কানাডার পণ্যের ওপর আরোপের কথা থাকা ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকরের সিদ্ধান্ত তিন দিনের জন্য স্থগিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। তবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র বাণিজ্য আলোচনার মধ্যেই শুল্ক স্থগিতের ঘোষণা এলো। নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল বুধবার মধ্যরাত থেকে। এর আওতায় কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য পড়ত।
তিন দিনের জন্য শুল্ক স্থগিত
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, চুক্তির প্রয়োজনীয় নথিপত্র চূড়ান্ত করার শর্তে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। এ কারণে তিনি নতুন শুল্ক তিন দিনের জন্য স্থগিত করছেন।
এর প্রায় এক ঘণ্টা পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এক বিবৃতিতে বলেন, আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে।

মঙ্গলবার বিকেলে ট্রাম্প ও কার্নির মধ্যে কথা হয়। চলতি সপ্তাহে এটি ছিল তাদের দ্বিতীয় ফোনালাপ। একই সময়ে দুই দেশের আলোচনাকারীরাও কয়েক সপ্তাহ ধরে পর্দার আড়ালে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে আসছিলেন।
কার্নি বলেন, এই আলোচনা চলার পাশাপাশি কানাডা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী, স্বাধীন ও প্রতিযোগিতামূলক করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
দুধ, মদ ও গাড়ি নিয়ে আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর জানিয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তিতে মার্কিন পণ্যের জন্য কানাডার বাজারে ব্যাপক প্রবেশাধিকার, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের সামঞ্জস্যসহ বেশ কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত ঘোষণায় ট্রাম্প বলেন, কানাডা দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, মদ এবং মোটরযানের ওপর শুল্কসংক্রান্ত মার্কিন উদ্বেগ মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য চুক্তির বিস্তারিত কিছু জানাননি। কানাডা সরকারও এখন পর্যন্ত সমঝোতার নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নিশ্চিত করেনি।
আলোচনায় কানাডার গাড়ির ওপর বিদ্যমান মার্কিন শুল্ক ছিল অন্যতম বড় বিরোধের জায়গা। দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব নিয়ে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
চাকরি হারানো ও ব্যবসা বন্ধের আশঙ্কা
নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে কানাডার কাঠ, মদ ও দুগ্ধশিল্পের মতো ঝুঁকিপূর্ণ খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে এর আগে সতর্ক করেছিলেন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও শিল্প কর্মকর্তারা।

তাদের আশঙ্কা ছিল, শুল্ক বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে, অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হতে পারে এবং চাকরি হারানোর ঘটনাও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের বৃহত্তর বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনাও জটিল হয়ে উঠতে পারত।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার দায়িত্বে থাকা কানাডার মন্ত্রী ডমিনিক লেব্লাঁ এবং প্রধান আলোচক জেনিস শারেতে গত সপ্তাহ থেকে ওয়াশিংটনে অবস্থান করছেন। সোমবার তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার ও বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করেন।
গাড়ির শুল্ক নিয়েও সমঝোতার চেষ্টা
দুই পক্ষ কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার বিষয়েও আলোচনা করেছে। গাড়িতে ব্যবহৃত মার্কিন উপাদানের পরিমাণের ভিত্তিতে আরও শুল্ক ছাড় দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় ছিল।
তবে কোন দেশের তৈরি উপাদান শুল্ক ছাড়ের হিসাবের মধ্যে ধরা হবে, তা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র শুধু মার্কিন উৎপাদিত উপাদানকে হিসাবের আওতায় রাখতে চেয়েছিল। অন্যদিকে কানাডা উত্তর আমেরিকার সব দেশের তৈরি উপাদান—কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর অংশ—হিসাবের মধ্যে রাখার দাবি জানায়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ গাড়ি নির্মাতাদের জন্য নতুন নিয়ম ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে কানাডা ও মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি রপ্তানিকারকদের গাড়িতে ব্যবহৃত মার্কিন উপাদানের পরিমাণ প্রত্যয়ন করার প্রক্রিয়া বছরে দুইবারের পরিবর্তে একবার করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কিস্টোন পাইপলাইন নিয়েও ট্রাম্পের ইঙ্গিত

শুল্ক স্থগিতের ঘোষণার পাশাপাশি কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বহুল আলোচিত কিস্টোন এক্সএল তেল পাইপলাইন প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন ট্রাম্প।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২১ সালে প্রকল্পটি বাতিল করেছিলেন। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরোধিতা এবং পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের মধ্যে ছিল।
তবে ট্রাম্প এবার প্রকল্পটি আবার চালু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিলেও এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত পরিকল্পনা জানাননি।
চূড়ান্ত চুক্তির অপেক্ষা
ট্রাম্পের শুল্ক স্থগিতের ঘোষণায় আপাতত কানাডার ওপর তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপ কমেছে। তবে দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে আলোচনার বাকি বিষয়গুলো কীভাবে সমাধান হয় তার ওপর।
কানাডা সরকার জানিয়েছে, আলোচনায় অগ্রগতি হলেও এখনো চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য কাজ করতে হবে। ফলে আগামী কয়েক দিন দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে শুল্ককে ব্যবহার করে আসছেন। কানাডার ক্ষেত্রে নতুন শুল্ক কার্যকরের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত দুই দেশের চলমান বাণিজ্য আলোচনাকে নতুন সুযোগ দিয়েছে। তবে এই সাময়িক বিরতি শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















