ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে দীর্ঘ নয় মাসের সামরিক অভিযানে থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের জীবনযাপন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শনিবার রণতরীটি পরিদর্শন করেছেন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযানের দায়িত্বে থাকা কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার।
মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কুপারের এই সফর ছিল ১০ দিনের মধ্যপ্রাচ্য সফরের শেষ পর্যায়। সফরে তিনি বাহরাইন, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও পরিদর্শন করেন।
দীর্ঘদিন বন্দরে না থামায় বাড়ছে চাপ
আব্রাহাম লিংকন টানা প্রায় নয় মাস ধরে যুদ্ধকালীন দায়িত্ব পালন করছে। এই সময়ে রণতরীটি কোনো বন্দরে থামতে পারেনি। ফলে জাহাজে তাজা খাবার ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় সমস্যা এবং কিছু নাবিকের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের একজন জানিয়েছেন, আগস্টের শুরুতে একজন ব্যক্তি রণতরী থেকে পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন। পরে তাকে দ্রুত উদ্ধার করা হয়।
আইনপ্রণেতারাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে জানতে চেয়েছেন, জাহাজের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে কি না, যাতে নাবিকদের নিরাপত্তা ও সুস্থতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
আব্রাহাম লিংকন ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন বোমা হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে চলমান মার্কিন নৌ অবরোধেও রণতরীটি অংশ নিচ্ছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হাং কাও জানিয়েছেন, রণতরীটি ২০০ দিনেরও বেশি সময় যুদ্ধক্ষেত্রের এলাকায় কাটিয়েছে এবং ১০ হাজারের বেশি বিমান অভিযান পরিচালনা করেছে।
অ্যাডমিরাল কুপার রণতরীটির নাবিকদের প্রশংসা করে বলেছেন, এই বাহিনী অত্যন্ত দক্ষ এবং তাদের অর্জন নিয়ে গর্ব করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তার মতে, ইতিহাস আধুনিক যুগের সবচেয়ে তীব্র ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানগুলোর একটি হিসেবে এই মিশনকে স্মরণ করবে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
রণতরীর পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপিত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। মার্কিন নৌবাহিনীও জানিয়েছে, জাহাজে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে—এমন কোনো প্রমাণ তারা দেখেনি।

তবে হাং কাও স্বীকার করেছেন, অল্পসংখ্যক নাবিক মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার জন্য চিকিৎসা নিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বেশি থাকলে নাবিকদের ফোন ব্যবহারের সুযোগও সীমিত করা হয়েছে। সরবরাহ জাহাজ না পৌঁছালে খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনা হয়েছে, তবে কোনো খাবার পরিবেশন বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেছে নৌবাহিনী।
দীর্ঘ অবরোধে আরও বাড়তে পারে চাপ
সাধারণ পরিস্থিতিতে বিমানবাহী রণতরীগুলো নিয়মিত বন্দরে গিয়ে জ্বালানি, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে। একই সঙ্গে নাবিকেরা কয়েক দিনের জন্য বিশ্রাম ও মানসিকভাবে নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ পান। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আব্রাহাম লিংকন সেই সুযোগ পায়নি।
ইরানের ওপর সামরিক চাপ আরও বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন অ্যাডমিরাল কুপার। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের হামলার জবাবে সীমিত বিমান হামলা চালানো হলেও তাতে তেহরানকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের জন্য হুমকি সৃষ্টি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া থেকে বিরত রাখা যায়নি।
তবে সর্বাত্মক যুদ্ধে আবারও জড়িয়ে পড়তে অনিচ্ছুক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে ঝুঁকেছেন। ইরানের বন্দর অবরোধ এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দেশটির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করাই এখন মার্কিন কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে এই নৌ অবরোধ অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়া হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমাত্রার যুদ্ধকালীন দায়িত্ব পালন করলে জাহাজ ও নাবিকদের ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা।
ইরান যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, আব্রাহাম লিংকনের মতো মার্কিন যুদ্ধজাহাজের নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক চাপও তত গভীর হতে পারে—এমন উদ্বেগই এখন সামনে এসেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















