একসময় ‘বিকজ আই গট হাই’ গানের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন আফ্রোম্যান। মজার গান, আত্ম-উপহাস আর গাঁজাকে ঘিরে ব্যতিক্রমী হাস্যরসের কারণে দুই হাজার দশকের শুরুতে তিনি ছিলেন জনপ্রিয় এক র্যাপ তারকা। কিন্তু নিজের বাড়িতে পুলিশের আকস্মিক অভিযান, সেই অভিযানের ভিডিও নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক গান এবং পরবর্তী দীর্ঘ আইনি লড়াই তাঁর জীবনকে এমন এক মোড়ে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি হয়ে ওঠেন বাক্স্বাধীনতার এক অপ্রত্যাশিত প্রতীক।
জোসেফ এডগার ফোরম্যান, যিনি আফ্রোম্যান নামে পরিচিত, এখন ৫১ বছর বয়সী। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের নিজ শহরের কাছাকাছি এক অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে তিনি পুরোনো জনপ্রিয় গানগুলোর পাশাপাশি এমন সব নতুন গান পরিবেশন করছেন, যেগুলোর জন্ম হয়েছে তাঁর জীবনের সবচেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে।
বাড়িতে অভিযান, শুরু হয় নতুন অধ্যায়
২০২২ সালের গ্রীষ্মে অ্যাডামস কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়ের অন্তত নয়জন কর্মকর্তা অস্ত্র হাতে ফোরম্যানের বাড়িতে অভিযান চালান। মাদক পাচার ও অপহরণের সন্দেহে পরিচালিত সেই অভিযানে তাঁর বাড়ির দরজা ভেঙে ফেলা হয়, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র তল্লাশি করা হয় এবং প্রায় পাঁচ হাজার ডলার নগদ অর্থসহ গাঁজাসংক্রান্ত কিছু সামগ্রী জব্দ করা হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফোরম্যানকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও আনা হয়নি।
ঘটনাটি হয়তো সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু নিজের বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা অভিযানের দৃশ্য নিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ শুরু করেন। একের পর এক গান ও ভিডিওতে কর্মকর্তাদের আচরণকে হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরেন তিনি।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে ওঠে ‘লেমন পাউন্ড কেক’। অভিযানের সময় একজন কর্মকর্তাকে ফোরম্যানের রান্নাঘরে রাখা তাঁর মায়ের তৈরি লেবুর কেকের দিকে তাকাতে দেখা যায়। সেই দৃশ্যকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয় গানটি।
ব্যঙ্গ থেকে মামলা, মামলাকেও বানালেন শিল্প
২০২৩ সালে অভিযানে অংশ নেওয়া সাত কর্মকর্তা ফোরম্যানের বিরুদ্ধে প্রায় ৩৯ লাখ ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করেন। অভিযোগের মধ্যে ছিল মানহানি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ।
ফোরম্যানও পাল্টা অভিযোগ করেন, তবে তাঁর পাল্টা মামলা খারিজ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় এমন এক বিচার, যা দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের নজর কাড়ে।
আদালতে মূল প্রশ্ন ছিল—ফোরম্যানের গান ও বক্তব্যকে কি বাস্তব, মিথ্যা প্রমাণযোগ্য অভিযোগ হিসেবে ধরা হবে, নাকি সেগুলো ব্যঙ্গ, অতিরঞ্জন ও মতামত হিসেবে বাক্স্বাধীনতার সুরক্ষা পাবে?
