০৩:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
গ্যাস সংকটে আশুলিয়ার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, বাড়ছে লোকসান-ছাঁটাইয়ের শঙ্কা ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, গুপ্তচর সন্দেহ: নতুন চিঠিতে ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’র আক্ষেপ ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার ভ্যাকসিনে যুগান্তকারী সাফল্য, ত্বকের ক্যানসার ফেরার ঝুঁকি কমার আশা ভিয়েতনামে মাত্র ৫৬৫০ ডলারে আসছে দুই আসনের বৈদ্যুতিক গাড়ি ফ্রেজার্সের হাতে হুগো বসের ৪৭.৮৯ শতাংশ শেয়ার ড. ইউনূস-আসিফ নজরুলসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা আবেদনের শুনানি, সিদ্ধান্ত পরে ঝিনাইদহে পুকুরে মিলল নিখোঁজ যুবকের মরদেহ, মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ ছিলেন ৪ দিন গোল্ডেন ডোম কি চীন-রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে পারবে? মার্কিন বিশেষজ্ঞদের বড় শঙ্কা প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের প্রভাব নিয়ে বেইজিংকে সতর্ক করল চীনা গবেষণা ‘এতটাই খারাপ’ যে সিনেমা দেখতে ভিড়, চীনে অদ্ভুত জনপ্রিয়তা পেল ব্যর্থ অ্যানিমেশন

স্যাটেলাইটের চোখে রুশ সেনা, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের কৌশল

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ড্রোনের পাশাপাশি এখন স্যাটেলাইট প্রযুক্তিও হয়ে উঠেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। উন্নত স্যাটেলাইট চিত্র দ্রুত সামনের সারির সেনাদের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় রুশ সেনাদের অবস্থান, সামরিক স্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভুল হামলা চালানোর সক্ষমতা অনেক বেড়েছে ইউক্রেনের।

কয়েক ঘণ্টা নয়, ছবি পৌঁছাচ্ছে কয়েক মিনিটেই

দক্ষিণ ইউক্রেনের রুশ নিয়ন্ত্রিত একটি এলাকায় এক রাতে দুই রুশ ড্রোনচালক একটি ছোট বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দূরে গাছপালার আড়ালে অবস্থান নেয় দুই ইউক্রেনীয় ড্রোনচালক। তাদের কাছে ছিল বিস্ফোরক বহনকারী একটি মাঝারি আকারের ড্রোন।

আগে এমন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো কঠিন ছিল। কারণ স্যাটেলাইটের ছবি সামনের সারির সেনাদের কাছে পৌঁছাতে অনেক সময় কয়েক দিন লেগে যেত। এর মধ্যে সেনা বা অস্ত্রের অবস্থান বদলে যেত।

এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। একটি সহায়ক দল স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ওই বাড়িটির নতুন ছবি সংগ্রহ করে দেখতে পায়, বাড়ির সামনে একটি গাড়ি রয়েছে। সেটিই সেখানে রুশ সেনাদের উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।

A drone operator sits amid trees at nighttime viewing a bright screen showing satellite imagery.

লক্ষ্য নিশ্চিত হওয়ার পর ড্রোন হামলার প্রস্তুতি নেয় ইউক্রেনীয় দল।

হাতের যন্ত্রেই লক্ষ্য খোঁজা ও হামলার প্রস্তুতি

স্যাটেলাইটের ছবি এখন শুধু উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তাদের হাতেই সীমাবদ্ধ নেই। সামনের সারির কিছু সেনাদল নিজেরাই স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করতে পারছে।

নেদারল্যান্ডসের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে স্যাটেলাইটের ছবি হাতে ধরা যন্ত্রে সরাসরি দেখা যায়। সেই যন্ত্র ব্যবহার করে ড্রোনচালকেরা লক্ষ্য খুঁজে বের করতে, ড্রোনের উড়ানের পথ নির্ধারণ করতে এবং প্রয়োজন হলে ড্রোন থেকে অস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতিও নিতে পারেন।

তবে বড় ধরনের ভুল এড়াতে হামলার আগে এখনো ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত হলেও নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়নি।

ক্রিমিয়া ঘিরে রুশ সরবরাহ ব্যবস্থায় আঘাত

স্যাটেলাইটনির্ভর এই নতুন কৌশল ইউক্রেনের রুশ অধিকৃত ক্রিমিয়া বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলায় ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার ব্যবহৃত ফেরিঘাট ধ্বংস করা হয়েছে। একই সঙ্গে উপদ্বীপটিতে সেনাদের জন্য অস্ত্র, খাদ্য ও অন্যান্য সরঞ্জাম পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথেও আঘাত করা হয়েছে।

A soldier holds a drone as he prepares it for a nighttime flight.

জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে ইউক্রেনের একটি পৃথক মানববিহীন ব্যবস্থা পরিচালনাকারী রেজিমেন্টও স্যাটেলাইটের ছবি ব্যবহার করে রুশ বাহিনীর কয়েকটি স্থাপনা শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে। এসব স্থাপনা থেকে ইউক্রেনীয় ড্রোনের যোগাযোগ ও পথনির্দেশে ব্যবহৃত উপগ্রহভিত্তিক সংকেত বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হতো।

ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর হামলাতেও একই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার হয়েছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির নতুন প্রতিযোগিতা

ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থায় আটকে আছে। ফলে সামরিক শক্তির পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির ওপরও দুই পক্ষের প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে।

ড্রোন আকাশে, স্থলে কিংবা সমুদ্রে—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর অস্ত্র হিসেবে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নজরদারি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করা যায়, তাদের সংকেতও বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে এসব ড্রোনের উড্ডয়নসীমা ও নজরদারির এলাকাও সীমিত।

এই জায়গাতেই স্যাটেলাইট বড় সুবিধা দিচ্ছে।

মহাকাশ থেকে একই এলাকার ছবি দিনে একাধিকবার পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে কোনো মাঠে নতুন গাড়ির চলাচল, গাছ কাটা, মাটিতে নতুন দাগ তৈরি হওয়া কিংবা কোনো এলাকায় নতুন করে জায়গা পরিষ্কার করার মতো ছোট পরিবর্তনও নজরে আসছে। এসব পরিবর্তন অনেক সময় গোপন সামরিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।

কয়েক মিনিটেই পাওয়া যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

ইউক্রেনের জন্য বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ব্যবহারের সুযোগ গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কোনো এলাকার ছবি পাওয়ার সময় মাত্র ১৫ মিনিটের মতো হতে পারে। অবশ্য অনেক সময় এতে কয়েক ঘণ্টাও লাগে। তবু সাম্প্রতিক অতীতের তুলনায় এটি বড় অগ্রগতি, কারণ তখন একই তথ্য পেতে কখনো কখনো কয়েক দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো।

The hands of a drone operator are shown working the controls of a computer monitor.

একটি বাণিজ্যিক মহাকাশ প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি আরও ছয়টি স্যাটেলাইট যুক্ত করেছে। এতে তাদের মোট স্যাটেলাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০টিতে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এসব স্যাটেলাইট প্রতিদিন পৃথিবীর প্রায় ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর একই এলাকা দিনে ১৫ বার পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে সেনারা শুধু একটি স্থির ছবি নয়, সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া পরিস্থিতির ধারাবাহিক চিত্রও বিশ্লেষণ করতে পারছেন।

ট্যাংকও এখন লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছে রাশিয়া

ড্রোন ও স্যাটেলাইটের কারণে যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারাও বদলে গেছে। একসময় বড় আকারের ট্যাংক বহর, সামরিক যান, গোলাবারুদের গুদাম কিংবা সেনাদের বড় সমাবেশ সহজেই শনাক্ত করা যেত। এখন এসব বড় লক্ষ্যবস্তু প্রকাশ্যে রাখার ঝুঁকি অনেক বেশি।

ইউক্রেনের এক সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের এলাকায় গত ছয় মাসে রুশ বাহিনীর কোনো ট্যাংক চোখে পড়েনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার হাতে থাকা ট্যাংকগুলো এখন আশ্রয়স্থলের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে।

স্যাটেলাইটের পুরোনো ও নতুন ছবি পাশাপাশি বিশ্লেষণ করে সেনারা এমন অনেক পরিবর্তনও খুঁজে বের করছেন, যা সাধারণ নজরে ধরা পড়ে না। কোনো মাঠে গাড়ির চাকার দাগ, কাটা গাছ কিংবা নতুন করে পরিষ্কার করা জমি—এসবই হয়ে উঠছে সম্ভাব্য সামরিক অবস্থানের সূত্র।

A drone sits ready for flight.

রাতের অন্ধকারেও থামছে না প্রযুক্তিনির্ভর শিকার

রুশ ড্রোনচালকদের লক্ষ্য করে চালানো সেই অভিযানে প্রথম রাতে হামলা সম্ভব হয়নি। রুশ বাহিনীর গোলাবর্ষণ শুরু হলে আকাশে বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোন ও শক্তিশালী বোমা ছুটে যায়। ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ অস্ত্রের দিকনির্দেশনামূলক সংকেত বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু একই কারণে তাদের নিজেদের ড্রোনও উড়ানো সম্ভব হয়নি।

কয়েক রাত পর পরিস্থিতি শান্ত হলে ইউক্রেনীয় দল আবার প্রস্তুতি নেয়। এবার হামলা সফল হয়।

