চীনের চাকরির বাজার নিয়ে সরকারি বেকারত্বের হার স্থিতিশীলতার ছবি দেখালেও বাস্তবে শ্রমবাজারে চাপ বাড়ার ইঙ্গিত মিলছে। ২০২৫ সালের শেষে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ২৭ লাখে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি চীনের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতে প্রকৃত চাপের ইঙ্গিত দিতে পারে।
সরকারি বেকারত্বের হার নিয়ে প্রশ্ন
চীন ২০১৮ সাল থেকে জরিপভিত্তিক মাসিক শহুরে বেকারত্বের হার প্রকাশ করে আসছে। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ। গত ১১৫ মাসের মধ্যে ৯৯ মাসেই এই হার ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে ছিল। এমনকি করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও হার ৬ দশমিক ২ শতাংশের ওপরে ওঠেনি।
এই স্থিতিশীলতা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে মহামারির ধাক্কায় বেকারত্ব দ্রুত বেড়েছিল। চীনের পরিসংখ্যানের একটি সীমাবদ্ধতা হলো, জরিপটি মূলত শহুরে কর্মীদের নিয়ে করা হয়। কাজের সুযোগ কমে গেলে কিছু মানুষ গ্রামে ফিরে যান এবং জরিপের আওতা থেকে বাদ পড়েন। আবার কর্মসংস্থান বাড়লে গ্রাম থেকে আরও মানুষ শহরে আসেন। ফলে শহুরে শ্রমবাজারের বেকারত্বের হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকতে পারে।
লক্ষ্যমাত্রার প্রভাব
আরেকটি বিষয় হলো সরকারি লক্ষ্য। ২০১৮ সাল থেকে চীন জরিপভিত্তিক শহুরে বেকারত্বের জন্য বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে আসছে, যা সাধারণত প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২০ সালে লক্ষ্য ছিল ৬ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো পরিসংখ্যানকে যখন সরকারি নীতির লক্ষ্য বানানো হয়, তখন সেটিকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার চাপ তৈরি হতে পারে।
গ্যাভেকাল ড্রাগোনমিকসের অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু ব্যাটসনের মতে, জরিপভিত্তিক বেকারত্বের হার হয়তো কোনোভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, যাতে এর ওঠানামা কম দেখা যায়। ফলে এই হার চীনের শ্রমবাজারের প্রকৃত চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
নিবন্ধিত বেকারের সংখ্যা দিচ্ছে ভিন্ন সংকেত
এ অবস্থায় পুরোনো একটি পরিসংখ্যান নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। ১৯৭৮ সাল থেকে চীন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধিত বেকারের সংখ্যা সংগ্রহ করে আসছে। একসময় এটিও সরকারি লক্ষ্যমাত্রার অংশ ছিল। পরে জরিপভিত্তিক বেকারত্বের হার চালু হওয়ার পর এই তথ্যের গুরুত্ব কমে যায় এবং এর শতাংশ হার প্রকাশও বন্ধ হয়ে যায়।
তবে সরকারি তথ্যভান্ডারে বছরে একবার নিবন্ধিত বেকারের মোট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়। সেই হিসাবে ২০২৫ সালের শেষে নিবন্ধিত বেকারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ২৭ লাখ, যা এক বছরে প্রায় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি।
তবে এই বৃদ্ধিকে সতর্কতার সঙ্গে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। ২০২০ সালে নিয়ম পরিবর্তনের ফলে বিশেষ করে নিজ জন্মস্থানের বাইরে বসবাসকারীদের জন্য বেকার হিসেবে নিবন্ধন করা সহজ হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বৃদ্ধির পেছনে ওই পরিবর্তনকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে ব্যাটসনের মত।
শ্রমবাজারের প্রকৃত চাপ কতটা
চীনের রপ্তানি খাত শক্তিশালী হলেও উৎপাদন খাতে সমান হারে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু দাপ্তরিক চাকরি কমিয়ে দিচ্ছে কি না, সেটিও উদ্বেগের বিষয়। মজুরি বৃদ্ধির গতি দুর্বল হলে অর্থনীতি আবার মূল্যপতনের দিকে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
চীনের শ্রমবাজারের প্রকৃত অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে তাই সরকারি বেকারত্বের হার একমাত্র নির্ভরযোগ্য সূচক নয়। বরং নিবন্ধিত বেকারের সংখ্যা, মজুরি ও কর্মসংস্থানের অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে পরিস্থিতি বোঝার প্রয়োজন হচ্ছে। তবে কোনো পরিসংখ্যান অতিরিক্ত অস্বস্তিকর হয়ে উঠলে সেটি প্রকাশের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে। ২০২৩ সালে তরুণদের বেকারত্বের পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর চীন তা প্রকাশ সাময়িকভাবে বন্ধ করেছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















