করোনাভাইরাস মহামারির পর কর্মক্ষেত্র ও কর্মীদের পারিবারিক জীবনের সম্পর্ক অনেকটাই বদলে গেছে। ঘরে বসে কাজের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, চাকরি ও পরিবারের দায়িত্বকে সব সময় আলাদা করে রাখা সম্ভব নয়। মহামারি শেষ হলেও নমনীয় কর্মব্যবস্থার চাহিদা কমেনি। বিশেষ করে সন্তান বা বয়স্ক পরিবারের সদস্যের দেখভালের দায়িত্ব থাকা কর্মীরা এমন কর্মপরিবেশ চান, যেখানে পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি পারিবারিক প্রয়োজনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এই বাস্তবতায় ব্যবস্থাপকদের শুধু নিজেদের কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য রক্ষা করলেই হবে না, কর্মীদের পারিবারিক পরিস্থিতিও বুঝতে হবে। একজন কর্মীর সন্তান হঠাৎ কর্মস্থলে চলে আসা, বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা পরিচর্যাকারী না পাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখন আর পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়।
পরিবারবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে
কর্মীদের সন্তানদের কর্মস্থল দেখানোর জন্য নির্দিষ্ট দিন আয়োজন করা হতে পারে। এতে শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের কর্মজীবন সম্পর্কে ধারণা পায় এবং বাবা-মায়ের কাজের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও আগ্রহ তৈরি হতে পারে। কর্মস্থলের পরিবেশ কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে শিশুর আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগ কর্মীদের জন্যও ইতিবাচক বার্তা দেয়। পরিবারকে সম্মান করে এমন প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের সন্তুষ্টি বাড়তে পারে এবং চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। কর্মীদের পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনও পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

কর্মজীবী বাবা-মায়ের জন্য প্রয়োজন নমনীয়তা
অবশ্যই কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জীবনের প্রভাব যেন প্রতিদিনের কাজকে ব্যাহত না করে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। তবে প্রয়োজনের সময় কর্মীদের কিছুটা স্বাধীনতা দেওয়া প্রতিষ্ঠানের জন্যও দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে।
সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়া, বিদ্যালয়ের কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হওয়া কিংবা পরিচর্যাকারী অনুপস্থিত থাকার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে কর্মীকে সাময়িকভাবে বাড়ি থেকে কাজের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে বয়স্ক বাবা-মায়ের দেখভালের দায়িত্ব থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ছুটির মৌসুম, বসন্তকালীন বিরতি কিংবা গ্রীষ্মের দীর্ঘ ছুটিতে শিশুদের দেখভালের ব্যবস্থা করা অনেক কর্মজীবী পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এসব সময়ে প্রতিষ্ঠানের সহানুভূতিশীল ও বাস্তবসম্মত নীতি কর্মীদের ওপর চাপ কমাতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ কর্মীদের মধ্যে বৈষম্যও দেখা যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে ছোট সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে থাকেন। ফলে পরিবারবান্ধব নীতি তৈরির পাশাপাশি এমন পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি, যেখানে সন্তান পালনের দায়িত্বকে শুধু নারীর বিষয় হিসেবে দেখা হবে না।
হঠাৎ পরিস্থিতিতে সহানুভূতিশীল হতে হবে
কর্মজীবী বাবা-মায়েরা অনেক সময় কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন। অথচ একটি শিশুর কারণে কয়েক মুহূর্তের জন্য কাজের পরিবেশে বিঘ্ন ঘটলেই কর্মীকে নেতিবাচকভাবে বিচার করা উচিত নয়।

অনলাইন বৈঠকের সময় কোনো কর্মীর সন্তান হঠাৎ সামনে চলে এলে তিনি সাময়িকভাবে শব্দ বন্ধ করে শিশুটিকে সামলাতে পারেন এবং এরপর আবার কাজে ফিরে আসতে পারেন। এমন স্বাভাবিক ও মানবিক আচরণ কর্মীকে আরও বিশ্বাসযোগ্য, আন্তরিক ও মানবিক হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
কোনো কর্মী যদি দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক সমস্যার কারণে নিয়মিত সমস্যায় পড়েন, তাহলে ব্যবস্থাপকের উচিত দায়িত্ব ও পারিবারিক প্রয়োজন—দুই দিক বিবেচনা করে আলাদা কোনো সমাধানের পথ খোঁজা।
নমনীয়তার পাশাপাশি পেশাদারিত্বও জরুরি
পরিবারবান্ধব কর্মপরিবেশের অর্থ এই নয় যে কর্মক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের সীমা থাকবে না। প্রত্যেক কর্মীর দায়িত্ব, সময়সীমা ও প্রত্যাশা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। কর্মীদের এমন পরিবেশও দিতে হবে, যেখানে তারা মনোযোগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে, গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং প্রয়োজনীয় দলীয় বৈঠকে অংশ নিতে পারেন।
কিছু কর্মস্থল আবার নিরাপত্তার দিক থেকে শিশুদের জন্য উপযুক্ত নয়। নির্মাণস্থলসহ ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় শিশুদের উপস্থিতি গুরুতর বিপদ তৈরি করতে পারে। তাই পরিবারকে সহায়তা করার সময় কর্মস্থলের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাও অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
কাজ ও পরিবারকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহায়ক করতে হবে
কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনকে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জগত হিসেবে দেখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। কখনো এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে, আবার সঠিক ব্যবস্থাপনায় একে অন্যকে সমৃদ্ধও করতে পারে।
তাই পরিবারবান্ধব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ব্যবস্থাপকদের তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—পরিকল্পিত পারিবারিক সম্পৃক্ততা, প্রয়োজন অনুযায়ী নমনীয়তা এবং পেশাদারিত্বের সুস্পষ্ট সীমারেখা।
কর্মীদের পারিবারিক বাস্তবতা বুঝে প্রতিষ্ঠান যদি দায়িত্বশীল আচরণ করে, তাহলে শুধু কর্মীরাই উপকৃত হবেন না; কর্মীদের সন্তুষ্টি, আস্থা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত পরিবারকে সমর্থন করা মানে কর্মীদের আরও ভালোভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















