বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ও নৌ-সংকট ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়ার মধ্যে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে আর্কটিক মহাসাগর দিয়ে উত্তর সাগরপথ। চীনা জাহাজ মালিক প্রতিষ্ঠান সি লেজেন্ডের ‘আর্কটিক এক্সপ্রেস’ সেবা সুয়েজ খালের তুলনায় প্রায় অর্ধেক সময়ে যাত্রা শেষ করার দাবি করছে। তবে বরফ, আবহাওয়া, উচ্চ বীমা ব্যয়, রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এই পথকে এখনো ব্যয়বহুল ও সীমিত করে রেখেছে।
আর্কটিক দিয়ে ২০ দিনে চীন থেকে ব্রিটেন
১৫ আগস্ট চীনের নিংবো বন্দর থেকে ডুবাই টাওয়ার নামের কনটেইনার জাহাজটি যাত্রা শুরু করে। এটি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে আর্কটিক মহাসাগর হয়ে নিয়মিত পণ্য পরিবহনের প্রথম সেবা হিসেবে যাত্রা করছে। সি লেজেন্ড জানিয়েছে, রাশিয়ার উত্তরে বেরিং প্রণালি হয়ে উত্তর সাগরপথ পেরিয়ে ব্রিটেনের পূর্ব উপকূলের ফেলিক্সস্টো বন্দরে পৌঁছাতে জাহাজটির প্রায় ২০ দিন লাগবে।
সুয়েজ খাল হয়ে প্রচলিত রুটের তুলনায় এই সময় প্রায় অর্ধেক। মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলতে পারাও এই রুটের অন্যতম আকর্ষণ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং লোহিত সাগরে হুতিদের হামলার ঝুঁকি এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যে বিকল্প পথের প্রয়োজন বাড়িয়েছে।
চীনের ‘পোলার সিল্ক রোড’ পরিকল্পনা
আর্কটিক অঞ্চলে চীনের আগ্রহ নতুন নয়। ২০১৮ সালে দেশটি সেখানে জাহাজ চলাচল, খনিজ সম্পদ আহরণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা তুলে ধরে, যাকে সম্মিলিতভাবে ‘পোলার সিল্ক রোড’ বলা হয়। তবে আর্কটিক অঞ্চলের সাতটি দেশের মধ্যে ছয়টি পশ্চিমা গণতন্ত্র হওয়ায় চীনের সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
চীনের নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির বিপুল জ্বালানি আমদানি মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিকল্প সমুদ্রপথ তৈরি করা বেইজিংয়ের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। জাপানও জুনে আর্কটিক নীতি পুনর্বিবেচনা করে উত্তর সাগরপথ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্যানস্টারও ২২ আগস্ট বুসান থেকে ফেলিক্সস্টো পর্যন্ত পরীক্ষামূলক যাত্রার পরিকল্পনা করেছে, যার লক্ষ্য ১৮ দিনে গন্তব্যে পৌঁছানো।
বরফ গললেও ঝুঁকি কমেনি
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উত্তর সাগরপথ ভবিষ্যতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। আর্কটিকের গ্রীষ্মকালীন সর্বনিম্ন বরফের বিস্তার প্রতি দশকে ১২ শতাংশের বেশি হারে কমছে। চলতি বছরের মার্চে শীতকালীন সর্বোচ্চ বরফের পরিমাণ ১৯৭৯ সালে রেকর্ড রাখা শুরুর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছিল। ১৬ আগস্ট আর্কটিকের বরফের বিস্তার ছিল ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার।
কম যাত্রাসময়ের কারণে জ্বালানি খরচ ও কার্বন নিঃসরণ কমার সম্ভাবনাও রয়েছে। আবার আর্কটিকের ঠান্ডা পরিবেশ ব্যাটারি, সৌর মডিউল ও বৈদ্যুতিক গাড়ির যন্ত্রাংশের মতো তাপ-সংবেদনশীল পণ্য পরিবহনে সুবিধা দিতে পারে।
তবে বাস্তব সীমাবদ্ধতা বড়
আর্কটিক এক্সপ্রেস এখন শুধু আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এই সময়ে সি লেজেন্ড আটটি যাত্রা পরিচালনার পরিকল্পনা করেছে। বছরের বাকি সময়ে শক্তিশালী বরফ-সহনশীল জাহাজ প্রয়োজন হয়, যেগুলো ব্যয়বহুল এবং সীমিত সংখ্যায় পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকারের সহায়তাও প্রয়োজন হতে পারে।
বীমা ব্যয়ও বড় বাধা। উত্তর সাগরপথের বীমা সুয়েজ রুটের তুলনায় বেশি এবং কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাওয়ার চেয়েও প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। অ্যালিয়াঞ্জ সতর্ক করেছে, দুর্গম আর্কটিক অঞ্চলে কঠিন আবহাওয়া এবং সীমিত মেরামত, উদ্ধার ও সহায়তা অবকাঠামো অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করে।
পরিবেশগত উদ্বেগও রয়েছে। ঠান্ডা পানিতে জ্বালানি ছড়িয়ে পড়লে তা পরিষ্কার করা কঠিন। জাহাজের শব্দ তিমি ও ওয়ালরাসের মতো সামুদ্রিক প্রাণীর ওপরও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
সুয়েজের বিকল্প, এখনো নয় প্রতিদ্বন্দ্বী
২০২৫ সালে উত্তর সাগরপথে মোট ট্রানজিট পণ্য পরিবহন ছিল মাত্র ৩২ লাখ টন। একই সময়ে সুয়েজ খাল দিয়ে গেছে প্রায় ৪৬ কোটি ৪০ লাখ টন। আর্কটিকের অধিকাংশ বাণিজ্যও এখন রাশিয়া ও চীনের বন্দরগুলোর মধ্যে, যার বড় অংশ রুশ তেল ও গ্যাস।
তবু চীনের জন্য এই পথের গুরুত্ব বাড়তে পারে। আর্কটিক ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রচলিত রুটে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে উত্তর সাগরপথ মৌসুমি বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সি লেজেন্ড ২০২৮ সালের মধ্যে নৌ চলাচলের সময় চার মাসে বাড়াতে এবং শেষ পর্যন্ত বছরজুড়ে এই রুট চালুর লক্ষ্য নিয়েছে। আর্কটিকে তাপমাত্রা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ দ্রুত বাড়তে থাকলে সেই পরিকল্পনার বাস্তব সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















