বই পড়তে গিয়ে অনেকেই গল্পের চরিত্র, ঘরবাড়ি কিংবা প্রকৃতির দৃশ্যকে মনের পর্দায় সিনেমার মতো দেখতে পান। কিন্তু ক্রিস্টাল ম্যাকডুগালের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি কল্পনা করতে পারেন, অনুভব করতে পারেন, শব্দ শুনতে পারেন—কিন্তু মনের ভেতর কোনো দৃশ্য দেখতে পান না। জীবনের মাঝামাঝি বয়সে এসে তিনি জানতে পারেন, এই অভিজ্ঞতার একটি নাম আছে—অ্যাফ্যান্টাসিয়া।
সমুদ্র কল্পনা করতে গিয়ে প্রথম উপলব্ধি
ঘুম না এলে ক্রিস্টাল কখনো কখনো নির্দেশিত ধ্যান শুনতেন। সেখানে তাকে সমুদ্রসৈকতে নিজেকে কল্পনা করতে বলা হতো। পায়ের আঙুলের ফাঁকে বালুর স্পর্শ, ঢেউয়ের শব্দ, সূর্যের উষ্ণতা কিংবা দিগন্তে সূর্যাস্ত—সবকিছু অনুভব করার নির্দেশ থাকত।
তিনি শিশুদের হাসির শব্দ শুনতে পারতেন, ত্বকে সূর্যের উষ্ণতা অনুভব করতে পারতেন, এমনকি নারকেলের গন্ধযুক্ত রোদ প্রতিরোধক ক্রিমের গন্ধও কল্পনা করতে পারতেন। কিন্তু সৈকতের দৃশ্যটি দেখতে পারতেন না।
তখনও তিনি জানতেন না যে অন্য মানুষ সত্যিই চোখ বন্ধ করে এমন দৃশ্য মনের মধ্যে দেখতে পারেন।

‘আপেল কল্পনা করুন’
বিশের কোঠার মাঝামাঝি সময়ে এক সহকর্মীর কাছ থেকে অ্যাফ্যান্টাসিয়া সম্পর্কে জানতে পারেন ক্রিস্টাল। সহকর্মী তাকে বলেছিলেন, চোখ বন্ধ করে একটি আপেল কল্পনা করতে।
ক্রিস্টালের কাছে নির্দেশটি ছিল অদ্ভুত। কারণ সারা জীবন মানুষ তাকে ‘কিছু কল্পনা করতে’ বলেছে, কিন্তু সেই কথার অর্থ তার কাছে কখনোই দৃশ্য দেখার সঙ্গে যুক্ত ছিল না।
চোখ বন্ধ করে তিনি শুধু অন্ধকার দেখলেন, সঙ্গে পুরোনো টেলিভিশনের পর্দার মতো সামান্য ঝিরঝিরে অনুভূতি।
সহকর্মী জানতে চাইলেন, আপেলটির রং কী।
ক্রিস্টালের উত্তর ছিল, কোনো আপেলই তো নেই। তাহলে তার রং কীভাবে বলবেন?
তখনই সহকর্মীর মনে হলো, ক্রিস্টালের অ্যাফ্যান্টাসিয়া থাকতে পারে।
এত বছরেও কেন বুঝতে পারেননি?
অ্যাফ্যান্টাসিয়া সম্পর্কে জানার পর ক্রিস্টাল দিনের বাকি সময় কাজ করতে পারেননি। তিনি এ বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং একই অভিজ্ঞতার মানুষদের লেখা পড়তে থাকেন।
পরে জানতে পারেন, বিষয়টি সবার ক্ষেত্রে একই রকম নয়। কারও মনের ছবিটি খুব অস্পষ্ট, কেউ আবার একেবারেই কোনো ছবি দেখতে পান না। ক্রিস্টাল দ্বিতীয় দলের।

