০৯:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বাংলাদেশ, অংশগ্রহণে আপত্তি নেই ইমরান খানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের প্রতি সাবেক ক্রিকেট অধিনায়কদের আহ্বান লুকানো পেটের চর্বি হৃদ্‌যন্ত্রকে দ্রুত বুড়িয়ে দিতে পারে, বলছে নতুন গবেষণা মানুষের শিশুর মতোই গান শেখে তরুণ ফিঞ্চ পাখি গাজায় ইসরায়েলি হামলায় শিশুসহ নিহত ৩ নারীর শরীর নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার কারও নেই, বললেন নাইমাল খাওয়ার তালেবান শাসনে আফগানিস্তান: বিবাহবিচ্ছেদ থেকে স্মার্টফোন, সর্বত্র নিয়ন্ত্রণের ছায়া ওয়েলসের সর্বোচ্চ পর্বতে লাইন নিয়ে তুমুল বিতর্ক, ‘এটা তো বিনোদনকেন্দ্র নয়’ আফগানিস্তানের বাণিজ্যপথ বদলে যাচ্ছে, বড় ঝুঁকিতে পাকিস্তানের শিল্প-বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিবাসন নিয়ম: বিদেশি শিক্ষার্থীদের ১৫ সেপ্টেম্বরের আগেই ফিরতে বলছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

আফগানিস্তানের বাণিজ্যপথ বদলে যাচ্ছে, বড় ঝুঁকিতে পাকিস্তানের শিল্প-বাণিজ্য

  • Sarakhon Report
  • ০৮:২৩:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
  • 18

তালেবান কাবুলের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও পেশোয়ারের জন্য এটি আর শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বিষয় নয়; বরং শিল্পের সক্ষমতা, বাজার ধরে রাখা এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আফগান ট্রানজিট বাণিজ্যে বড় ধস

পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের ট্রানজিট বাণিজ্য একসময় দ্রুত বাড়ছিল। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার আগে প্রায় ৮৯ হাজার কনটেইনারে ৫০০ কোটি ডলারের পণ্য পরিবহন হতো। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা রেকর্ড ১ লাখ ২ হাজার ৮৮৬ কনটেইনারে পৌঁছে, যার মূল্য ছিল প্রায় ৬৭০ কোটি ডলার।

এরপর থেকেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কনটেইনার সংখ্যা নেমে আসে ৫৪ হাজার ১১৪টিতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৯৫৯টিতে, যার মূল্য ছিল ১৩৬ কোটি ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিস্থিতি কার্যত ভেঙে পড়ে। মাত্র ১১ হাজার ৫৯২টি কনটেইনারে ৩৬ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য পাকিস্তানের পথ ব্যবহার করে আফগানিস্তানে যায়।

অর্থাৎ, ২০২৫ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের সীমান্ত বিধিনিষেধ আরোপের আগেই এই পতনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। সীমান্তে বিধিনিষেধ সেই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে।

ইরান ও মধ্য এশিয়ার দিকে আফগানিস্তানের ঝুঁকে পড়া

আফগানিস্তান এখন আমদানির জন্য বিকল্প পথ তৈরি করছে। এর মধ্যে ইরানের করিডোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আফগানিস্তানের মোট আমদানির ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ এসেছে ইরান থেকে। সরাসরি ইরান থেকে আসা পণ্য এবং ইরানের মধ্য দিয়ে আসা পণ্য মিলিয়ে দেশটির মোট আমদানির ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ এই পথের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন বাণিজ্যপথও ধীরে ধীরে গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে পাকিস্তান শুধু ট্রানজিট ফি হারাচ্ছে না, আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবেও তার পুরোনো অবস্থান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

আফগানিস্তানের পণ্য পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে তৃতীয় দেশে যাওয়ার বাণিজ্যেও ভয়াবহ পতন ঘটেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যার মূল্য ছিল ৪৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার, পরের অর্থবছরে তা মাত্র ৭০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।

পেশোয়ারের ব্যবসায়িক কাঠামোতে চাপ

দশকের পর দশক আফগানিস্তানের চাহিদাকে ঘিরে করাচির সমুদ্রবন্দর থেকে পেশোয়ার ও সীমান্তবর্তী বাজার পর্যন্ত একটি বিশাল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল। উৎপাদনকারী, পাইকার, পরিবহন ব্যবসায়ী, পণ্য খালাসকারী প্রতিষ্ঠান, গুদাম মালিক এবং আর্থিক মধ্যস্থতাকারীরা এই বাণিজ্য থেকে উপকৃত হয়েছেন।

এখন সেই পণ্যপ্রবাহ কমে যাওয়ায় ক্ষতির প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে পুরো শিল্পব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ছে।

