খাবারের প্যাকেটে লেখা ‘বেস্ট-বিফোর’ তারিখ দেখেই অনেকেই মনে করেন, ওই দিন পার হলেই খাবারটি আর খাওয়া নিরাপদ নয়। ফলে সামান্য তারিখ পেরোলেই ভালো খাবারও ফেলে দেওয়া হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, বেস্ট-বিফোর তারিখ মূলত খাবারের মান ও সতেজতার নির্দেশক, সবসময় নিরাপত্তার শেষসীমা নয়।
সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অনেক মানুষ এখনো এই তারিখের প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না। ফলে অপ্রয়োজনে বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট হচ্ছে।
বেস্ট-বিফোর তারিখ আসলে কী বোঝায়
বেস্ট-বিফোর তারিখ সাধারণত বোঝায়, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং প্যাকেট না খোলা থাকলে ওই সময় পর্যন্ত খাবারটি তার স্বাদ, গন্ধ, গঠন, সতেজতা ও পুষ্টিমান সবচেয়ে ভালো অবস্থায় থাকার কথা।
অর্থাৎ, বেস্ট-বিফোর তারিখ পার হয়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে খাবারটি সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট হয়ে গেছে। খাবারটি কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, প্যাকেট খোলা হয়েছে কি না এবং খাবারে নষ্ট হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
কানাডায় যেসব মোড়কজাত খাবারের স্বাভাবিক স্থায়িত্ব ৯০ দিন বা তার কম, সেগুলোর বেশির ভাগের ক্ষেত্রে বেস্ট-বিফোর তারিখ উল্লেখ করা প্রয়োজন। তবে ৯০ দিনের বেশি স্থায়ী খাবার, যেমন টিনজাত খাবার, শুকনো পাস্তা ও হিমায়িত খাবারের ক্ষেত্রে এই তারিখ বাধ্যতামূলক নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান অবশ্য স্বেচ্ছায় তারিখ উল্লেখ করে।
তারিখ পেরোলেও যেসব খাবার ভালো থাকতে পারে
সঠিকভাবে এবং একটানা ঠান্ডা পরিবেশে সংরক্ষণ করা হলে কিছু দুগ্ধজাত খাবার বেস্ট-বিফোর তারিখের পরও বেশ কিছুদিন খাওয়ার উপযোগী থাকতে পারে।
দুধ অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত তারিখের পর আরও প্রায় সাত দিন ভালো থাকতে পারে। দই সাত থেকে ১০ দিন পর্যন্ত ভালো থাকার সম্ভাবনা থাকে। শক্ত ধরনের পনির আবার কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য থাকতে পারে।
প্যাকেটজাত পাউরুটি, গোল রুটি ও মাফিনেও একই বিষয় প্রযোজ্য। বেস্ট-বিফোর তারিখ পার হওয়ার কয়েক দিন পরও এগুলো খাওয়া যেতে পারে, যদি তাতে ছত্রাক বা নষ্ট হওয়ার অন্য কোনো লক্ষণ না থাকে।
চাল, পাস্তা, সকালের শুকনো খাদ্যশস্য ও বিস্কুটের মতো শুকনো খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে বেস্ট-বিফোর তারিখের কয়েক মাস পরও খাওয়ার উপযোগী থাকতে পারে। তবে সময়ের সঙ্গে এগুলোর স্বাদ, গঠন ও পুষ্টিমান কিছুটা কমে যেতে পারে।
তবে এগুলো কোনো নিশ্চয়তা নয়। প্রতিটি খাবারের ক্ষেত্রে সংরক্ষণের ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করা জরুরি।
চোখ, নাক ও স্বাদ দিয়ে পরীক্ষা—তবু সতর্কতা জরুরি
তারিখ পার হয়ে গেলে খাবারটি দেখুন, গন্ধ নিন এবং প্রয়োজন হলে স্বাদ পরীক্ষা করুন। অস্বাভাবিক গন্ধ, পচন, ছত্রাক বা অন্য কোনো পরিবর্তন দেখা গেলে খাবারটি ফেলে দিতে হবে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—শুধু চোখ, নাক বা জিহ্বা দিয়ে সব ধরনের ক্ষতিকর জীবাণু বা বিষাক্ত পদার্থ শনাক্ত করা যায় না। তাই খাবারটি নিয়ে সন্দেহ থাকলে ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো।
কিছু খাবারের ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক থাকতে হবে