এই প্রশ্নই পুরো মামলাটিকে অসাধারণ গুরুত্ব দেয়।
আদালতে হাস্যরস, কিন্তু বিষয় ছিল গুরুতর
তিন দিনের বিচারপর্বে একদিকে ছিল কর্মকর্তাদের আবেগঘন বক্তব্য, অন্যদিকে ফোরম্যানের অদ্ভুত রসবোধ। এক কর্মকর্তাকে নিয়ে করা ব্যঙ্গাত্মক গানের প্রসঙ্গে তাঁর আইনজীবী আদালতে এমন প্রশ্ন তোলেন, যা মুহূর্তেই আলোচিত হয়ে ওঠে।
ফোরম্যানের পক্ষের যুক্তি ছিল, একজন শিল্পীর গানকে আক্ষরিক অর্থে বিচার করলে ব্যঙ্গ, হাস্যরস ও শিল্পের বড় একটি অংশকেই বিপন্ন করা হবে।
ফোরম্যান নিজেও আদালতে দৃঢ় ছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, পুলিশ যদি তাঁর বাড়িতে সেই অভিযান না চালাত, তাহলে তাঁদের নাম তিনি জানতেন না, তাঁদের নিয়ে গানও তৈরি হতো না, মামলাটিও হতো না।
তাঁর ভাষায়, সবকিছুর সূত্রপাত হয়েছিল কর্মকর্তাদের নিজেদের কাজ থেকেই।
রায়ের মুহূর্তে কাঁদলেন আফ্রোম্যান
প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা আলোচনার পর আট সদস্যের জুরি সাত কর্মকর্তার সব কটি অভিযোগেই ফোরম্যানের পক্ষে রায় দেয়।
রায় ঘোষণার পর তিনি হাত তুলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানান। চোখে পানি চলে আসে তাঁর।
পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তিনি একা জেতেননি—এটি আমেরিকার বাক্স্বাধীনতারও জয়।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই বিনোদনজগতের এক রসিক র্যাপার হঠাৎ করে নাগরিক স্বাধীনতার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে ওঠেন।
পুলিশের বিরুদ্ধে গান, এবার লাখ লাখ শ্রোতা
রায়ের পর ফোরম্যানের পুরোনো ও নতুন গানের শ্রোতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। তাঁর সঙ্গীতের শোনা হওয়ার হার এক সপ্তাহে পাঁচ গুণেরও বেশি বাড়ে।
‘লেমন পাউন্ড কেক’ গানটি যেখানে বিচার শুরুর আগের দিন ২০ হাজারেরও কমবার শোনা হয়েছিল, রায়ের পর সেটি ছাড়িয়ে যায় ১৫ লাখ শ্রবণ।
গানটি জনপ্রিয়তার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে। তাঁর পুরোনো ‘বিকজ আই গট হাই’ গানও আবার শীর্ষ পর্যায়ে ফিরে আসে।
এ যেন বহু বছর পর তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় জন্ম।
তিক্ত অভিজ্ঞতাকে বানালেন রসিকতার অস্ত্র
ফোরম্যানের সাফল্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এটাই—তিনি নিজের দুর্ভাগ্যকে ভেঙে পড়ার কারণ হিসেবে না দেখে সৃজনশীলতার উপাদান বানিয়েছেন।
বাড়ি ভাঙা হয়েছে, টাকা জব্দ হয়েছে, পুলিশি অভিযানের ভিডিও সামনে এসেছে, মামলা হয়েছে—কিন্তু প্রতিটি ধাপেই তিনি নতুন গান তৈরি করেছেন।
তাঁর নিজের ভাষায়, প্রথমে প্রয়োজন ছিল বাড়ি মেরামত করা। তারপর তিনি ঠিক করেন, অপরিচিত লোকেরা যে ক্ষতি করেছে তার জন্য নিজের পকেট থেকে টাকা দেবেন না। বরং সেই মানুষদের নিয়েই এমন কিছু তৈরি করবেন, যাতে ক্ষতির টাকা উঠে আসে।
শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনাই তাঁকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
ছোট শহরের মানুষ, বড় গল্পের নায়ক
ফোরম্যানের বাড়ি ওহাইওর একটি শান্ত গ্রামীণ এলাকায়। স্থানীয়দের কাছে তিনি কোনো ভীতিকর তারকা নন; বরং হাসিখুশি, সহজ-সরল এক পরিচিত মানুষ।
কখনো শিশুদের খেলাধুলার অনুষ্ঠানে দেখা যায় তাঁকে, কখনো দোকানে, কখনো স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ছবি তুলতে। তাঁর এই স্বাভাবিক জীবন আর জাতীয় পর্যায়ের আইনি লড়াইয়ের মধ্যে তীব্র বৈপরীত্যই তাঁর গল্পকে আরও আকর্ষণীয় করেছে।
তিনি একসময় বলেছিলেন, পৃথিবী তাঁকে বোকা ভাবতে চাইলে তিনি সেই ধারণাটিকেই নিজের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন।
এ কারণেই তাঁর ব্যঙ্গ অনেক সময় সরল হাসির আড়ালে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন তুলে ধরে।
বাক্স্বাধীনতার পরীক্ষায় নতুন প্রতীক
এই মামলায় ফোরম্যানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষাকারী একটি সংগঠনও অবস্থান নেয়। তাদের যুক্তি ছিল, সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের সমালোচনা করা বাক্স্বাধীনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষিত ক্ষেত্রগুলোর একটি।
ফোরম্যানের সমর্থকদের কাছে বিষয়টি শুধু একজন গায়কের মামলা নয়। এটি এমন এক প্রশ্নের প্রতিনিধিত্ব করে—ক্ষমতাবান সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ কতটা জোরে কথা বলতে পারবেন?