সিমেন্ট, নির্মাণসামগ্রী, খাদ্যপণ্য, ওষুধ, বস্ত্র এবং ভোগ্যপণ্যের বড় একটি বাজার ছিল আফগানিস্তান। আফগান ক্রয়াদেশ কমে গেলে উৎপাদনকারী ও পাইকার উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন। একটি ট্রাক সীমান্ত পার হতে না পারলে পরিবহন ব্যবসায়ীর আয় কমে যায়। গুদামে পণ্য না থাকলে শ্রমিকের প্রয়োজন কমে যায়। পাইকারের ক্রেতা কমলে কারখানা থেকে তার পণ্য কেনার পরিমাণও কমে যায়। শেষ পর্যন্ত কারখানার উৎপাদনও কমে আসে।

এর সঙ্গে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যেমন কয়লা সরবরাহে সীমান্তবর্তী বিঘ্ন উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে। অর্থাৎ একদিকে রপ্তানি চাহিদা কমছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এই দ্বিমুখী চাপ শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে।

সীমান্ত বন্ধের বড় আঘাত কৃষিতেও

বাণিজ্যপথের অস্থিরতার প্রভাব শুধু শিল্পে সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্তের দুই পাশের কৃষিপণ্য বাজারও এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ফল ও সবজির মতো দ্রুত পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে সীমান্তে বিলম্ব বড় ধরনের ক্ষতি তৈরি করে।

২০২৫ সালে আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের পাঁচটি প্রধান আঙুর উৎপাদনকারী প্রদেশ থেকে ৪৪ হাজার ২২৫ টন আঙুর রপ্তানি হয়েছিল, যার মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ হাজার টনই পাকিস্তানে গিয়েছিল। বাকি অংশ গিয়েছিল বাংলাদেশ, ইরাক ও ভারতে।

কিন্তু ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত রপ্তানি নেমে এসেছে মাত্র ২৫৬ টনে, যার মূল্য প্রায় ১ লাখ ডলার। এই ক্ষতি শুধু আফগান কৃষকদের নয়; পাকিস্তানের পরিবহন ব্যবসায়ী, কমিশন এজেন্ট, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারাও এর প্রভাব অনুভব করছেন।Reimagining Regional Trade: Pakistan's Transit Corridor Through Iran vs  Afghanistan

ট্রানজিট চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে ট্রানজিট বাণিজ্যের মূল ভিত্তি ছিল আফগানিস্তান-পাকিস্তান ট্রানজিট বাণিজ্য চুক্তি। এর লক্ষ্য ছিল দুই দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া। পাকিস্তান আফগানিস্তানকে সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেবে, আর আফগানিস্তান পাকিস্তানকে মধ্য এশিয়ার দিকে সম্ভাব্য স্থলপথ হিসেবে যুক্ত করবে—এটাই ছিল মূল ধারণা।

কিন্তু নিরাপত্তা সমস্যা, চোরাচালান, বিধিবিধান নিয়ে বিরোধ এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থার বাণিজ্যিক গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে।

পাকিস্তানের উদ্বেগও বাস্তব। আফগানিস্তানের জন্য নির্ধারিত ট্রানজিট পণ্য পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বাজারে চলে গেলে সরকার রাজস্ব হারায় এবং দেশীয় ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। এই সমস্যা ঠেকাতে ২০২৩ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান আফগান ট্রানজিট পণ্যের নির্দিষ্ট কয়েকটি শ্রেণির ওপর ১০ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ ফি আরোপ করেছিল। এসব পণ্যের মধ্যে পোশাক, জুতা, যন্ত্রপাতি, কম্বল ও বস্ত্র ছিল।

তবে আফগান ব্যবসায়ীদেরও নিজস্ব উদ্বেগ রয়েছে। অতিরিক্ত কাগজপত্র, আর্থিক শর্ত, পণ্য পরীক্ষা কিংবা সীমান্তে দীর্ঘ অপেক্ষা বাণিজ্যের খরচ ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়। যখন ইরানের বিকল্প পথ তুলনামূলকভাবে লাভজনক হয়ে ওঠে, তখন ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবেই সেই পথে যেতে আগ্রহী হন।

একবার নতুন সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হয়ে গেলে পুরোনো পথে ব্যবসায়ীদের ফিরিয়ে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ

এই বাণিজ্যপথের পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ছে খাইবার পাখতুনখাওয়ায়। পেশোয়ারের ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী, গুদাম মালিক, পণ্য খালাসকারী প্রতিষ্ঠান এবং উৎপাদনকারীরা এমন একটি পরস্পরনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ, যার ভিত্তি ছিল আফগানিস্তান এবং তার পরবর্তী মধ্য এশিয়ার বাজারে প্রবেশাধিকার।

