ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স হ্যারি, সংগীতশিল্পী এলটন জনসহ আরও কয়েকজন উচ্চপ্রোফাইল বাদীকে ব্যর্থ গোপনীয়তা মামলার আইনি খরচ হিসেবে কোটি কোটি পাউন্ড পরিশোধের মুখে পড়তে হয়েছে। আদালত বলেছে, মামলাটি পরিচালনার ক্ষেত্রে বাদীদের আচরণ ছিল গুরুতরভাবে অযৌক্তিক।
৯৫৪ কোটি টাকার অন্তর্বর্তী পরিশোধ
লন্ডনের উচ্চ আদালতের বিচারক ম্যাথিউ নিকলিন বৃহস্পতিবার খরচসংক্রান্ত রায়ে বাদীদের পক্ষকে ব্রিটিশ সংবাদপত্র ডেইলি মেইলের প্রকাশক অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সকে ৯৫ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ডের অন্তর্বর্তী অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ২৮ আগস্টের মধ্যে এই অর্থ দেওয়ার কথা।
বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। তবে চূড়ান্ত আইনি খরচ আরও অনেক বেশি হতে পারে।
বিচারক আরও বলেছেন, অতিরিক্ত খরচ ‘ক্ষতিপূরণমূলক ভিত্তিতে’ নির্ধারণ করা হবে। এর অর্থ, অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সকে খরচের প্রতিটি অংশ যুক্তিসংগত ও আনুপাতিক ছিল—এটি আলাদাভাবে প্রমাণ করতে হবে না।
গুরুতর অভিযোগের ভিত্তি ছিল অনুমাননির্ভর
গত মাসে বিচারক নিকলিন প্রিন্স হ্যারি ও আরও পাঁচজনের করা মামলাটি প্রায় পুরোপুরি খারিজ করে দেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল, ডেইলি মেইলসহ সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে ফোনে আড়িপাতা ও অন্যান্য বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।
তবে বিচারক বলেন, এসব অভিযোগ প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ বাদীরা হাজির করতে পারেননি। শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে বেআইনি কর্মকাণ্ডের অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
খরচসংক্রান্ত রায়ে বিচারক বলেন, মামলায় গুরুতর অভিযোগের কিছু অংশ ছিল ‘অনুমান ও পরোক্ষ যুক্তির’ ওপর নির্ভরশীল। এমনকি কোনো কোনো অভিযোগ আর অনুসরণ করা না হলেও সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়নি।
তার মতে, সবকিছু মিলিয়ে মামলাটি স্বাভাবিক বিচারিক আচরণের সীমা অনেকটাই ছাড়িয়ে গিয়েছিল এবং বাদীদের আচরণ ছিল ‘উচ্চমাত্রায় অযৌক্তিক’।
হ্যারির ব্রিটেনে ফেরার খবরের মধ্যেই রায়
আদালতের এই রায় এমন এক সময়ে এলো, যখন খবর ছড়িয়েছে প্রিন্স হ্যারি তাঁর স্ত্রী মেগান ও দুই সন্তানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আবার ব্রিটেনে বসবাসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
২০২০ সালে রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর হ্যারি দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছেন। তাঁর মা প্রিন্সেস ডায়ানা ১৯৯৭ সালে প্যারিসে গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও তিনি বহুবার সমালোচনা করেছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে হ্যারি দাবি করেছিলেন, ডেইলি মেইলের কারণে মেগানের জীবন ‘চরম দুর্বিষহ’ হয়ে উঠেছিল।
তবে মামলাটি খারিজ হওয়ার পর জুলাইয়ে হ্যারি রায়টিকে সম্পূর্ণ পক্ষপাতদুষ্ট বলে মন্তব্য করেছিলেন।
প্রকাশকের আইনি খরচ ৩৪৫ লাখ পাউন্ড
জুলাইয়ে আদালতের শুনানিতে জানানো হয়, অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সের আইনি খরচ ইতোমধ্যে ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ডে পৌঁছেছে। বিপরীতে হ্যারি ও অন্য বাদীদের বীমা ছিল ১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত।
প্রকাশকের আইনজীবী অ্যান্টনি হোয়াইট দাবি করেন, বাদীরা ব্যাপক ও গুরুতর অভিযোগ তুলেছিলেন, কিন্তু সেগুলোর পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ ছিল না। এসব অভিযোগের কারণেই মামলার খরচ আরও বেড়েছে বলে তিনি আদালতে জানান।
অন্যদিকে বাদীদের আইনজীবী নিকোলাস বেকন অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সের ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ডের আইনি বিলকে অত্যন্ত বিপুল বলে অভিহিত করেন। তাঁর দাবি, এই ব্যয় পূর্বনির্ধারিত বাজেটের তুলনায় অনেক বেশি।

হ্যারির জন্য বড় আইনি ধাক্কা
গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে হ্যারির দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে এটি বড় ধরনের পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে তিনি ডেইলি মিররের প্রকাশকের বিরুদ্ধে একটি মামলায় জয় পেয়েছিলেন এবং রুপার্ট মারডকের ব্রিটিশ সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গেও একটি মামলা সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেছিলেন।
তবে এবার ডেইলি মেইলের প্রকাশকের বিরুদ্ধে করা মামলায় শুধু পরাজয়ই নয়, বিপুল আইনি খরচ বহনের দায়ও তাঁর ও অন্য বাদীদের ওপর পড়েছে।
তাঁরা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















