১২:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
২০২৪ সাল থেকে একাধিক দেশে মাদক পাচার করেছেন মালয়েশিয়ার পাইলট প্রথমবারেই বাজিমাত, ‘তিউইকার্মা’ দিয়ে সেরার মুকুট কেওআইয়ের বাবাকে কাঁদিয়ে নয়, হাসিয়েই মনে রাখেন জেনহান কোভিডের অতিরিক্ত মৃত্যু নিয়ে বিতর্কিত গবেষণা প্রত্যাহার ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেসে শক্তিশালী ভূমিকম্প, ৫৩ জনের মৃত্যু; ত্রাণের অপেক্ষায় হাজারো মানুষ ট্রাম্পের কড়া ভিসা নীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ছেন ভারত ও চীনের প্রযুক্তি প্রতিভারা ভুয়া খবরও ছড়ায় মহামারির মতো, রুখবে কীভাবে? ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই বদলে দিল জীবনের অর্থ, ৩ বার অস্ত্রোপচারের পর নতুন পথে উদ্যোক্তা ব্ল্যাকবেরির টক-মিষ্টি ঘূর্ণিতে চিজকেক ব্রাউনি শ্যালট: ছোট্ট পেঁয়াজের মিষ্টি স্বাদে বদলে যায় রান্নার জাদু

অচেনা বন্দরে নাবিকদের পাশে এক পুরোহিত, বিপন্ন সমুদ্রযাত্রীদের আশ্রয়ের শেষ ভরসা

হংকংয়ের ব্যস্ত সমুদ্রবন্দরে বৃষ্টি কিংবা প্রচণ্ড গরম—কোনো কিছুই থামাতে পারে না ফাদার ভ্যালান অ্যারকিয়াস্বামিকে। সপ্তাহে তিন দিন ছোট নৌকায় করে তিনি ছুটে যান বন্দরে নোঙর করা বিশাল পণ্যবাহী জাহাজগুলোর কাছে। উদ্দেশ্য একটাই—দূরদেশ থেকে আসা নাবিকদের যেন অচেনা বন্দরে নিজেদের একা মনে না হয়।

৫৭ বছর বয়সী এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্যাথলিক পুরোহিত বছরে পাঁচ শতাধিক জাহাজে যান। জাহাজের উঁচু গা বেয়ে দড়ির মই দিয়ে উঠে তিনি নাবিকদের হাতে তুলে দেন খাবার, সংবাদপত্র ও প্রয়োজনীয় তথ্যপত্র। কখনো জাহাজের অধিনায়কের সঙ্গে চা পান করেন, কখনো অসুস্থ নাবিকের খোঁজ নেন, আবার কখনো কারাগারে থাকা সমুদ্রযাত্রীদের পাশে দাঁড়ান।

অচেনা বন্দরে আপনজন হয়ে ওঠা

ফাদার ভ্যালান এমন একটি ছোট দলের অংশ, যেখানে বিভিন্ন খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়ের পুরোহিত ও স্বেচ্ছাসেবকেরা বিশ্বের প্রায় ২৫ লাখ সমুদ্রযাত্রীর সেবা করেন। তাঁদের কাজ শুধু ধর্মীয় সেবা দেওয়া নয়। শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করে নাবিকদের অধিকার রক্ষা, হাসপাতাল ও কারাগারে থাকা নাবিকদের খোঁজ নেওয়া এবং বিপদে পড়া কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করাও তাঁদের দায়িত্বের অংশ।

তবে ফাদার ভ্যালানের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আরও মানবিক। তাঁর ভাষায়, তাঁদের লক্ষ্য হলো অচেনা জায়গায় থাকা নাবিকদের মনে করানো—তাঁরা একা নন।

The mission: making seafarers 'feel welcome in a strange place' - The Globe and Mail

এক জাহাজ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় এক লাজুক নাবিক তাঁর কাছে এগিয়ে এলে তিনি বলেন, পৃথিবীর যেখানেই কোনো সমস্যা হোক, তাঁদের ফোন করতে। পরে অবশ্য তাঁর আফসোস হয়, সাধারণ নাবিকদের সঙ্গে সেদিন আরও কিছু সময় কাটাতে পারেননি।