পাক-আফগান যৌথ বাণিজ্য ও শিল্প পরিষদের হিসাবে, চলতি বছরের আট মাসে সীমান্ত বিধিনিষেধ ও অবরোধের কারণে পাকিস্তানি রপ্তানিকারকদের প্রায় ২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার ক্ষতি হয়েছে। আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বার্ষিক রপ্তানি প্রায় ১৫০ কোটি ডলার এবং আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে মধ্য এশিয়ার বাজারে পাকিস্তানের রপ্তানি বছরে প্রায় ৮০ কোটি ডলার বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভূগোলই ছিল এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সুবিধা। পেশোয়ার ও বৃহত্তর খাইবার করিডোর পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। আফগানিস্তান বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি করায় সেই সুবিধাই এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

দুই দেশেরই দরকার স্থিতিশীল বাণিজ্যব্যবস্থা

আফগানিস্তানের বাণিজ্যপথ পরিবর্তনের ফলে পাকিস্তানের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, আফগানিস্তানও এর অর্থনৈতিক মূল্য দিচ্ছে। দীর্ঘ বিকল্প পথে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পাকিস্তান হারাচ্ছে বন্দরনির্ভর ব্যবসা, পরিবহন, গুদাম, শুল্কসংক্রান্ত কার্যক্রম এবং আফগান বাজারে প্রবেশের সুযোগ।

তাই আফগান ট্রানজিট বাণিজ্যের পতনকে শুধু নিরাপত্তা বা কূটনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। একইভাবে পাকিস্তানের পথ বাদ দিয়ে ইরান ও মধ্য এশিয়ার বিকল্প করিডোর বেছে নিলেই আফগানিস্তানের সব সমস্যা সমাধান হবে—এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।

দুই দেশেরই প্রয়োজন এমন একটি পূর্বানুমানযোগ্য, স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক ট্রানজিট ব্যবস্থা, যেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবসার খরচ, সময় ও অনিশ্চয়তা কমানো হবে। নইলে আফগানিস্তানের বাণিজ্যপথের এই পরিবর্তন শুধু দুই দেশের বাণিজ্য নয়, সীমান্তঘেঁষা পুরো শিল্প ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থাকেই দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দিতে পারে।

আফগানিস্তানের বাণিজ্যপথ বদলের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের সামনে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—ভূগোলের যে সুবিধা বহু দশক ধরে পেশোয়ার ও খাইবার পাখতুনখাওয়াকে দিয়েছে, তা কি আবার অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে?

আফগানিস্তানের বাণিজ্যপথ ইরান ও মধ্য এশিয়ার দিকে সরে যাওয়ায় পাকিস্তানের ট্রানজিট বাণিজ্য, শিল্প ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার অর্থনীতি বড় ঝুঁকিতে পড়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বাংলাদেশ, অংশগ্রহণে আপত্তি নেই

আফগানিস্তানের বাণিজ্যপথ বদলে যাচ্ছে, বড় ঝুঁকিতে পাকিস্তানের শিল্প-বাণিজ্য

০৮:২৩:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

তালেবান কাবুলের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও পেশোয়ারের জন্য এটি আর শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বিষয় নয়; বরং শিল্পের সক্ষমতা, বাজার ধরে রাখা এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আফগান ট্রানজিট বাণিজ্যে বড় ধস

পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের ট্রানজিট বাণিজ্য একসময় দ্রুত বাড়ছিল। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার আগে প্রায় ৮৯ হাজার কনটেইনারে ৫০০ কোটি ডলারের পণ্য পরিবহন হতো। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা রেকর্ড ১ লাখ ২ হাজার ৮৮৬ কনটেইনারে পৌঁছে, যার মূল্য ছিল প্রায় ৬৭০ কোটি ডলার।

এরপর থেকেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কনটেইনার সংখ্যা নেমে আসে ৫৪ হাজার ১১৪টিতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৯৫৯টিতে, যার মূল্য ছিল ১৩৬ কোটি ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিস্থিতি কার্যত ভেঙে পড়ে। মাত্র ১১ হাজার ৫৯২টি কনটেইনারে ৩৬ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য পাকিস্তানের পথ ব্যবহার করে আফগানিস্তানে যায়।

অর্থাৎ, ২০২৫ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের সীমান্ত বিধিনিষেধ আরোপের আগেই এই পতনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। সীমান্তে বিধিনিষেধ সেই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে।

