্রে আনছেন।
:max_bytes(150000):strip_icc():focal(1082x0:1084x2)/slayyyter-v-mag-1-063026-559c08a2d137454a9a1793205d85c674.jpg)
খ্যাতি নয়, নিজের পরিচয়টাই বড়
স্লেয়্যাটার এখনো নিজেকে ‘বিখ্যাত’ বলতে খুব একটা আগ্রহী নন। অথচ বাস্তবতা হলো, তাঁর দিকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষের নজর।
একসময় যে শিল্পী সংগীতজীবন শেষ করে পোশাক তৈরির দিকে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন, তিনিই এখন নতুন সংগীত তৈরির ব্যস্ততায় রয়েছেন। কোচেলার সাফল্য তাঁকে শুধু নতুন শ্রোতা দেয়নি, নিজের ওপর বিশ্বাসটাও ফিরিয়ে দিয়েছে।
তাই ‘ওয়ার্স্ট গার্ল ইন আমেরিকা’ কেবল একটি তৃতীয় অ্যালবাম নয়। এটি এমন এক শিল্পীর আত্মপ্রত্যয়ের গল্প, যিনি জনপ্রিয় হওয়ার জন্য নিজেকে বদলে ফেলার বদলে শেষ পর্যন্ত নিজের আসল পরিচয়টিকেই সামনে এনেছেন।
আর সেই কারণেই হয়তো স্লেয়্যাটারের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখন শুধু মঞ্চে নয়—নিজের শর্তে নিজেকে গ্রহণ করতে পারার মধ্যেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















