কাজাখস্তানে ২৩ আগস্টের সংসদ নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ ‘নতুন কাজাখস্তান’ গঠনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু নতুন সংবিধান, নতুন সংসদীয় কাঠামো এবং নতুন নামে রাজনৈতিক দল সামনে এলেও নির্বাচনের ভেতরের চিত্রে পুরোনো কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির ছাপই স্পষ্ট বলে মনে করছে দ্য ইকোনমিস্ট।
তোকায়েভের ভাষায় ‘নতুন কাজাখস্তান’
নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে ‘নবায়নের পক্ষে ভোট দিন’—এমন প্রচার চালানো হচ্ছে। ২০২২ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে সংঘটিত অস্থিরতায় অন্তত ২৩৮ জন নিহত হওয়ার পর তোকায়েভ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেন। সেই পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই নতুন সংবিধান এবং সংসদের নতুন কাঠামোর কথা বলা হচ্ছে।
নির্বাচনের পর নতুন নামে একটি দল সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু ‘জাস্টিস পার্টি’ নামে নতুন দলটি মূলত কয়েক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা পুরোনো শাসক দলের পুনর্গঠিত সংস্করণ। ফলে সংসদে কাঠামোগত পরিবর্তন এলেও প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিরোধীদের জন্য সংকুচিত রাজনৈতিক পরিসর
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃত বিরোধী দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়ায় নতুন সংসদও সরকারের সিদ্ধান্তে সায় দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর মধ্যেই তোকায়েভ দাবি করেছেন, কাজাখস্তানে বহুত্ববাদ বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু এই বক্তব্যের কয়েক দিন আগেই বিরোধী নেতা আমানগেলদি জাখিনকে ‘চরমপন্থা’র অভিযোগে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু রাজনীতিকদের ক্ষেত্রেই নয়, সাংবাদিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধেও কারাদণ্ড, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং সাংবাদিকতা থেকে বিরত রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্টকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে এক ইউটিউবারের কারাবাসের ঘটনাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
নাজারবায়েভের যুগের সঙ্গে সম্পর্ক
তোকায়েভের ‘নতুন কাজাখস্তান’ ধারণাটি মূলত তার দীর্ঘদিনের পূর্বসূরি নুরসুলতান নাজারবায়েভের তিন দশকের শাসন থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত। ২০১৯ সালে নাজারবায়েভ পদ ছাড়ার পর তোকায়েভ তার উত্তরসূরি হন। ২০২২ সালের অস্থিরতার আগ পর্যন্ত দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় ছিল।
অস্থিরতার পর তোকায়েভ নাজারবায়েভের প্রভাব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং প্রেসিডেন্টের কিছু ক্ষমতা কমান। তবে নতুন সংবিধানের মাধ্যমে তিনি আবারও কিছু ক্ষমতা ফিরে পেয়েছেন। নতুন সংবিধানটি সমালোচকদের গ্রেপ্তারের পরিবেশের মধ্যে গণভোটে অনুমোদিত হয়।
২০২৯ সাল হবে তোকায়েভের জন্য বড় পরীক্ষা
২০২২ সালে তোকায়েভ প্রেসিডেন্টের একক মেয়াদসীমা চালু করেছিলেন এবং তা মেনে চলার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। তবে সম্প্রতি সাংবিধানিক আদালত জানিয়েছে, তিনি চাইলে নতুন করে ‘প্রথম’ মেয়াদের জন্য প্রার্থী হতে পারেন। ফলে বর্তমান দ্বিতীয় মেয়াদ ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার পরও তার ক্ষমতায় থাকার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
মধ্য এশিয়ার কয়েকজন দীর্ঘদিনের শাসক এবং রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন ও তুরস্কের রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ক্ষেত্রেও মেয়াদসীমা এড়িয়ে ক্ষমতায় থাকার কৌশল দেখা গেছে। তাই ২০২৯ সালেই বোঝা যাবে, তোকায়েভ সত্যিই কাজাখস্তানকে দীর্ঘস্থায়ী ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন থেকে বের করে আনতে কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কাজাখস্তানের এবারের নির্বাচন তাই নতুন সংবিধান ও নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর পরীক্ষা হওয়ার পাশাপাশি তোকায়েভের ‘নতুন কাজাখস্তান’ ধারণার বাস্তবতা যাচাইয়েরও গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















