নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাসসংকটে একের পর এক বস্ত্র ও রং কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়েছে। কারখানার ভেতরে যন্ত্রপাতি ও কাপড় পড়ে থাকলেও নেই স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য। কোথাও চলছে শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মেরামতের কাজ। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা বাড়ছে, তৈরি হচ্ছে শ্রমিক অসন্তোষেরও শঙ্কা।
উৎপাদনের বদলে চলছে মেরামতের কাজ
ফতুল্লার সাইকাট টেক্সটাইলের ভেতরে সারি সারি কাপড় পড়ে থাকলেও গ্যাসের অভাবে রং করার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ। কারখানার বিভিন্ন স্থাপনায় ঢালাই ও মেরামতের কাজ চলছে। কয়েকজন শ্রমিককে কারখানায় দেখা গেলেও তাদের হাতে তেমন কোনো কাজ নেই।
প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, গ্যাসসংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই কারখানাটি বন্ধ রয়েছে। শ্রমিকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা থাকায় সম্ভাব্য অসন্তোষ ঠেকাতে মালিকপক্ষ কারখানার ভেতরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারের কাজ করাচ্ছে।
তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে আবার উৎপাদন শুরু হবে। তবে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

নেমে এসেছে নীরবতা
ফতুল্লার বিভিন্ন রং ও বস্ত্র কারখানাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। ফতুল্লা ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিংয়ে আগে যেখানে সারাক্ষণ যন্ত্রপাতির শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা।
নিরাপত্তাকর্মী ও কয়েকজন তদারক কর্মকর্তা ছাড়া কারখানায় প্রায় কাউকেই দেখা যায়নি। শ্রমিকেরা উপস্থিতির খাতায় স্বাক্ষর করে চলে গেছেন। বিশাল আকারের যন্ত্রপাতিগুলোও পড়ে রয়েছে নিষ্ক্রিয় অবস্থায়।
কারখানাটির মহাব্যবস্থাপক তুষার জানান, পুরো কারখানাই বন্ধ রাখা হয়েছে। আশপাশের প্রায় সব রং কারখানার অবস্থাও একই।
তিনি বলেন, মাত্র ১ থেকে দেড় পিএসআই গ্যাসের চাপ দিয়ে কারখানা চালানো সম্ভব নয়। গ্যাসসংকটের কারণে এর আগে প্রতিদিন সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা উৎপাদন চালানো সম্ভব হতো। এখন সেটুকুও বন্ধ হয়ে গেছে।
মজুরি দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে
গ্যাসসংকট অব্যাহত থাকলে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন কারখানা মালিকেরা। উৎপাদন না হলেও শ্রমিকদের ধরে রাখতে হলে মালিকদের নিজস্ব অর্থ দিয়ে কারখানার ব্যয় বহন করতে হবে।
শিল্পোদ্যোক্তারা জানান, ১৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জের শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও আবারও সংকট তীব্র হয়েছে।
বুধবার ফতুল্লার কয়েকটি কারখানা ঘুরে দেখা যায়, ৫০ পিএসআই লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত কারখানাগুলোতে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ। সেখানে গ্যাসের চাপ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে দেড় পিএসআই।
অন্যদিকে ১৫০ পিএসআই লাইনের সঙ্গে যুক্ত কারখানাগুলোও স্বাভাবিকভাবে চলতে পারছে না। এসব কারখানায় ৬ থেকে ৮ পিএসআই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, যার ফলে কোনো কোনো কারখানায় মাত্র একটি বা দুটি যন্ত্র চালানো সম্ভব হচ্ছে। এতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বিকল্প জ্বালানিতে বাড়ছে খরচ
মডেল ডি ক্যাপিটাল গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক মনির সরদার জানান, তাদের রং করার বিভাগ চালানোর মতো সামান্য গ্যাসই পাওয়া যাচ্ছে। উৎপাদন সচল রাখতে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে বাড়তি ব্যয় নিজেরাই বহন করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এভাবে কারখানা চালানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন শিল্প মালিকেরা।
বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে ১৫২ কারখানা
বাংলাদেশ নিট ডাইং মালিক সমিতির সহসভাপতি নাসির উদ্দিন জানান, তাদের অন্তত ১৫২টি সদস্য কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
তার ভাষ্য, বাড়তি জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া টেকসই নয়। এরই মধ্যে অনেক কারখানা মালিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
গ্যাসসংকট দ্রুত সমাধান না হলে নারায়ণগঞ্জের রং ও বস্ত্রশিল্পে উৎপাদন আরও কমে যাওয়া, কারখানা বন্ধ হওয়া এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে তাই এখন উৎপাদনের শব্দের বদলে শোনা যাচ্ছে অনিশ্চয়তার নীরবতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















