চীনের মানবসদৃশ রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রির প্রধান নির্বাহী ওয়াং শিংশিং বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত রোবটের জগৎ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের দিকে এগোচ্ছে, যাকে তিনি ‘চ্যাটজিপিটি মুহূর্ত’ হিসেবে দেখছেন। তাঁর ধারণা, খুব শিগগিরই রোবট অপরিচিত পরিবেশেও সাধারণ কথার নির্দেশ বুঝে নানা ধরনের কাজ করতে সক্ষম হবে।
বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত একটি বড় রোবট সম্মেলনে ওয়াং বলেন, রোবটের শারীরিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়লেও তাদের সফটওয়্যার ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে এই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
অপরিচিত ঘরেও ৮০ শতাংশ কাজ
ওয়াংয়ের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে কোনো অপরিচিত বাড়িতে একটি রোবট নিয়ে গেলে সেটি শুধু মুখের কথা বা লিখিত নির্দেশের মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশ গৃহস্থালি কাজ সম্পন্ন করতে পারবে।
তার মতে, এমন সক্ষমতা অর্জন করতে পারলে সেটিই হবে রোবট শিল্পের জন্য বড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। এরপর এ খাতে দ্রুত ও ব্যাপক প্রবৃদ্ধি শুরু হতে পারে।
২০২২ সালের শেষ দিকে চ্যাটজিপিটির আবির্ভাব যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক ব্যবহারকে ত্বরান্বিত করেছিল, তেমনি রোবটের ক্ষেত্রে বাস্তব জগতের পরিস্থিতি বুঝে কাজ করার সক্ষমতা তৈরি হওয়াকে একই ধরনের যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বড় সফটওয়্যার অগ্রগতিতে আরও সময়
তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াং যথেষ্ট সতর্ক। তাঁর মতে, আশাবাদী পরিস্থিতিতে রোবটের সফটওয়্যারে বড় ধরনের অগ্রগতি ঘটতে আরও দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। সবচেয়ে দেরিতে হলেও এ পরিবর্তন পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আসতে পারে।
রোবট খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ইউনিট্রির সাম্প্রতিক শেয়ারবাজারে প্রবেশ এবং রোবট নিয়ে ব্যাপক উৎসাহের তুলনায় ওয়াং বর্তমান প্রযুক্তির সক্ষমতা সম্পর্কে যথেষ্ট বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছেন।
ইউনিট্রি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোবট কুকুর নির্মাতা এবং মানবসদৃশ রোবট সরবরাহের দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান। নাচ ও কুংফুর মতো জটিল শারীরিক কসরত প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। এখন শিল্পক্ষেত্রেও তাদের রোবট ব্যবহারের পরিধি বাড়ছে।
২০২৮ সালেই বড় পরিবর্তনের আশা
চীনা রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গ্যালবটের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং হে মনে করেন, রোবটের সেই কাঙ্ক্ষিত ‘চ্যাটজিপিটি মুহূর্ত’ ২০২৮ সালের মধ্যেই আসতে পারে।
তার ব্যাখ্যায়, এমন পর্যায়ে পৌঁছানোকে বোঝাবে—রোবট কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়াই দৈনন্দিন জীবনের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করতে পারছে।
ইউনিট্রির প্রধান নির্বাহীও জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের জায়গা হলো এমন প্রযুক্তি তৈরি করা, যার মাধ্যমে রোবট বাস্তব জগতের পরিবেশ বুঝতে ও সেখানে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

রোবটের সবচেয়ে বড় বাধা সফটওয়্যার
মানবসদৃশ রোবট এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহারের মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা অর্জন করেনি। রোবটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলগুলোকেই সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ইউনিট্রির প্রধান নির্বাহীর ধারণা, আগামী এক দশকে মানবসদৃশ রোবটের স্বয়ংক্রিয় সক্ষমতা দ্রুত বাড়বে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি এবং ভাষাভিত্তিক মডেলের নিজস্ব উন্নয়নক্ষমতা এ পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
মানবসদৃশ রোবটে চীনের আধিপত্য
চীনের মানবসদৃশ রোবট শিল্প ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে বড় অবস্থান তৈরি করেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই দেশটিতে ৪০ হাজারের বেশি মানবসদৃশ রোবট সরবরাহ হয়েছে বলে চীনের শিল্পসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহের প্রায় ৯৭ শতাংশই চীনের দখলে।
শ্রমশক্তির সংকোচন এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কারণে চীন দীর্ঘদিন ধরে এমন রোবট তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছে, যেগুলো একঘেয়ে, কম মূল্য সংযোজনকারী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মানুষের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।
কারখানা ও পণ্য পরিবহনের গুদামে মানবসদৃশ রোবটের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়লেও বেশির ভাগ কাজেই তারা এখনো মানুষের তুলনায় কম দক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় নতুন ক্ষেত্র
মানবসদৃশ রোবট এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতারও নতুন একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ভবিষ্যতে বিদেশে তৈরি মানবসদৃশ ও চারপেয়ে রোবট আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে চীনা রোবট নির্মাতারা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও বেইজিংয়ের সম্মেলনে অংশ নেওয়া বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা বিদেশের বাজারে নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
রোবটের কাঙ্ক্ষিত সেই মুহূর্ত কবে আসবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে প্রযুক্তির বর্তমান গতি বলছে, মানুষের নির্দেশ বুঝে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তব জগতের বড় অংশের কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম রোবট আর কেবল কল্পকাহিনির বিষয় হয়ে থাকছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















