ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার ভ্যাকসিনের পরীক্ষায় বড় সাফল্য এসেছে। মডার্না ও মার্ক যৌথভাবে তৈরি পরীক্ষামূলক এমআরএনএ ভ্যাকসিন ইন্টিসমেরান উচ্চঝুঁকির মেলানোমা বা ত্বকের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের অস্ত্রোপচারের পর ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। চূড়ান্ত পর্যায়ের বৃহৎ পরীক্ষায় পাওয়া এই ফল ক্যানসারের চিকিৎসায় রোগীভিত্তিক ভ্যাকসিনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
পরীক্ষায় এক হাজারের বেশি রোগী অংশ নেন। তাদের সবার উচ্চঝুঁকির স্টেজ ২, ৩ অথবা ৪ মেলানোমা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছিল। এরপর রোগীদের ইন্টিসমেরানের সঙ্গে কিট্রুডা নামের একটি ইমিউনোথেরাপি দেওয়া হয়। তুলনায় অন্য একটি দল শুধু কিট্রুডা পেয়েছে।
গবেষণায় বড় সাফল্য
মডার্না ও মার্ক জানিয়েছে, শুধু কিট্রুডার তুলনায় ইন্টিসমেরান ও কিট্রুডার সমন্বিত চিকিৎসা রোগীদের ক্যানসারমুক্ত থাকার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ক্যানসার শরীরের অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমেছে।

যদিও কোম্পানি দুটি এখনো পরীক্ষার বিস্তারিত ফল প্রকাশ করেনি, তারা জানিয়েছে, গবেষণাটি প্রধান লক্ষ্য—ক্যানসার পুনরায় ফিরে না আসার সময় বাড়ানো—এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্বিতীয় লক্ষ্য—ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো—দুটিই পূরণ করেছে।
বার্টস ক্যানসার ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মার্কো গারলিঙ্গার এই ফলকে বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, মেলানোমার মতো প্রাণঘাতী ক্যানসার অস্ত্রোপচারের পর আবার ফিরে আসা ঠেকাতে তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় কোনো ভ্যাকসিনের সাফল্য প্রমাণের ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার ভ্যাকসিন কার্যকর হতে পারে—তারও প্রমাণ দেয়।
কীভাবে তৈরি হয় ব্যক্তিভিত্তিক ভ্যাকসিন
এই ভ্যাকসিনে ব্যবহার করা হয়েছে এমআরএনএ প্রযুক্তি, যা কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। প্রচলিত প্রতিরোধমূলক ভ্যাকসিনের বিপরীতে এটি প্রত্যেক রোগীর ক্যানসারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলাদাভাবে তৈরি করা হয়।
অস্ত্রোপচারের পর রোগীর টিউমারের নমুনা বিশ্লেষণ করে ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট জেনেটিক পরিবর্তন বা মিউটেশন শনাক্ত করা হয়। এরপর নির্বাচিত লক্ষ্যগুলো এমআরএনএতে যুক্ত করে এমন একটি ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়, যা রোগীর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে অবশিষ্ট ক্যানসার কোষ শনাক্ত ও ধ্বংস করতে প্রশিক্ষিত করে। প্রতিটি ডোজ তৈরি করতে প্রায় ছয় সপ্তাহ সময় লাগে। এর মধ্যে রোগী কিট্রুডা দিয়ে চিকিৎসা শুরু করতে পারেন।
আগের ছোট পরিসরের গবেষণায় ইন্টিসমেরান ও কিট্রুডার সমন্বিত চিকিৎসা শুধু কিট্রুডার তুলনায় মেলানোমা ফিরে আসা বা রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৯ শতাংশ এবং ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি ৫৯ শতাংশ কমিয়েছিল।
মেলানোমা চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা
ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্যসেবা তথ্য অনুযায়ী, মেলানোমা স্টেজ ৪-এ পৌঁছে শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়লে পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তবে নতুন চিকিৎসার কারণে বর্তমান ফলাফল এসব পুরোনো পরিসংখ্যানে পুরোপুরি প্রতিফলিত নাও হতে পারে। দেশটিতে প্রতিবছর এই রোগে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মানুষের মৃত্যু হয়।
মডার্না ও মার্ক ফুসফুস, মূত্রথলি ও কিডনি ক্যানসারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যক্তিভিত্তিক ভ্যাকসিন পরীক্ষা করছে। ফুসফুস ক্যানসারের পরীক্ষা তৃতীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিডনি ও মূত্রথলি ক্যানসারের গবেষণা চলছে দ্বিতীয় পর্যায়ে।
তবে চিকিৎসাটি রোগীদের কাছে পৌঁছানোর আগে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে ভ্যাকসিনে প্রকৃত সুবিধার মাত্রা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা ভ্যাকসিন তৈরির খরচ ও জটিলতা। উচ্চমূল্য শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাটির প্রাপ্যতাও সীমিত করতে পারে।
অনুমোদন পেলে আগামী বছরেই রোগীদের কাছে চিকিৎসাটি পৌঁছাতে পারে বলে আশা করছে মডার্না। এ বছরের শেষ দিকে একটি চিকিৎসাবিষয়ক সম্মেলনে পরীক্ষার আরও বিস্তারিত ফল প্রকাশ করবে কোম্পানি দুটি।
ক্যানসার ভ্যাকসিন গবেষণায় যুক্তরাজ্যও এগিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে উচ্চঝুঁকির কোলন ও মলাশয় ক্যানসারের রোগীদের নিয়ে বায়োএনটেকের একটি এমআরএনএ ভ্যাকসিনের পরীক্ষা চলছে। অস্ত্রোপচারের পরও যেসব রোগীর রক্তে টিউমারের ডিএনএর চিহ্ন থাকে, তাদের এই পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে ২০২৪ সালে প্রথম রোগী এই ধরনের ভ্যাকসিন গ্রহণ করেন। ক্যানসার ভ্যাকসিন লঞ্চ প্যাড কর্মসূচির মাধ্যমে এনএইচএসের রোগীদের নতুন ক্যানসার ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় যুক্ত করা হচ্ছে। অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার নিয়েও যুক্তরাজ্যে ব্যক্তিভিত্তিক ভ্যাকসিনের পরীক্ষা চলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