আর ফোরম্যান সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন গানের ভাষায়, ব্যঙ্গের ভাষায় এবং কখনো কখনো নির্দ্বিধায় অশালীন রসবোধের মাধ্যমেও।
একসময় হারিয়ে যাওয়া তারকা, আবার আলোচনার কেন্দ্রে
দুই হাজার এক সালে ‘বিকজ আই গট হাই’ গানটি প্রায় এক ডজন দেশে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিল। গানটির জন্য তিনি পুরস্কারের মনোনয়নও পেয়েছিলেন। তাঁর সেই সময়ের অ্যালবামও যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালবাম তালিকায় উল্লেখযোগ্য অবস্থান অর্জন করে।
কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহ মুহূর্তে বদলে যায়। রেডিওতে তাঁর গান বাজা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। যে তারকা হঠাৎ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিলেন, তিনি দ্রুতই আড়ালে চলে যান।
নিজের ক্যারিয়ারকে তিনি তখন মৃত না বলে গুরুতর অসুস্থ বলে বর্ণনা করেছিলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, গল্পের খারাপ অংশ শেষ পর্যন্ত ভালো অংশকে আরও মূল্যবান করে।
চারপাশের মানুষ তাঁকে আবার ভুলে গেলেও তিনি নিজেকে ভুলে যাননি।
লেবুর কেক থেকে কোটি মানুষের গল্প
অভিযানের পর তাঁর বাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত দরজা, পুলিশ কর্মকর্তাদের আচরণ এবং একটি লেবুর কেক—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হওয়া ব্যঙ্গ একসময় পণ্যেও রূপ নেয়।
রায়ের পর ওহাইওর একটি স্থানীয় বেকারি নিয়মিত লেবুর কেক বিক্রি শুরু করে। এমনকি মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে সেই কেক কিনতে আসতে শুরু করে।
একটি অপমানজনক ও ভয়ংকর রাতের স্মৃতি পরিণত হয় ব্যবসায়িক সাফল্যে।
আর ফোরম্যানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা যেন এখানেই—খারাপ সময়কে সবসময় ভালো সময়ে পরিণত করা যায় না, কিন্তু খারাপ সময়ের ভেতর থেকেও ভালো কিছু তৈরি করা যায়।
ভয়কে জায়গা দেবেন না
রায়ের পরও সেই অভিযানের মানসিক ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। তাঁর সাবেক স্ত্রী জানিয়েছেন, সন্তানদের চিকিৎসকের কাছে নিতে হয়েছে এবং বাড়ির নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়েছে।
রাতের ঘুম ভেঙে বাইরে কেউ আছে কি না, তা দেখার অভ্যাস এখনো রয়ে গেছে।
তবুও ফোরম্যান নিজের অবস্থান বদলাননি।
তিনি বলেন, ভয় নিয়ে বেঁচে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। অন্ধকারকে এড়িয়ে লুকিয়ে থাকাও নয়। যখন অন্যায় সামনে আসবে, তখন যতটা সম্ভব দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
একজন হাস্যরসাত্মক র্যাপারের এই ঘোষণা তাই তাঁর পুরোনো গানের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
আফ্রোম্যান একসময় মানুষকে হাসাতেন নিজের দুর্ভাগ্যের গল্প বলে। এখন তিনি দেখাচ্ছেন, সেই হাসিই কখনো কখনো ক্ষমতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
জীবন তাঁকে লেবু দিয়েছিল। তিনি সেটি দিয়ে সত্যিই লেবুর কেক বানিয়ে ফেলেছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















