০৭:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
চেতনা কি পাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা? মস্তিষ্কের কোষ সিলিকনে বসিয়ে নতুন পথে বিজ্ঞান জেসন আরডেকে মানুষ নয়, প্রতীকে পরিণত করার মূল্য: ক্যামব্রিজ নিয়ে দ্য ইকোনমিস্টের প্রশ্ন বিমান চলাচলের ‘কনট্রেইল’ কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অর্ধেক কমানোর সম্ভাবনা কাঁঠাল, টোফু ও পাম হার্টেই কাঁকড়ার স্বাদ, জনপ্রিয় হচ্ছে ভেগান রেসিপি রাশিয়ার তেল নিয়ে চীনের কৌশল, চাপে ভারতের জ্বালানি বাজার অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম স্তন্যপায়ী প্রাণীর দেহে এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লু শনাক্ত চীনে কি এবার চকলেটের জোয়ার? স্থানীয় ব্র্যান্ডের উত্থানে বদলাচ্ছে চীনা রুচি চীনে নব্বইয়ের দশকের নস্টালজিয়া: অর্থনৈতিক হতাশায় ফিরছে ‘সুযোগের সময়’ ক্যানসার নির্ণয়ের পর প্রথম জনসম্মুখে লুসি ডেভিস, ভক্তদের ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত দক্ষিণ থাইল্যান্ডে সমন্বিত অগ্নিসংযোগ, আহত ২

আবাসস্থল সংকটে ভারতের হাতি, ৯ বছরে কমেছে ১৮ শতাংশ

ভারতে একসময় রাজশক্তি, যুদ্ধ ও কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ছিল হাতি। প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তার গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্রে’ হাতিকে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। রাজারা জোট গঠনের উপহার হিসেবে হাতি দিতেন, আর দুর্গের প্রবেশপথ ভাঙতে সেনাবাহিনীও ব্যবহার করত এই প্রাণীকে। হিন্দু ধর্মে হাতির মাথাবিশিষ্ট দেবতা গণেশ আজও ব্যাপকভাবে পূজিত। কিন্তু সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধা ভারতের হাতিদের ক্রমশ সংকুচিত আবাসস্থল থেকে রক্ষা করতে পারছে না।

গত বছর প্রকাশিত ভারতের ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেশে হাতির সংখ্যা ২২ হাজার ৪৪৬টিতে নেমে এসেছে বলে জানানো হয়। ২০১৭ সালের তুলনায় এই সংখ্যা ১৮ শতাংশ কম। কয়েকটি রাজ্যে হাতির সংখ্যা কমার হারকে জরিপের প্রধান লেখক কামার কোরেশি ‘বিস্ময়কর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আবাসস্থল সংকুচিত, বাড়ছে সংঘাত

ভারতের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বনভূমির মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বহু গ্রাম। আফ্রিকার তুলনায় এই ভৌগোলিক বাস্তবতা হাতিদের চলাচলের জন্য বড় বাধা তৈরি করছে। বনভূমির এক অংশ থেকে অন্য অংশে যেতে প্রাণীগুলোকে ক্রমেই সরু করিডোরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার বিবেক মেননের মতে, ২০১০ সালে তাঁর দল হাতিদের এমন ৮৮টি চলাচলপথ শনাক্ত করেছিল। বর্তমানে এ ধরনের করিডোরের সংখ্যা প্রায় ১৫০। সংখ্যাটি বাড়লেও এর অর্থ আবাসস্থল সম্প্রসারণ নয়; বরং বনভূমি খণ্ডিত হওয়ায় হাতিদের বিচ্ছিন্ন বনাঞ্চলের মধ্যে চলাচলের প্রয়োজন আরও বেড়েছে।

অবকাঠামো নির্মাণ, খনন ও বিস্ফোরণের কাজ বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ায় হাতিরা প্রায়ই কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ছে। এতে মানুষ ও হাতির সংঘাত বাড়ছে। পশ্চিমবঙ্গে হাতি তাড়াতে ‘হুল্লা’ দলগুলো কখনো আগুনের গোলা ও আতশবাজি ব্যবহার করে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এমন ঘটনা ঘটছে।The sorry lives of India's captive elephants