ইরান ও মধ্য এশিয়ার দিকে আফগানিস্তানের ঝুঁকে পড়া

আফগানিস্তান এখন আমদানির জন্য বিকল্প পথ তৈরি করছে। এর মধ্যে ইরানের করিডোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আফগানিস্তানের মোট আমদানির ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ এসেছে ইরান থেকে। সরাসরি ইরান থেকে আসা পণ্য এবং ইরানের মধ্য দিয়ে আসা পণ্য মিলিয়ে দেশটির মোট আমদানির ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ এই পথের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন বাণিজ্যপথও ধীরে ধীরে গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে পাকিস্তান শুধু ট্রানজিট ফি হারাচ্ছে না, আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবেও তার পুরোনো অবস্থান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

আফগানিস্তানের পণ্য পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে তৃতীয় দেশে যাওয়ার বাণিজ্যেও ভয়াবহ পতন ঘটেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যার মূল্য ছিল ৪৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার, পরের অর্থবছরে তা মাত্র ৭০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।

পেশোয়ারের ব্যবসায়িক কাঠামোতে চাপ

দশকের পর দশক আফগানিস্তানের চাহিদাকে ঘিরে করাচির সমুদ্রবন্দর থেকে পেশোয়ার ও সীমান্তবর্তী বাজার পর্যন্ত একটি বিশাল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল। উৎপাদনকারী, পাইকার, পরিবহন ব্যবসায়ী, পণ্য খালাসকারী প্রতিষ্ঠান, গুদাম মালিক এবং আর্থিক মধ্যস্থতাকারীরা এই বাণিজ্য থেকে উপকৃত হয়েছেন।

এখন সেই পণ্যপ্রবাহ কমে যাওয়ায় ক্ষতির প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে পুরো শিল্পব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ছে।

সিমেন্ট, নির্মাণসামগ্রী, খাদ্যপণ্য, ওষুধ, বস্ত্র এবং ভোগ্যপণ্যের বড় একটি বাজার ছিল আফগানিস্তান। আফগান ক্রয়াদেশ কমে গেলে উৎপাদনকারী ও পাইকার উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন। একটি ট্রাক সীমান্ত পার হতে না পারলে পরিবহন ব্যবসায়ীর আয় কমে যায়। গুদামে পণ্য না থাকলে শ্রমিকের প্রয়োজন কমে যায়। পাইকারের ক্রেতা কমলে কারখানা থেকে তার পণ্য কেনার পরিমাণও কমে যায়। শেষ পর্যন্ত কারখানার উৎপাদনও কমে আসে।

এর সঙ্গে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যেমন কয়লা সরবরাহে সীমান্তবর্তী বিঘ্ন উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে। অর্থাৎ একদিকে রপ্তানি চাহিদা কমছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এই দ্বিমুখী চাপ শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে।

সীমান্ত বন্ধের বড় আঘাত কৃষিতেও

বাণিজ্যপথের অস্থিরতার প্রভাব শুধু শিল্পে সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্তের দুই পাশের কৃষিপণ্য বাজারও এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ফল ও সবজির মতো দ্রুত পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে সীমান্তে বিলম্ব বড় ধরনের ক্ষতি তৈরি করে।

২০২৫ সালে আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের পাঁচটি প্রধান আঙুর উৎপাদনকারী প্রদেশ থেকে ৪৪ হাজার ২২৫ টন আঙুর রপ্তানি হয়েছিল, যার মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ হাজার টনই পাকিস্তানে গিয়েছিল। বাকি অংশ গিয়েছিল বাংলাদেশ, ইরাক ও ভারতে।

কিন্তু ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত রপ্তানি নেমে এসেছে মাত্র ২৫৬ টনে, যার মূল্য প্রায় ১ লাখ ডলার। এই ক্ষতি শুধু আফগান কৃষকদের নয়; পাকিস্তানের পরিবহন ব্যবসায়ী, কমিশন এজেন্ট, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারাও এর প্রভাব অনুভব করছেন।Reimagining Regional Trade: Pakistan's Transit Corridor Through Iran vs  Afghanistan

ট্রানজিট চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে ট্রানজিট বাণিজ্যের মূল ভিত্তি ছিল আফগানিস্তান-পাকিস্তান ট্রানজিট বাণিজ্য চুক্তি। এর লক্ষ্য ছিল দুই দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া। পাকিস্তান আফগানিস্তানকে সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেবে, আর আফগানিস্তান পাকিস্তানকে মধ্য এশিয়ার দিকে সম্ভাব্য স্থলপথ হিসেবে যুক্ত করবে—এটাই ছিল মূল ধারণা।

