তরুণ বেঙ্গালিজ ফিঞ্চ পাখি প্রাপ্তবয়স্ক পাখির কাছ থেকে মানুষের শিশুর ভাষা শেখার মতোই ধাপে ধাপে গান শেখে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, পাখির এই গানও আসলে ছোট ছোট অংশে গঠিত, যেগুলো অনেকটা মানুষের ভাষার শব্দের মতো কাজ করে।
এ গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন এডিনবরার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইমন কিরবি, তেইকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজুও ওকানোয়া এবং জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনবাল আরনন। গবেষকেরা মানুষের শিশুদের ভাষা শেখার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি ছয়টি তরুণ পুরুষ ফিঞ্চ পাখির গানের ওপর প্রয়োগ করেন।
গানের অংশগুলো অনেকটা শব্দের মতো
গবেষক ইনবাল আরননের মতে, পাখির গানের ছোট ছোট অংশ দুটি বৈশিষ্ট্যে মানুষের ভাষার শব্দের সঙ্গে মিল রাখে। একটি অংশের কোনো নির্দিষ্ট ধ্বনি শুনলে পরের ধ্বনিটি কী হতে পারে, তা অনেকটাই অনুমান করা যায়। আবার কিছু অংশ বারবার ব্যবহৃত হয়, অন্য অনেক অংশ তুলনামূলকভাবে খুব কম ব্যবহৃত হয়।
মানুষের ভাষায়ও এই বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা যায়। আরননের ভাষায়, শেখার প্রক্রিয়াকে সহজ করে বলেই ভাষায় এমন বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
শুধু পুরুষ ফিঞ্চ পাখিই গান গায়। প্রতিটি তরুণ পুরুষ পাখি একটি মাত্র প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষকের কাছ থেকে নিজের গান শেখে। প্রতিটি পাখির গানে সাধারণত প্রায় আট ধরনের আলাদা মাত্রা থাকে। তবে সেগুলো কী ক্রমে সাজাবে, তা প্রতিটি পাখির ক্ষেত্রে আলাদা।
ধ্বনির ধারাবাহিকতা থেকেই অংশ চিহ্নিত
গবেষকেরা রেকর্ড করা গানে একটি মাত্রার পর আরেকটি মাত্রা কতবার এসেছে, তা হিসাব করেন। মানুষের কথাবার্তা শোনার সময় শিশুরা যেভাবে পরবর্তী ধ্বনি অনুমান করার চেষ্টা করে, এটিও ছিল অনেকটা একই ধরনের পদ্ধতি।
যখন কোনো একটি মাত্রার পরবর্তী মাত্রাটি আগেরটির তুলনায় অর্ধেকেরও কম অনুমানযোগ্য হয়ে পড়ে, তখন গবেষকেরা সেই স্থানটিকে গানের একটি অংশের শেষ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
একটি পাখির গানের শুরু ছিল ‘সিসি, বিবিসি, আআআআআআ’-এর মতো ধারাবাহিকতা। পরে পাখিটি ‘বিসিসিডিডিইএফআআআ’ ধরনের একটি দীর্ঘ অংশ বারবার গেয়ে যায়।
এর আগে পরিচালিত পরীক্ষাতেও দেখা গিয়েছিল, একাধিক শিক্ষকের কাছে বেড়ে ওঠা বাচ্চা পাখি বিভিন্ন প্রাপ্তবয়স্ক পাখির গানের অংশ জুড়ে নতুন গান তৈরি করে। তারা সাধারণত এমন জায়গায় দুটি অংশকে যুক্ত করত, যেখানে পরবর্তী মাত্রাটি অনুমান করা সবচেয়ে কঠিন ছিল।

মানুষের ভাষার নিয়মের সঙ্গেও মিল
মানুষের বিভিন্ন ভাষায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দটি সাধারণত দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দের প্রায় দ্বিগুণ এবং তৃতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দের প্রায় তিন গুণ ব্যবহৃত হয়। ইংরেজি ভাষায় ‘দ্য’ শব্দটি এর একটি পরিচিত উদাহরণ। ভাষাবিজ্ঞানে এই ধরনের ব্যবহারের প্রবণতাকে জিপফের সূত্র বলা হয়।
গবেষকেরা ৩০টি ফিঞ্চের গানের রেকর্ডিং বিশ্লেষণ করে একই ধরনের প্রবণতা দেখতে পান। এই হিসাবের রেখার খাড়া হওয়ার মাত্রা ছিল ১ দশমিক ০৫, যা মানুষের ভাষায় দেখা মাত্রার সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে যায়।
তবে গবেষকেরা নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন, এই মিলটি সত্যিই গানের অংশগুলোর বিন্যাস থেকে এসেছে কি না। তাই তারা প্রতিটি গানের মাত্রাগুলো এলোমেলো করে এক হাজারটি কৃত্রিম গান তৈরি করেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এলোমেলো গানগুলো বাস্তব গানের তুলনায় জিপফের সূত্রের সঙ্গে কম সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পরীক্ষায় আরও শক্ত প্রমাণ
গবেষকেরা আরও দুটি কঠোর পরীক্ষা চালান। প্রথম পরীক্ষায় পাশাপাশি থাকা মাত্রার জোড়াগুলো একসঙ্গে রাখা হয়। দ্বিতীয় পরীক্ষায় গানের মধ্যে চিহ্নিত বিভাজনগুলোর অবস্থান ইচ্ছামতো কিছুটা সরিয়ে দেওয়া হয়।
দুই পরীক্ষাতেই বাস্তব গানগুলোই জিপফের সূত্রের সঙ্গে সবচেয়ে ভালোভাবে মিলে যায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মানুষের কথ্য ভাষার আরেকটি বৈশিষ্ট্যও ফিঞ্চের গানে রয়েছে—যে অংশগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, সেগুলো সাধারণত সবচেয়ে ছোট।
এসব ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, ফিঞ্চ পাখির গান শেখার পদ্ধতি মানুষের শিশুর ভাষা শেখার প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি মিল রয়েছে। এতে মানুষের ভাষা কীভাবে শেখা ও গঠিত হয়, তা বোঝার ক্ষেত্রেও পাখির গান নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার পথ খুলে দিতে পারে।
মানুষের ভাষা শেখার পেছনে যে মৌলিক শেখার প্রক্রিয়াগুলো কাজ করে, তার কিছু বৈশিষ্ট্য অন্য প্রাণীর যোগাযোগব্যবস্থাতেও থাকতে পারে—এই গবেষণা সেই সম্ভাবনাকেই আরও জোরালো করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