বৈদ্যুতিক বেড়াও সবসময় কার্যকর হচ্ছে না

হাতিদের চলাচল ঠেকাতে কোথাও কোথাও বৈদ্যুতিক বেড়া বসানো হলেও প্রাণীগুলো তা মোকাবিলার কৌশল রপ্ত করেছে। পরিবেশবিদ রামন সুকুমারের মতে, হাতিরা বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য বুঝে তা অতিক্রম করতে পারে। দাঁত দিয়ে তারা তার বা বেড়া সরানোর চেষ্টা করে, আবার কাঠের গুঁড়ি ব্যবহার করে শর্ট সার্কিটও ঘটাতে পারে।

তবে হাতি উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত বনকর্মীদের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সংরক্ষণকর্মী প্রেরণা বিন্দ্রার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক কর্মীর কাছেই টর্চের মতো মৌলিক সরঞ্জাম নেই। ফলে হাতিকে নিরাপদে বনে ফেরানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সরঞ্জাম ছাড়া দায়িত্ব পালন করেন।

সংরক্ষণে কিছু অগ্রগতিও আছে

পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে হাতির দাঁতের জন্য চোরাশিকার কমেছে। রাজ্য বন বিভাগ ও জাতীয় শুল্ক কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ও উন্নত হয়েছে। বর্তমানে ভারতে ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ব্যুরো রয়েছে এবং বিভিন্ন রাজ্যে চোরাশিকার ঠেকাতে পৃথক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

গত মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তামিলনাড়ুর একটি হাতি করিডোর থেকে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। এ ধরনের পদক্ষেপ হাতিদের বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।

হাতি শুধু বন্যপ্রাণী নয়, বনভূমিরও রক্ষক

হাতি বনভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা বীজ ছড়িয়ে নতুন গাছ জন্মাতে সহায়তা করে, বনভূমির গঠন পরিবর্তন করে, মাটিতে সার যোগায় এবং জলাভূমি টিকিয়ে রাখতে মাটি খুঁড়ে ভূমিকা রাখে।

প্রাচীন ‘অর্থশাস্ত্রেও’ হাতির আবাসস্থল বন রক্ষার বিষয়ে শাসকদের সতর্ক করা হয়েছিল। আধুনিক ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছেও সেই পুরোনো বার্তার গুরুত্ব কমেনি—হাতিকে রক্ষা করতে হলে আগে রক্ষা করতে হবে তাদের আবাসস্থল ও চলাচলের পথ।

জনপ্রিয় সংবাদ

চেতনা কি পাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা? মস্তিষ্কের কোষ সিলিকনে বসিয়ে নতুন পথে বিজ্ঞান

আবাসস্থল সংকটে ভারতের হাতি, ৯ বছরে কমেছে ১৮ শতাংশ

০৬:১৯:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

ভারতে একসময় রাজশক্তি, যুদ্ধ ও কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ছিল হাতি। প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তার গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্রে’ হাতিকে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। রাজারা জোট গঠনের উপহার হিসেবে হাতি দিতেন, আর দুর্গের প্রবেশপথ ভাঙতে সেনাবাহিনীও ব্যবহার করত এই প্রাণীকে। হিন্দু ধর্মে হাতির মাথাবিশিষ্ট দেবতা গণেশ আজও ব্যাপকভাবে পূজিত। কিন্তু সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধা ভারতের হাতিদের ক্রমশ সংকুচিত আবাসস্থল থেকে রক্ষা করতে পারছে না।

গত বছর প্রকাশিত ভারতের ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেশে হাতির সংখ্যা ২২ হাজার ৪৪৬টিতে নেমে এসেছে বলে জানানো হয়। ২০১৭ সালের তুলনায় এই সংখ্যা ১৮ শতাংশ কম। কয়েকটি রাজ্যে হাতির সংখ্যা কমার হারকে জরিপের প্রধান লেখক কামার কোরেশি ‘বিস্ময়কর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আবাসস্থল সংকুচিত, বাড়ছে সংঘাত