তাজা মাংস, হাঁস-মুরগি, মাছ ও সামুদ্রিক খাবারের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। একইভাবে মাংসের তৈরি প্রস্তুত খাবার, আগে থেকে তৈরি সালাদ, প্রস্তুত খাবার এবং কাটা ফল ও সবজিও দ্রুত নষ্ট হতে পারে।
এসব খাবারে ক্ষতিকর জীবাণু দ্রুত বেড়ে উঠতে পারে। এমনকি ফ্রিজে রাখলেও শুধু বেস্ট-বিফোর তারিখ দেখে এগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং যত দ্রুত সম্ভব খেয়ে ফেলা গুরুত্বপূর্ণ।
কখন খাবার অবশ্যই ফেলে দেবেন
খাবার থেকে টক, পচা বা অস্বাভাবিক গন্ধ বের হলে তা খাওয়া উচিত নয়। খাবারে দৃশ্যমান ছত্রাক দেখা দিলে, প্যাকেট ফুলে উঠলে, পাত্রে ছিদ্র বা ফুটো থাকলে কিংবা মোড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাবারটি ফেলে দিতে হবে।
এ ছাড়া কোনো খাবার এমনভাবে সংরক্ষণ করা হয়ে থাকলে, যাতে সেটি প্রয়োজনীয় সময়ের জন্য ঠান্ডায় রাখা হয়নি, সেটিও খাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে যে খাবার ফ্রিজে রাখা বাধ্যতামূলক, সেটি দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে থাকলে শুধু বেস্ট-বিফোর তারিখের ওপর নির্ভর করা বিপজ্জনক হতে পারে।
মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ আর বেস্ট-বিফোর এক নয়
‘মেয়াদোত্তীর্ণ’ তারিখের বিষয়টি আলাদা। কিছু নির্দিষ্ট খাবারের ক্ষেত্রে এই তারিখ পার হওয়ার পর খাবারটির নির্ধারিত পুষ্টিমান বা গঠনগত বৈশিষ্ট্য আর বজায় নাও থাকতে পারে। এসব পণ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক এবং তারিখ পার হওয়ার পর সেগুলো খাওয়া উচিত নয়।
এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট ধরনের তরল পুষ্টিকর খাদ্য, খাবারের বিকল্প পণ্য, পুষ্টি-পরিপূরক, শিশুর দুধের গুঁড়া ও খুব কম ক্যালরিযুক্ত বিশেষ খাদ্য।
‘মোড়কজাতের তারিখ’ ও ‘প্রস্তুতের তারিখ’ কী
কিছু খাবারের ক্ষেত্রে ‘মোড়কজাতের তারিখ’ ব্যবহার করা হয়। একই দোকানে প্রস্তুত ও বিক্রি করা তাজা মাংস, প্রস্তুত খাবার, বেকারি পণ্য কিংবা মাংসজাত খাবারে এমন তারিখ দেখা যেতে পারে। এটি মূলত খাবারটি কখন মোড়কজাত করা হয়েছিল তা জানায়।
অন্যদিকে ‘প্রস্তুতের তারিখ’ বোঝায় খাবারটি কখন তৈরি বা প্রস্তুত করা হয়েছে। দোকানে তৈরি সালাদ, স্যান্ডউইচ, স্যুপ ও বিভিন্ন প্রস্তুত খাবারে এই তথ্য থাকতে পারে।
এই দুই ধরনের তারিখ খাবারের সতেজতা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে, কিন্তু এগুলো একা খাবারটি নিরাপদ কি না, তার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
তারিখ নয়, খাবারের অবস্থাও দেখুন
খাবারের প্যাকেটে লেখা তারিখ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি তারিখকে খাবারের নিরাপত্তা নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। খাবারটি কখন খোলা হয়েছে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, কতক্ষণ ঠান্ডায় ছিল এবং বর্তমানে তার চেহারা ও গন্ধ কেমন—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, খাবার যদি সন্দেহজনক মনে হয়, শুধু তারিখের কারণে সেটিকে খাওয়ার চেষ্টা করাও উচিত নয়। নিরাপদ থাকার সবচেয়ে ভালো নীতি হলো—সন্দেহ হলে ফেলে দিন।
ভালোভাবে সংরক্ষিত খাবার শুধু বেস্ট-বিফোর তারিখ পার হয়েছে বলেই সবসময় নষ্ট হয়ে যায় না। সঠিক তথ্য জানা থাকলে অপ্রয়োজনীয় খাবার অপচয় কমানোর পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্যাভ্যাসও বজায় রাখা সম্ভব।
খাবারের অপচয় কমাতে তাই প্যাকেটের তারিখ দেখার পাশাপাশি খাবারটির সংরক্ষণ ও বর্তমান অবস্থার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















