প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আরব বিদ্রোহের অন্যতম নেতা হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পাওয়া টি. ই. লরেন্স জীবনের শেষদিকে নিজের খ্যাতির মূল্য যে কতটা কঠিনভাবে দিয়েছিলেন, নতুন করে পাওয়া একটি চিঠিতে তারই আভাস মিলেছে। ১৯৩২ সালে লেখা ওই চিঠিতে তিনি জানান, গুপ্তচর হিসেবে কাজ করার সন্দেহে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ তাকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
১৯১০-এর দশকে নাফুদ মরুভূমি পাড়ি দেওয়া, সিনাই অতিক্রম করা, আরব ভূখণ্ডে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দামেস্কে পৌঁছে যাওয়া লরেন্স ১৯৩০-এর দশকে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রেই বড় বাধার মুখে পড়েছিলেন। নতুন আবিষ্কৃত চিঠিটি তার সেই হতাশা ও ক্ষোভের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে।
গুপ্তচর সন্দেহে আটকে যায় বিদেশযাত্রা
১৯৩২ সালের ২২ অক্টোবর প্লাইমাউথের মাউন্ট ব্যাটেন স্টেশনে রয়্যাল এয়ার ফোর্সে দায়িত্ব পালনকালে চিঠিটি লেখেন লরেন্স। তিনি জানান, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, পারস্য, তুরস্ক, ভারত ও মিসরসহ বিভিন্ন দেশের ভিসা তিনি পাননি।
লরেন্সের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। কিন্তু এর আগের কয়েক বছরে সংবাদমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, তার আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক কর্মকাণ্ড আসলে ব্রিটিশ গুপ্তচরবৃত্তির আড়াল। ধারণা করা হয়, এসব প্রতিবেদনের প্রভাবেই বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার ওপর নানা ধরনের বাধা তৈরি হয়েছিল।

কূটনীতিকের সহায়তাও কাজে আসেনি
চিঠিটি লেখা হয়েছিল কূটনৈতিক বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মন্টেগু শিয়ারম্যান জুনিয়রের কাছে। ধারণা করা হয়, লরেন্সের ভিসা সমস্যার সমাধানে তিনি হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছিলেন। তবে সেই উদ্যোগও সফল হয়নি।
চিঠিতে লরেন্স কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি কূটনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও এক ধরনের হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, নিজের সম্পর্কে প্রকাশিত কোনো প্রতিবেদন সত্য না মিথ্যা—তা তিনি কখনো স্বীকার বা অস্বীকার করেননি। কিন্তু পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে আর কিছু করার ছিল না।
‘বিদেশ ভ্রমণ অসম্ভব হয়ে পড়েছিল’
লরেন্স লিখেছিলেন, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্র তার ক্ষেত্রে হয়তো এতটা আশঙ্কিত ছিল না। কিন্তু এশিয়া মাইনর, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া ও নীলনদ উপত্যকার মতো যেসব অঞ্চলে তার প্রত্নতাত্ত্বিক আগ্রহ ছিল, সেসব জায়গাতেই প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি নিজের অর্থ থাকলেও বিদেশ ভ্রমণ তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চিঠিটির আরেকটি তাৎপর্য হলো, এটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ‘টি. ই. শ’ নামে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর নিজের বিপুল খ্যাতি থেকে দূরত্ব তৈরি করতে লরেন্স এই নামটি গ্রহণ করেছিলেন।
খ্যাতির আড়ালে একাকিত্ব
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহে তার ভূমিকা তাকে আন্তর্জাতিক কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল। যুদ্ধের পর প্রথমে তিনি গণমাধ্যমের মনোযোগ গ্রহণ করলেও পরে এ নিয়ে অনুশোচনা প্রকাশ করেন। মার্কিন লেখক ও আলোকচিত্রী লোয়েল থমাসের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে তার খ্যাতি আরও ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে লরেন্সের আত্মজীবনী ‘সেভেন পিলারস অব উইজডম’ এবং ১৯৬২ সালে ডেভিড লিনের নির্মিত ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ চলচ্চিত্র তার কিংবদন্তিকে আরও স্থায়ী করে।
নিলামে উঠছে ঐতিহাসিক চিঠি
লরেন্সের মৃত্যুর তিন বছরেরও কম সময় আগে লেখা এই চিঠি তার জীবনের শেষ পর্যায়ের মানসিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। ১৯৩৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।
চিঠিটি বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে নিলামে তোলা হচ্ছে। অনলাইনে ইতোমধ্যে এর জন্য দর দেওয়া শুরু হয়েছে। নিলামকারী প্রতিষ্ঠানের হিসাবে চিঠিটির মূল্য সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৮০০ পাউন্ড হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