ধর্ম নিয়ে তিনি কখনো জোর করে কথা বলেন না। তাঁর মতে, সাধারণ আলাপ থেকেই ধীরে ধীরে ঈশ্বর, ধর্ম ও জীবনের নানা গভীর প্রশ্ন উঠে আসে। নাবিকেরা জানতে চান, কীভাবে তিনি পুরোহিত হলেন। সেই কথোপকথন থেকেই হয়তো কারও মনে বিশ্বাসের নতুন দরজা খুলে যেতে পারে।

যুদ্ধের ধাক্কায় আরও কঠিন হয়েছে সমুদ্রযাত্রা

বিশ্বের সমুদ্রযাত্রীদের জীবন এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু চলতি বছর তাঁদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচল কার্যত থমকে গেছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর হয়ে যাত্রা আরও বিপজ্জনক হয়ে পড়ায় অনেক জাহাজকে দীর্ঘ বিকল্প পথে যেতে হচ্ছে।

এর ফলে সমুদ্রে একটি জাহাজের কর্মীদের অবস্থানের সময় কয়েক মাস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার হিসাবে, হরমুজ প্রণালির আশপাশে প্রায় ছয় হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন।

ভারত, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো বিশ্বের বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক নাবিক সরবরাহ করে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত এসব দেশেও পড়েছে। ফলে বিদেশে কর্মরত নাবিকদের পাঠানো অর্থ এখন তাঁদের পরিবারের জন্য আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পরিত্যক্ত জাহাজে আটকে আট ইন্দোনেশীয়

নাবিকদের দুর্দশার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠেছে ‘গ্র্যান্ড সানি’ নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজ। ২২ বছর পুরোনো এই জাহাজটি বর্তমানে হংকংয়ের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হেই লিং দ্বীপের কাছে নোঙর করে পড়ে আছে।

জাহাজটির আটজন কর্মীই ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক। তিন মাস ধরে তাঁরা কোনো বেতন পাননি। মালিকপক্ষ কার্যত অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় তাঁদের অবস্থা দিন দিন আরও সংকটজনক হয়ে উঠেছে।

খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী তাঁদের সরবরাহ করছেন পুরোহিত ও নাবিকদের শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা। কখনো জাহাজের পেছন থেকে মাছ ধরে তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। জাহাজের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী যন্ত্রও প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায়। তখন গরম ও বদ্ধ কক্ষে আলো কিংবা বাতাসের ব্যবস্থাও থাকে না।

প্রধান প্রকৌশলী সুয়ার্তা জানিয়েছেন, বৃষ্টি না হলে তাঁদের গোসল করার কিংবা কাপড় ধোয়ারও সুযোগ থাকে না।

একই জাহাজে আগেও ঘটেছিল একই ঘটনা

গ্র্যান্ড সানির মালিকদের বিরুদ্ধে নাবিকদের পরিত্যক্ত করার অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের আগস্টেও একই জাহাজ হংকংয়ে জরুরি ভিত্তিতে ঢুকেছিল। তখনকার নাবিকেরা জানিয়েছিলেন, কয়েক মাস ধরে তাঁদের বেতন দেওয়া হয়নি এবং খাবার ও পানির মজুতও ফুরিয়ে আসছিল।

হংকং ও ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষের চাপের মুখে সে সময় মালিকপক্ষ নাবিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে বাধ্য হয়। পরে নতুন কর্মী জাহাজটিতে যোগ দেন। কিন্তু জাহাজটি ক্রমে সমুদ্রযাত্রার অনুপযোগী হয়ে পড়লেও নোঙর করে পড়ে থাকে। ধারণা করা হচ্ছিল, মালিকপক্ষ এটিকে ভেঙে পুরোনো লোহা হিসেবে বিক্রি করতে চায়।

এরপর মালিকপক্ষই উধাও হয়ে যায়।

আদালতের দ্বারস্থ নাবিকেরা

জাহাজটির মালিক প্রতিষ্ঠানটির হংকংয়ের নিবন্ধিত কার্যক্রম এখন কার্যত অচল। সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের হংকংভিত্তিক পরিদর্শক জেসন লাম বলেন, মালিক যেন পালিয়ে গেছেন। তিনিই ফাদার ভ্যালানের সঙ্গে মিলে আট নাবিককে একজন আইনজীবীর সহায়তা দিয়েছেন।

