গ্যাসের তীব্র সংকটে নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম ভয়াবহভাবে ব্যাহত হচ্ছে। টানা তিন দিন ধরে জেলার শতাধিক কারখানা বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তত ৫০টি কারখানা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠ পুড়িয়ে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছে।
চৌয়ালা শিল্প এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, হক টেক্সটাইল ও ইউনিফিল টেক্সটাইলসহ কয়েকটি কারখানায় বাষ্প তৈরির চুল্লিতে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। সুতা প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানাগুলোতে বাষ্প তৈরির জন্য এসব চুল্লি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি কারখানায় কাঠ কিনতে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে।
বর্জ্য কাপড়ের বদলে কাঠ
হক টেক্সটাইলের চুল্লি পরিচালনাকারী মোহাম্মদ শাখাওয়াত জানান, আগে বর্জ্য কাপড় দিয়ে চুল্লি চালু করা হতো। কিন্তু বর্জ্য কাপড়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন কাঠ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
নরসিংদী চৌয়ালা বস্ত্রশিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসলাম ফকির বলেন, গ্যাস ছাড়া সুতা প্রক্রিয়াজাত ও রং করার কারখানা চালানো সম্ভব নয়। গত তিন দিন ধরে এসব কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। কোনো কোনো কারখানা বাধ্য হয়ে কাঠকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে।

উৎপাদন কমেছে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত
ব্যবসায়ীদের হিসাবে নরসিংদীতে বড় ও ছোট মিলিয়ে চার হাজারের বেশি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার কারখানা বস্ত্র, রং, সুতা প্রক্রিয়াজাত, সুতা তৈরি ও পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত।
জেলায় প্রায় ৪০০টি কারখানা সরাসরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য এসব কারখানায় প্রতি বর্গইঞ্চিতে ১০ থেকে ১৫ পাউন্ড চাপের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকেই নরসিংদীতে গ্যাস সংকট দেখা দিলেও গত তিন দিনে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে প্রতিদিন অন্তত ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।
চৌয়ালা শিল্প এলাকার বিভিন্ন বস্ত্র, রং ও সুতা প্রক্রিয়াজাত কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাসের অভাবে অধিকাংশই বন্ধ। বিকল্প ব্যবস্থা করে যেসব কারখানা চালু রাখা হয়েছে, সেগুলোতেও উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। কোনো কোনো কারখানা সক্ষমতার মাত্র ১০ শতাংশ উৎপাদন করছে। একই সঙ্গে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়।
মোমিন টেক্সটাইলের ১০ ইউনিটের ৭টিই বন্ধ
চৌয়ালা শিল্প এলাকার সবচেয়ে বড় ও পুরোনো কারখানাগুলোর একটি মোমিন টেক্সটাইল মিল। গ্যাস সংকটে কারখানাটির ১০টি ইউনিটের মধ্যে সাতটি বন্ধ হয়ে গেছে।
রপ্তানিমুখী এই কারখানায় প্রতিদিন ২২ হাজার থেকে ২৩ হাজার ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। বর্তমানে সেখানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার ঘনফুট। শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামে কাপড় রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিদিন ২৫ লাখ গজ কাপড় উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ২০ হাজার গজে। কারখানাটিতে কর্মরত আড়াই হাজার শ্রমিকের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার এখন কাজহীন। তবে শ্রমিকদের ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠানটি তাদের মজুরি দেওয়ার চেষ্টা করছে।
মোমিন টেক্সটাইল মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুর রহমান জানান, জুলাই পর্যন্ত বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু চলতি মাসে গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ায় পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। প্রায় ২০ লাখ গজ কাপড়ের অর্ডার হাতে থাকলেও তা উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
বিকল্প হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস ব্যবহারের কথা ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এতে প্রতি গজ কাপড় উৎপাদনে খরচ অন্তত ২ টাকা ৫০ পয়সা বাড়বে।
বিদেশি ক্রেতারা নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইছেন। দ্রুত সংকটের সমাধান না হলে শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কারখানা মালিকেরা।
শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠাচ্ছে কারখানা
আল মদিনা টেক্সটাইল মিলের মালিক মোহাম্মদ ইরতাজুল ইসলাম জানান, তাদের কারখানায় ধূসর কাপড় তৈরির জন্য সুতা প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানা থেকে তৈরি করা সুতা ব্যবহার করা হয়। পরে সেই কাপড় রং করার জন্য অন্য কারখানায় পাঠানো হয়।
কিন্তু গ্যাসের অভাবে সুতা প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের কারখানাতেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি জানান, আগে প্রতিদিন এক লাখ গজ কাপড় উৎপাদন হতো। এখন ৩০ হাজার গজও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। লোকসান কমাতে দুই পালার বদলে এক পালায় শ্রমিকদের কাজ করানো হচ্ছে। একই কারণে ১৫০ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১০০ জনকে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় কারখানাটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
চাহিদার অর্ধেকও মিলছে না গ্যাস
তিতাস গ্যাসের নরসিংদী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহক, ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা এবং শিল্পকারখানা মিলিয়ে জেলায় প্রতি মাসে প্রায় ১৩ কোটি ঘনমিটার গ্যাসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমান সংকটে চাহিদার অর্ধেকেরও কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিতাস গ্যাসের নরসিংদী কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান জানান, গ্যাস সংকটের কারণে কারখানা মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধান না হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, রপ্তানি আদেশ এবং শিল্প মালিকদের আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্যাস সংকটে নরসিংদীর শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ, বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়ানো এবং শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