ভারতের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বনভূমির মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বহু গ্রাম। আফ্রিকার তুলনায় এই ভৌগোলিক বাস্তবতা হাতিদের চলাচলের জন্য বড় বাধা তৈরি করছে। বনভূমির এক অংশ থেকে অন্য অংশে যেতে প্রাণীগুলোকে ক্রমেই সরু করিডোরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার বিবেক মেননের মতে, ২০১০ সালে তাঁর দল হাতিদের এমন ৮৮টি চলাচলপথ শনাক্ত করেছিল। বর্তমানে এ ধরনের করিডোরের সংখ্যা প্রায় ১৫০। সংখ্যাটি বাড়লেও এর অর্থ আবাসস্থল সম্প্রসারণ নয়; বরং বনভূমি খণ্ডিত হওয়ায় হাতিদের বিচ্ছিন্ন বনাঞ্চলের মধ্যে চলাচলের প্রয়োজন আরও বেড়েছে।

অবকাঠামো নির্মাণ, খনন ও বিস্ফোরণের কাজ বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ায় হাতিরা প্রায়ই কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ছে। এতে মানুষ ও হাতির সংঘাত বাড়ছে। পশ্চিমবঙ্গে হাতি তাড়াতে ‘হুল্লা’ দলগুলো কখনো আগুনের গোলা ও আতশবাজি ব্যবহার করে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এমন ঘটনা ঘটছে।The sorry lives of India's captive elephants

বৈদ্যুতিক বেড়াও সবসময় কার্যকর হচ্ছে না

হাতিদের চলাচল ঠেকাতে কোথাও কোথাও বৈদ্যুতিক বেড়া বসানো হলেও প্রাণীগুলো তা মোকাবিলার কৌশল রপ্ত করেছে। পরিবেশবিদ রামন সুকুমারের মতে, হাতিরা বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য বুঝে তা অতিক্রম করতে পারে। দাঁত দিয়ে তারা তার বা বেড়া সরানোর চেষ্টা করে, আবার কাঠের গুঁড়ি ব্যবহার করে শর্ট সার্কিটও ঘটাতে পারে।

তবে হাতি উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত বনকর্মীদের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সংরক্ষণকর্মী প্রেরণা বিন্দ্রার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক কর্মীর কাছেই টর্চের মতো মৌলিক সরঞ্জাম নেই। ফলে হাতিকে নিরাপদে বনে ফেরানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সরঞ্জাম ছাড়া দায়িত্ব পালন করেন।

সংরক্ষণে কিছু অগ্রগতিও আছে

পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে হাতির দাঁতের জন্য চোরাশিকার কমেছে। রাজ্য বন বিভাগ ও জাতীয় শুল্ক কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ও উন্নত হয়েছে। বর্তমানে ভারতে ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ব্যুরো রয়েছে এবং বিভিন্ন রাজ্যে চোরাশিকার ঠেকাতে পৃথক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

গত মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তামিলনাড়ুর একটি হাতি করিডোর থেকে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। এ ধরনের পদক্ষেপ হাতিদের বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।

হাতি শুধু বন্যপ্রাণী নয়, বনভূমিরও রক্ষক

হাতি বনভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা বীজ ছড়িয়ে নতুন গাছ জন্মাতে সহায়তা করে, বনভূমির গঠন পরিবর্তন করে, মাটিতে সার যোগায় এবং জলাভূমি টিকিয়ে রাখতে মাটি খুঁড়ে ভূমিকা রাখে।

প্রাচীন ‘অর্থশাস্ত্রেও’ হাতির আবাসস্থল বন রক্ষার বিষয়ে শাসকদের সতর্ক করা হয়েছিল। আধুনিক ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছেও সেই পুরোনো বার্তার গুরুত্ব কমেনি—হাতিকে রক্ষা করতে হলে আগে রক্ষা করতে হবে তাদের আবাসস্থল ও চলাচলের পথ।