তিনি দীর্ঘদিন ভাবতেন, বই পড়ার সময় অন্যরা নিশ্চয়ই তার মতোই শুধু পাতার শব্দগুলো দেখেন। পরে বুঝতে পারেন, অনেক পাঠক গল্পের দৃশ্যকে মনের মধ্যে প্রায় সিনেমার মতো দেখতে পান।
এই পার্থক্যটি জানার পর তাদের প্রতি তার এক ধরনের ঈর্ষাও তৈরি হয়।
ছবি নেই, কিন্তু কল্পনা আছে
অ্যাফ্যান্টাসিয়া থাকার অর্থ যে কল্পনাশক্তি নেই, তা নয়। ক্রিস্টাল নিজেই বুঝেছেন, তিনি কল্পনা করতে পারেন—তবে অন্যভাবে।
তিনি চরিত্রের কণ্ঠস্বর, স্বরভঙ্গি ও আবেগ শুনতে পারেন। মানুষের মুখ মনে রাখার ক্ষেত্রেও তিনি বেশ ভালো। অথচ কোনো ব্যক্তিকে আঁকিয়ে দিয়ে তার চেহারা পুনর্গঠন করতে বললে সমস্যায় পড়েন।
এ কারণে তিনি কল্পনানির্ভর সাহিত্যেও নিজের পছন্দের ধরন বদলেছেন। অতিরিক্ত দৃশ্যবর্ণনানির্ভর কাহিনির চেয়ে অনুভূতি ও সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া প্রেমের গল্প তার বেশি পছন্দ।
লেখালেখি করার সময়ও তাকে পুনর্লিখনের পর্যায়ে বাস্তব ছবি দেখে দৃশ্যের বর্ণনা যোগ করতে হয়।
মায়ের স্মৃতি হারানোর ভয়
অ্যাফ্যান্টাসিয়া সম্পর্কে জানার অল্পদিন পরই ক্রিস্টালের মা ক্যানসারে মারা যান। তখন তার ভয় হয়েছিল, মায়ের মুখ মনের মধ্যে দেখতে না পারলে হয়তো একসময় মায়ের স্মৃতিও মুছে যাবে।
কিন্তু পরে তিনি বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করেন। মায়ের মুখ কল্পনায় দেখতে না পাওয়ার কারণে মায়ের অসুস্থতার যন্ত্রণাদায়ক দৃশ্যগুলোও হঠাৎ করে মনের মধ্যে ভেসে ওঠে না।

তবে প্রায় এক দশক পরও তিনি মায়ের হাসির শব্দ স্পষ্টভাবে মনে করতে পারেন। তার কাছে এটিই মনের কাজ করার এক ভিন্ন ধরনের সৌন্দর্য।
ছেলের কল্পনায় নিজের অজানা জগৎ
একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে ছোট ছেলে পেছনের আসন থেকে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিল, সে কল্পনা করছে—একজন নিনজা এক বাড়ির ছাদ থেকে আরেক বাড়ির ছাদে লাফিয়ে যাচ্ছে।
ছেলের সেই কথা শুনে ক্রিস্টালের চোখে পানি চলে এসেছিল। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, তার ছেলে এমন একটি মানসিক জগৎ সহজেই তৈরি করতে পারে, যে জগৎ তার নিজের কাছে দৃশ্যমান নয়।
তবু নিজের মস্তিষ্কের এই ভিন্নতাকে মেনে নিতে শিখেছেন তিনি। বরং এখন তিনি কৃতজ্ঞ যে তার ছেলে এমন একটি পৃথিবীতে বড় হবে, যেখানে দৃশ্যের মাধ্যমে শেখা ও সৃষ্টিশীলতার সুযোগ তার জন্য সহজলভ্য।
অ্যাফ্যান্টাসিয়া তাই কল্পনাশক্তির অনুপস্থিতি নয়। এটি মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে স্মৃতি, কল্পনা ও অভিজ্ঞতাকে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে ধারণ করতে পারে, তারই একটি উদাহরণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