এখন বিষয়টি হংকংয়ের উচ্চ আদালতে রয়েছে। আদালত যদি জাহাজটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে, তাহলে সেটি জব্দ করে পুরোনো লোহা হিসেবে বিক্রি করা হতে পারে। সেই অর্থ থেকে নাবিকদের দেশে ফেরানোর খরচ এবং তাঁদের বকেয়া মজুরি পরিশোধের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে।

জাহাজের অধিনায়ক সান্তোস মালিকের কথা উঠতেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর কথায়, তাঁদের পরিবার আছে, সন্তান আছে। অথচ তাঁদের কোনো টাকা না দিয়ে এত দীর্ঘ সময় জাহাজে ফেলে রাখা হয়েছে।

‘এখন থাকতে হবে, নইলে টাকা হারাতে পারেন’

সম্প্রতি ফাদার ভ্যালান যখন গ্র্যান্ড সানিতে যান, তখন নাবিকেরা অন্ধকার ও গুমোট রান্নাঘরে সামান্য খাবার ভাগ করে খাচ্ছিলেন। তিনি তাঁদের আদালতের মামলার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানান।

তিনি নাবিকদের বলেন, আপাতত তাঁদের জাহাজেই থাকতে হবে। তাঁরা হতাশ—এ কথা তিনি বোঝেন। কিন্তু এখন চলে গেলে বকেয়া টাকা পাওয়ার সুযোগও হারাতে পারেন। আরও দুই-তিন মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি তাঁদের স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন এবং প্রয়োজন হলে যোগাযোগ করতে বলেন।

এরপর তিনি তাঁদের ধর্মের কথা জিজ্ঞেস করেন। সবাই জানান, তাঁরা মুসলমান। তাঁরা নামাজ পড়েন কি না জানতে চাইলে সবাই মাথা নাড়েন।

ফাদার ভ্যালান তখন শুধু বলেন, তাঁরা নিজেদের জায়গা থেকে যতটা সম্ভব চেষ্টা করছেন, কিন্তু কখনো কখনো ওপরের সাহায্যেরও প্রয়োজন হয়।

সমুদ্রের বিশালতা, যুদ্ধের অনিশ্চয়তা, মালিকের প্রতারণা কিংবা দীর্ঘদিনের বেতনহীনতা—সবকিছুর মাঝেও তাই এই নাবিকদের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এমন কিছু মানুষ, যাঁদের সঙ্গে তাঁদের কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। তাঁদের কাছে মানবিক সহায়তাই সবচেয়ে বড় পরিচয়।

অচেনা বন্দরে একটুখানি আপনজনের স্পর্শই কখনো কখনো একজন বিপন্ন নাবিকের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে।

জনপ্রিয় সংবাদ

২০২৪ সাল থেকে একাধিক দেশে মাদক পাচার করেছেন মালয়েশিয়ার পাইলট

অচেনা বন্দরে নাবিকদের পাশে এক পুরোহিত, বিপন্ন সমুদ্রযাত্রীদের আশ্রয়ের শেষ ভরসা

১১:১৩:৫৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

হংকংয়ের ব্যস্ত সমুদ্রবন্দরে বৃষ্টি কিংবা প্রচণ্ড গরম—কোনো কিছুই থামাতে পারে না ফাদার ভ্যালান অ্যারকিয়াস্বামিকে। সপ্তাহে তিন দিন ছোট নৌকায় করে তিনি ছুটে যান বন্দরে নোঙর করা বিশাল পণ্যবাহী জাহাজগুলোর কাছে। উদ্দেশ্য একটাই—দূরদেশ থেকে আসা নাবিকদের যেন অচেনা বন্দরে নিজেদের একা মনে না হয়।

৫৭ বছর বয়সী এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্যাথলিক পুরোহিত বছরে পাঁচ শতাধিক জাহাজে যান। জাহাজের উঁচু গা বেয়ে দড়ির মই দিয়ে উঠে তিনি নাবিকদের হাতে তুলে দেন খাবার, সংবাদপত্র ও প্রয়োজনীয় তথ্যপত্র। কখনো জাহাজের অধিনায়কের সঙ্গে চা পান করেন, কখনো অসুস্থ নাবিকের খোঁজ নেন, আবার কখনো কারাগারে থাকা সমুদ্রযাত্রীদের পাশে দাঁড়ান।