হামলার পর পাওয়া স্যাটেলাইট ছবিতে বাড়িটির ছাদে দুটি বড় গর্ত দেখা যায়। অর্থাৎ যে লক্ষ্যকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যেই আঘাত হানতে সক্ষম হয় ইউক্রেনীয় বাহিনী।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তির বিস্তার যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শত্রুর অবস্থান শুধু খুঁজে বের করাই নয়, তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং হামলার ফল যাচাই—সবকিছু দ্রুত একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের নতুন বাস্তবতায় আকাশের ড্রোনের পাশাপাশি মহাকাশের স্যাটেলাইটও হয়ে উঠছে যুদ্ধের অন্যতম নির্ধারক শক্তি।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

গ্যাস সংকটে আশুলিয়ার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, বাড়ছে লোকসান-ছাঁটাইয়ের শঙ্কা

স্যাটেলাইটের চোখে রুশ সেনা, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের কৌশল

০১:০১:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ড্রোনের পাশাপাশি এখন স্যাটেলাইট প্রযুক্তিও হয়ে উঠেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। উন্নত স্যাটেলাইট চিত্র দ্রুত সামনের সারির সেনাদের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় রুশ সেনাদের অবস্থান, সামরিক স্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভুল হামলা চালানোর সক্ষমতা অনেক বেড়েছে ইউক্রেনের।

কয়েক ঘণ্টা নয়, ছবি পৌঁছাচ্ছে কয়েক মিনিটেই

দক্ষিণ ইউক্রেনের রুশ নিয়ন্ত্রিত একটি এলাকায় এক রাতে দুই রুশ ড্রোনচালক একটি ছোট বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দূরে গাছপালার আড়ালে অবস্থান নেয় দুই ইউক্রেনীয় ড্রোনচালক। তাদের কাছে ছিল বিস্ফোরক বহনকারী একটি মাঝারি আকারের ড্রোন।

আগে এমন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো কঠিন ছিল। কারণ স্যাটেলাইটের ছবি সামনের সারির সেনাদের কাছে পৌঁছাতে অনেক সময় কয়েক দিন লেগে যেত। এর মধ্যে সেনা বা অস্ত্রের অবস্থান বদলে যেত।

এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। একটি সহায়ক দল স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ওই বাড়িটির নতুন ছবি সংগ্রহ করে দেখতে পায়, বাড়ির সামনে একটি গাড়ি রয়েছে। সেটিই সেখানে রুশ সেনাদের উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।

A drone operator sits amid trees at nighttime viewing a bright screen showing satellite imagery.

লক্ষ্য নিশ্চিত হওয়ার পর ড্রোন হামলার প্রস্তুতি নেয় ইউক্রেনীয় দল।

হাতের যন্ত্রেই লক্ষ্য খোঁজা ও হামলার প্রস্তুতি

স্যাটেলাইটের ছবি এখন শুধু উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তাদের হাতেই সীমাবদ্ধ নেই। সামনের সারির কিছু সেনাদল নিজেরাই স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করতে পারছে।

নেদারল্যান্ডসের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে স্যাটেলাইটের ছবি হাতে ধরা যন্ত্রে সরাসরি দেখা যায়। সেই যন্ত্র ব্যবহার করে ড্রোনচালকেরা লক্ষ্য খুঁজে বের করতে, ড্রোনের উড়ানের পথ নির্ধারণ করতে এবং প্রয়োজন হলে ড্রোন থেকে অস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতিও নিতে পারেন।

তবে বড় ধরনের ভুল এড়াতে হামলার আগে এখনো ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত হলেও নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়নি।

ক্রিমিয়া ঘিরে রুশ সরবরাহ ব্যবস্থায় আঘাত

স্যাটেলাইটনির্ভর এই নতুন কৌশল ইউক্রেনের রুশ অধিকৃত ক্রিমিয়া বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলায় ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার ব্যবহৃত ফেরিঘাট ধ্বংস করা হয়েছে। একই সঙ্গে উপদ্বীপটিতে সেনাদের জন্য অস্ত্র, খাদ্য ও অন্যান্য সরঞ্জাম পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথেও আঘাত করা হয়েছে।

A soldier holds a drone as he prepares it for a nighttime flight.

জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে ইউক্রেনের একটি পৃথক মানববিহীন ব্যবস্থা পরিচালনাকারী রেজিমেন্টও স্যাটেলাইটের ছবি ব্যবহার করে রুশ বাহিনীর কয়েকটি স্থাপনা শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে। এসব স্থাপনা থেকে ইউক্রেনীয় ড্রোনের যোগাযোগ ও পথনির্দেশে ব্যবহৃত উপগ্রহভিত্তিক সংকেত বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হতো।

ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর হামলাতেও একই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার হয়েছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির নতুন প্রতিযোগিতা

ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থায় আটকে আছে। ফলে সামরিক শক্তির পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির ওপরও দুই পক্ষের প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে।

ড্রোন আকাশে, স্থলে কিংবা সমুদ্রে—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর অস্ত্র হিসেবে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নজরদারি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করা যায়, তাদের সংকেতও বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে এসব ড্রোনের উড্ডয়নসীমা ও নজরদারির এলাকাও সীমিত।

এই জায়গাতেই স্যাটেলাইট বড় সুবিধা দিচ্ছে।

মহাকাশ থেকে একই এলাকার ছবি দিনে একাধিকবার পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে কোনো মাঠে নতুন গাড়ির চলাচল, গাছ কাটা, মাটিতে নতুন দাগ তৈরি হওয়া কিংবা কোনো এলাকায় নতুন করে জায়গা পরিষ্কার করার মতো ছোট পরিবর্তনও নজরে আসছে। এসব পরিবর্তন অনেক সময় গোপন সামরিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।

কয়েক মিনিটেই পাওয়া যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

ইউক্রেনের জন্য বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ব্যবহারের সুযোগ গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কোনো এলাকার ছবি পাওয়ার সময় মাত্র ১৫ মিনিটের মতো হতে পারে। অবশ্য অনেক সময় এতে কয়েক ঘণ্টাও লাগে। তবু সাম্প্রতিক অতীতের তুলনায় এটি বড় অগ্রগতি, কারণ তখন একই তথ্য পেতে কখনো কখনো কয়েক দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো।

The hands of a drone operator are shown working the controls of a computer monitor.

একটি বাণিজ্যিক মহাকাশ প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি আরও ছয়টি স্যাটেলাইট যুক্ত করেছে। এতে তাদের মোট স্যাটেলাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০টিতে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এসব স্যাটেলাইট প্রতিদিন পৃথিবীর প্রায় ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর একই এলাকা দিনে ১৫ বার পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে সেনারা শুধু একটি স্থির ছবি নয়, সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া পরিস্থিতির ধারাবাহিক চিত্রও বিশ্লেষণ করতে পারছেন।

ট্যাংকও এখন লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছে রাশিয়া

ড্রোন ও স্যাটেলাইটের কারণে যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারাও বদলে গেছে। একসময় বড় আকারের ট্যাংক বহর, সামরিক যান, গোলাবারুদের গুদাম কিংবা সেনাদের বড় সমাবেশ সহজেই শনাক্ত করা যেত। এখন এসব বড় লক্ষ্যবস্তু প্রকাশ্যে রাখার ঝুঁকি অনেক বেশি।

ইউক্রেনের এক সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের এলাকায় গত ছয় মাসে রুশ বাহিনীর কোনো ট্যাংক চোখে পড়েনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার হাতে থাকা ট্যাংকগুলো এখন আশ্রয়স্থলের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে।

স্যাটেলাইটের পুরোনো ও নতুন ছবি পাশাপাশি বিশ্লেষণ করে সেনারা এমন অনেক পরিবর্তনও খুঁজে বের করছেন, যা সাধারণ নজরে ধরা পড়ে না। কোনো মাঠে গাড়ির চাকার দাগ, কাটা গাছ কিংবা নতুন করে পরিষ্কার করা জমি—এসবই হয়ে উঠছে সম্ভাব্য সামরিক অবস্থানের সূত্র।

A drone sits ready for flight.

রাতের অন্ধকারেও থামছে না প্রযুক্তিনির্ভর শিকার

রুশ ড্রোনচালকদের লক্ষ্য করে চালানো সেই অভিযানে প্রথম রাতে হামলা সম্ভব হয়নি। রুশ বাহিনীর গোলাবর্ষণ শুরু হলে আকাশে বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোন ও শক্তিশালী বোমা ছুটে যায়। ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ অস্ত্রের দিকনির্দেশনামূলক সংকেত বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু একই কারণে তাদের নিজেদের ড্রোনও উড়ানো সম্ভব হয়নি।

কয়েক রাত পর পরিস্থিতি শান্ত হলে ইউক্রেনীয় দল আবার প্রস্তুতি নেয়। এবার হামলা সফল হয়।

হামলার পর পাওয়া স্যাটেলাইট ছবিতে বাড়িটির ছাদে দুটি বড় গর্ত দেখা যায়। অর্থাৎ যে লক্ষ্যকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যেই আঘাত হানতে সক্ষম হয় ইউক্রেনীয় বাহিনী।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তির বিস্তার যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শত্রুর অবস্থান শুধু খুঁজে বের করাই নয়, তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং হামলার ফল যাচাই—সবকিছু দ্রুত একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের নতুন বাস্তবতায় আকাশের ড্রোনের পাশাপাশি মহাকাশের স্যাটেলাইটও হয়ে উঠছে যুদ্ধের অন্যতম নির্ধারক শক্তি।