কিন্তু নিরাপত্তা সমস্যা, চোরাচালান, বিধিবিধান নিয়ে বিরোধ এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থার বাণিজ্যিক গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে।

পাকিস্তানের উদ্বেগও বাস্তব। আফগানিস্তানের জন্য নির্ধারিত ট্রানজিট পণ্য পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বাজারে চলে গেলে সরকার রাজস্ব হারায় এবং দেশীয় ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। এই সমস্যা ঠেকাতে ২০২৩ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান আফগান ট্রানজিট পণ্যের নির্দিষ্ট কয়েকটি শ্রেণির ওপর ১০ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ ফি আরোপ করেছিল। এসব পণ্যের মধ্যে পোশাক, জুতা, যন্ত্রপাতি, কম্বল ও বস্ত্র ছিল।

তবে আফগান ব্যবসায়ীদেরও নিজস্ব উদ্বেগ রয়েছে। অতিরিক্ত কাগজপত্র, আর্থিক শর্ত, পণ্য পরীক্ষা কিংবা সীমান্তে দীর্ঘ অপেক্ষা বাণিজ্যের খরচ ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়। যখন ইরানের বিকল্প পথ তুলনামূলকভাবে লাভজনক হয়ে ওঠে, তখন ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবেই সেই পথে যেতে আগ্রহী হন।

একবার নতুন সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হয়ে গেলে পুরোনো পথে ব্যবসায়ীদের ফিরিয়ে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ

এই বাণিজ্যপথের পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ছে খাইবার পাখতুনখাওয়ায়। পেশোয়ারের ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী, গুদাম মালিক, পণ্য খালাসকারী প্রতিষ্ঠান এবং উৎপাদনকারীরা এমন একটি পরস্পরনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ, যার ভিত্তি ছিল আফগানিস্তান এবং তার পরবর্তী মধ্য এশিয়ার বাজারে প্রবেশাধিকার।

পাক-আফগান যৌথ বাণিজ্য ও শিল্প পরিষদের হিসাবে, চলতি বছরের আট মাসে সীমান্ত বিধিনিষেধ ও অবরোধের কারণে পাকিস্তানি রপ্তানিকারকদের প্রায় ২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার ক্ষতি হয়েছে। আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বার্ষিক রপ্তানি প্রায় ১৫০ কোটি ডলার এবং আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে মধ্য এশিয়ার বাজারে পাকিস্তানের রপ্তানি বছরে প্রায় ৮০ কোটি ডলার বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভূগোলই ছিল এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সুবিধা। পেশোয়ার ও বৃহত্তর খাইবার করিডোর পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। আফগানিস্তান বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি করায় সেই সুবিধাই এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

দুই দেশেরই দরকার স্থিতিশীল বাণিজ্যব্যবস্থা

আফগানিস্তানের বাণিজ্যপথ পরিবর্তনের ফলে পাকিস্তানের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, আফগানিস্তানও এর অর্থনৈতিক মূল্য দিচ্ছে। দীর্ঘ বিকল্প পথে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পাকিস্তান হারাচ্ছে বন্দরনির্ভর ব্যবসা, পরিবহন, গুদাম, শুল্কসংক্রান্ত কার্যক্রম এবং আফগান বাজারে প্রবেশের সুযোগ।

তাই আফগান ট্রানজিট বাণিজ্যের পতনকে শুধু নিরাপত্তা বা কূটনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। একইভাবে পাকিস্তানের পথ বাদ দিয়ে ইরান ও মধ্য এশিয়ার বিকল্প করিডোর বেছে নিলেই আফগানিস্তানের সব সমস্যা সমাধান হবে—এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।

দুই দেশেরই প্রয়োজন এমন একটি পূর্বানুমানযোগ্য, স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক ট্রানজিট ব্যবস্থা, যেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবসার খরচ, সময় ও অনিশ্চয়তা কমানো হবে। নইলে আফগানিস্তানের বাণিজ্যপথের এই পরিবর্তন শুধু দুই দেশের বাণিজ্য নয়, সীমান্তঘেঁষা পুরো শিল্প ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থাকেই দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দিতে পারে।

আফগানিস্তানের বাণিজ্যপথ বদলের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের সামনে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—ভূগোলের যে সুবিধা বহু দশক ধরে পেশোয়ার ও খাইবার পাখতুনখাওয়াকে দিয়েছে, তা কি আবার অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে?

আফগানিস্তানের বাণিজ্যপথ ইরান ও মধ্য এশিয়ার দিকে সরে যাওয়ায় পাকিস্তানের ট্রানজিট বাণিজ্য, শিল্প ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার অর্থনীতি বড় ঝুঁকিতে পড়েছে।