অচেনা বন্দরে আপনজন হয়ে ওঠা

ফাদার ভ্যালান এমন একটি ছোট দলের অংশ, যেখানে বিভিন্ন খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়ের পুরোহিত ও স্বেচ্ছাসেবকেরা বিশ্বের প্রায় ২৫ লাখ সমুদ্রযাত্রীর সেবা করেন। তাঁদের কাজ শুধু ধর্মীয় সেবা দেওয়া নয়। শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করে নাবিকদের অধিকার রক্ষা, হাসপাতাল ও কারাগারে থাকা নাবিকদের খোঁজ নেওয়া এবং বিপদে পড়া কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করাও তাঁদের দায়িত্বের অংশ।

তবে ফাদার ভ্যালানের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আরও মানবিক। তাঁর ভাষায়, তাঁদের লক্ষ্য হলো অচেনা জায়গায় থাকা নাবিকদের মনে করানো—তাঁরা একা নন।

The mission: making seafarers 'feel welcome in a strange place' - The Globe and Mail

এক জাহাজ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় এক লাজুক নাবিক তাঁর কাছে এগিয়ে এলে তিনি বলেন, পৃথিবীর যেখানেই কোনো সমস্যা হোক, তাঁদের ফোন করতে। পরে অবশ্য তাঁর আফসোস হয়, সাধারণ নাবিকদের সঙ্গে সেদিন আরও কিছু সময় কাটাতে পারেননি।

ধর্ম নিয়ে তিনি কখনো জোর করে কথা বলেন না। তাঁর মতে, সাধারণ আলাপ থেকেই ধীরে ধীরে ঈশ্বর, ধর্ম ও জীবনের নানা গভীর প্রশ্ন উঠে আসে। নাবিকেরা জানতে চান, কীভাবে তিনি পুরোহিত হলেন। সেই কথোপকথন থেকেই হয়তো কারও মনে বিশ্বাসের নতুন দরজা খুলে যেতে পারে।

যুদ্ধের ধাক্কায় আরও কঠিন হয়েছে সমুদ্রযাত্রা

বিশ্বের সমুদ্রযাত্রীদের জীবন এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু চলতি বছর তাঁদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচল কার্যত থমকে গেছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর হয়ে যাত্রা আরও বিপজ্জনক হয়ে পড়ায় অনেক জাহাজকে দীর্ঘ বিকল্প পথে যেতে হচ্ছে।

এর ফলে সমুদ্রে একটি জাহাজের কর্মীদের অবস্থানের সময় কয়েক মাস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার হিসাবে, হরমুজ প্রণালির আশপাশে প্রায় ছয় হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন।

ভারত, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো বিশ্বের বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক নাবিক সরবরাহ করে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত এসব দেশেও পড়েছে। ফলে বিদেশে কর্মরত নাবিকদের পাঠানো অর্থ এখন তাঁদের পরিবারের জন্য আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পরিত্যক্ত জাহাজে আটকে আট ইন্দোনেশীয়

নাবিকদের দুর্দশার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠেছে ‘গ্র্যান্ড সানি’ নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজ। ২২ বছর পুরোনো এই জাহাজটি বর্তমানে হংকংয়ের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হেই লিং দ্বীপের কাছে নোঙর করে পড়ে আছে।

জাহাজটির আটজন কর্মীই ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক। তিন মাস ধরে তাঁরা কোনো বেতন পাননি। মালিকপক্ষ কার্যত অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় তাঁদের অবস্থা দিন দিন আরও সংকটজনক হয়ে উঠেছে।

খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী তাঁদের সরবরাহ করছেন পুরোহিত ও নাবিকদের শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা। কখনো জাহাজের পেছন থেকে মাছ ধরে তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। জাহাজের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী যন্ত্রও প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায়। তখন গরম ও বদ্ধ কক্ষে আলো কিংবা বাতাসের ব্যবস্থাও থাকে না।

প্রধান প্রকৌশলী সুয়ার্তা জানিয়েছেন, বৃষ্টি না হলে তাঁদের গোসল করার কিংবা কাপড় ধোয়ারও সুযোগ থাকে না।

একই জাহাজে আগেও ঘটেছিল একই ঘটনা

গ্র্যান্ড সানির মালিকদের বিরুদ্ধে নাবিকদের পরিত্যক্ত করার অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের আগস্টেও একই জাহাজ হংকংয়ে জরুরি ভিত্তিতে ঢুকেছিল। তখনকার নাবিকেরা জানিয়েছিলেন, কয়েক মাস ধরে তাঁদের বেতন দেওয়া হয়নি এবং খাবার ও পানির মজুতও ফুরিয়ে আসছিল।

হংকং ও ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষের চাপের মুখে সে সময় মালিকপক্ষ নাবিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে বাধ্য হয়। পরে নতুন কর্মী জাহাজটিতে যোগ দেন। কিন্তু জাহাজটি ক্রমে সমুদ্রযাত্রার অনুপযোগী হয়ে পড়লেও নোঙর করে পড়ে থাকে। ধারণা করা হচ্ছিল, মালিকপক্ষ এটিকে ভেঙে পুরোনো লোহা হিসেবে বিক্রি করতে চায়।

এরপর মালিকপক্ষই উধাও হয়ে যায়।

আদালতের দ্বারস্থ নাবিকেরা

জাহাজটির মালিক প্রতিষ্ঠানটির হংকংয়ের নিবন্ধিত কার্যক্রম এখন কার্যত অচল। সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের হংকংভিত্তিক পরিদর্শক জেসন লাম বলেন, মালিক যেন পালিয়ে গেছেন। তিনিই ফাদার ভ্যালানের সঙ্গে মিলে আট নাবিককে একজন আইনজীবীর সহায়তা দিয়েছেন।

এখন বিষয়টি হংকংয়ের উচ্চ আদালতে রয়েছে। আদালত যদি জাহাজটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে, তাহলে সেটি জব্দ করে পুরোনো লোহা হিসেবে বিক্রি করা হতে পারে। সেই অর্থ থেকে নাবিকদের দেশে ফেরানোর খরচ এবং তাঁদের বকেয়া মজুরি পরিশোধের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে।

জাহাজের অধিনায়ক সান্তোস মালিকের কথা উঠতেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর কথায়, তাঁদের পরিবার আছে, সন্তান আছে। অথচ তাঁদের কোনো টাকা না দিয়ে এত দীর্ঘ সময় জাহাজে ফেলে রাখা হয়েছে।

‘এখন থাকতে হবে, নইলে টাকা হারাতে পারেন’

সম্প্রতি ফাদার ভ্যালান যখন গ্র্যান্ড সানিতে যান, তখন নাবিকেরা অন্ধকার ও গুমোট রান্নাঘরে সামান্য খাবার ভাগ করে খাচ্ছিলেন। তিনি তাঁদের আদালতের মামলার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানান।

তিনি নাবিকদের বলেন, আপাতত তাঁদের জাহাজেই থাকতে হবে। তাঁরা হতাশ—এ কথা তিনি বোঝেন। কিন্তু এখন চলে গেলে বকেয়া টাকা পাওয়ার সুযোগও হারাতে পারেন। আরও দুই-তিন মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি তাঁদের স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন এবং প্রয়োজন হলে যোগাযোগ করতে বলেন।

এরপর তিনি তাঁদের ধর্মের কথা জিজ্ঞেস করেন। সবাই জানান, তাঁরা মুসলমান। তাঁরা নামাজ পড়েন কি না জানতে চাইলে সবাই মাথা নাড়েন।

ফাদার ভ্যালান তখন শুধু বলেন, তাঁরা নিজেদের জায়গা থেকে যতটা সম্ভব চেষ্টা করছেন, কিন্তু কখনো কখনো ওপরের সাহায্যেরও প্রয়োজন হয়।

সমুদ্রের বিশালতা, যুদ্ধের অনিশ্চয়তা, মালিকের প্রতারণা কিংবা দীর্ঘদিনের বেতনহীনতা—সবকিছুর মাঝেও তাই এই নাবিকদের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এমন কিছু মানুষ, যাঁদের সঙ্গে তাঁদের কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। তাঁদের কাছে মানবিক সহায়তাই সবচেয়ে বড় পরিচয়।

অচেনা বন্দরে একটুখানি আপনজনের স্পর্শই কখনো কখনো একজন বিপন্ন নাবিকের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে।