০৯:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বাংলাদেশ, অংশগ্রহণে আপত্তি নেই ইমরান খানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের প্রতি সাবেক ক্রিকেট অধিনায়কদের আহ্বান লুকানো পেটের চর্বি হৃদ্‌যন্ত্রকে দ্রুত বুড়িয়ে দিতে পারে, বলছে নতুন গবেষণা মানুষের শিশুর মতোই গান শেখে তরুণ ফিঞ্চ পাখি গাজায় ইসরায়েলি হামলায় শিশুসহ নিহত ৩ নারীর শরীর নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার কারও নেই, বললেন নাইমাল খাওয়ার তালেবান শাসনে আফগানিস্তান: বিবাহবিচ্ছেদ থেকে স্মার্টফোন, সর্বত্র নিয়ন্ত্রণের ছায়া ওয়েলসের সর্বোচ্চ পর্বতে লাইন নিয়ে তুমুল বিতর্ক, ‘এটা তো বিনোদনকেন্দ্র নয়’ আফগানিস্তানের বাণিজ্যপথ বদলে যাচ্ছে, বড় ঝুঁকিতে পাকিস্তানের শিল্প-বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিবাসন নিয়ম: বিদেশি শিক্ষার্থীদের ১৫ সেপ্টেম্বরের আগেই ফিরতে বলছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

তালেবান শাসনে আফগানিস্তান: বিবাহবিচ্ছেদ থেকে স্মার্টফোন, সর্বত্র নিয়ন্ত্রণের ছায়া

আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পর দেশটির সাধারণ মানুষের জীবন কতটা বদলেছে, বিশেষ করে নারী ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিস্থিতি কী—তার এক ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে। তালেবান নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে এবং দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, শাসকদের কথায় পরিবর্তনের দাবি থাকলেও বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে আগের কঠোর নীতিই বহাল রয়েছে।

নির্যাতিত নারীর বিবাহবিচ্ছেদের আকুতি

উত্তর আফগানিস্তানের জওজান প্রদেশের গভর্নর আবদুল্লাহ সারহাদির দপ্তরে এক তরুণী তার স্বামীর কাছ থেকে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। ১৮ বছর বয়সী ওই নারী অভিযোগ করেন, স্বামী তাকে কয়েক মাস ধরে মারধর ও নির্যাতন করে আসছেন।

মুখ পুরোপুরি ঢেকে এবং চোখে কালো চশমা পরে তিনি গভর্নরের সামনে নিজের সিদ্ধান্তের কথা স্পষ্টভাবে জানান।

তিনি বলেন, একসঙ্গে সংসার করার কোনো সম্ভাবনা থাকলে তিনি সেখানে আসতেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন এবং সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়াবেন না।

কিন্তু গভর্নর তাকে বিবাহবিচ্ছেদ না করার পরামর্শ দেন। এমনকি তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিচ্ছেদের পর কে তাকে বিয়ে করবে। তার মতে, বিচ্ছেদের পর ওই নারীকে অনেক কিছুতেই আপস করতে হবে, নইলে তার সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে।

তরুণী জবাব দেন, তার সম্মান ও মর্যাদা এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।

পরে গভর্নর নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। সেখানে উপস্থিত পুরুষ কর্মকর্তা, দেহরক্ষী ও প্রবীণদের মধ্যে হাসির পরিবেশ তৈরি হয়।

তরুণীর বাবা পরে জানান, পরিবার আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের চেষ্টা করবে। তবে তালেবান নিয়ন্ত্রিত বিচারব্যবস্থায় স্বামীর সম্মতি ছাড়া একজন নারীর বিবাহবিচ্ছেদ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

নারীর শিক্ষা ও স্বাধীনতায় কঠোর বিধিনিষেধ

তালেবান ২০২১ সালে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর নারীদের জীবনযাত্রায় একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা থেকে মেয়েদের বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের পড়াশোনা বন্ধ। অধিকাংশ কর্মক্ষেত্রেও তাদের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। একা ভ্রমণ, বিনোদনকেন্দ্র কিংবা পার্কে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা বিধিনিষেধ রয়েছে।

তালেবান নেতারা অবশ্য এসব সিদ্ধান্তকে ইসলামী শরিয়াহর আলোকে ব্যাখ্যা করেন।

তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অন্যান্য বিষয়কে শরিয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে।

তার দাবি, নারীদের জন্য শিক্ষার বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং শরিয়াহভিত্তিক সমাধান খোঁজা হচ্ছে।

তবে নারীদের কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, এতে অনৈতিকতার সৃষ্টি হতে পারে এবং নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।Taliban bans smartphone use for Afghan civil servants, sparking fears over  information access

স্মার্টফোন নিয়েও কড়াকড়ি

তালেবান শাসনে শুধু নারীর জীবন নয়, কর্মকর্তাদের যোগাযোগব্যবস্থাতেও বিধিনিষেধ বাড়ানো হয়েছে।

জওজানের গভর্নর সারহাদি জানান, সরকারি কর্মকর্তাদের স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রশাসনিক কাজ ধীর হয়ে গেছে। আগে দ্রুত বার্তা পাঠানো, নথি আদান-প্রদান এবং দ্রুত উত্তর পাওয়া সম্ভব হলেও এখন সেই কাজগুলো কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে এ বিষয়ে বেশি কথা বলতে তিনি অনিচ্ছুক। তার ভাষায়, নিষেধাজ্ঞাটি নিয়ে বেশি কথা বললে তার জন্য সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের দায় স্বীকার

সারহাদি তালেবানের প্রথম শাসনামলেও সামরিক কমান্ডার ছিলেন। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী তালেবান সরকারকে উৎখাত করার পর তিনি আত্মসমর্পণ করেন এবং পরে দীর্ঘ সময় গুয়ানতানামো বে কারাগারে আটক ছিলেন।

তালেবান ২০২১ সালে আবার ক্ষমতায় ফিরলে তিনি প্রথমে বামিয়ান এবং পরে জওজান প্রদেশের গভর্নর হন।

বামিয়ানে থাকা প্রাচীন বিশাল বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের প্রসঙ্গ উঠলে প্রথমে তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে চান। পরে সরাসরি বলেন, মূর্তিটি তিনি নিজের হাতেই ধ্বংস করেছিলেন।

তার বক্তব্য, তালেবান যা করেছে এবং করছে, তা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ ও ধর্মীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই ওই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য তার কোনো অনুশোচনা নেই।

আত্মঘাতী হামলার সঙ্গে যুক্ত সাবেক যোদ্ধা এখন সরকারি কর্মকর্তা

রাজধানী কাবুলে তালেবানের আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ বদরের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি সশস্ত্র গাড়িতে চলাফেরা করেন।

বদর জানান, তালেবানের বিদ্রোহের সময় তিনি কাবুলে আত্মঘাতী হামলাকারীদের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তা ও গলিপথ সম্পর্কে তাদের বিস্তারিত তথ্য ছিল এবং হামলার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা করা হতো।

তালেবানের বিভিন্ন আত্মঘাতী হামলায় আফগানিস্তানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বহু বেসামরিক নাগরিক ছিলেন।

তবে নিজের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বদর খুব সতর্ক ছিলেন। তিনি বলেন, অতীতের এসব ঘটনা নিয়ে বেশি আলোচনা করলে মানুষের কষ্ট আবার জেগে উঠতে পারে।

বেসামরিক মানুষের মৃত্যু নিয়ে নির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হলেও তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

মেয়েদের স্কুল খোলার দাবি উঠতেই থেমে গেল কণ্ঠ

এক উপজাতীয় সমাবেশে বদরকে সম্মাননা দেওয়ার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে সুলতান মোহাম্মদ তালাই নামে এক ব্যক্তি হঠাৎ তালেবান সরকারের শিক্ষানীতির সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, ছেলে-মেয়ে সবার জন্য স্কুল ও শিক্ষা উন্মুক্ত করা হলে তা আফগানিস্তানের জন্য বড় অর্জন হবে।

এরপর পরিবেশ হঠাৎ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। উপস্থিত ব্যক্তিরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন বুঝে উঠতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর তার হাতে থাকা মাইক্রোফোন সরিয়ে নেওয়া হয়।

পরে তিনি জানান, মেয়েদের স্কুল খুলে দেওয়ার আবেদনই তিনি করেছিলেন। ইসলামে জ্ঞান অর্জন নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই কর্তব্য—এ কথাও তিনি বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে আর বেশি কথা বলতে দেওয়া হয়নি।

প্রতিবাদ করলেই কঠোর শাস্তির ভয়

আফগানিস্তানে তালেবানবিরোধী প্রকাশ্য সমালোচনার সুযোগ খুবই সীমিত। অনেক নারী জানিয়েছেন, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় তারা গভীর হতাশায় ভুগছেন। কেউ কেউ প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারাগারেও গেছেন।

সাংবাদিকদের অনেকেই জানিয়েছেন, তালেবানের গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে তাদের ডেকে পাঠানো হয়েছে অথবা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

তালেবান সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হচ্ছে, দেশের সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার কারণে কিছু সীমাবদ্ধতা প্রয়োজন।

কান্দাহারে আরও কঠোর পরিবেশ

তালেবানের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কান্দাহারে বিধিনিষেধ আরও কঠোর হয়েছে। সেখানে পুরুষদের দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বেতারকেন্দ্রগুলোতে গান বাজানো কিংবা নারীদের কণ্ঠ সম্প্রচারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

শহরের বিভিন্ন স্থানে সংবাদকর্মীদের ছবি ধারণের অনুমতিও দেওয়া হয়নি।

তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাও কান্দাহারে অবস্থান করেন। তিনি খুব কমই প্রকাশ্যে আসেন এবং এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমকে কোনো সাক্ষাৎকার দেননি।

পাঁচ বছর পরও দারিদ্র্য আর বেকারত্ব

তালেবান দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পরও আফগানিস্তানের বড় সংকটগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা।

দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের প্রয়োজন পানি, রাস্তা ও চিকিৎসাকেন্দ্র। তালেবানের স্থানীয় কর্মকর্তারাও এসব সমস্যার কথা স্বীকার করছেন।

তবে সাধারণ মানুষের একটি অংশ মনে করে, দেশের সমস্যার সমাধানের বদলে তালেবান নিজেই বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর রাস্তায় প্রতিবাদ করা এক নারী বলেন, নারীরা বর্তমান পরিস্থিতি মেনে নিতে পারছেন না। তার মতে, তালেবান যতই বিধিনিষেধ বাড়াক, এই অবস্থা চিরস্থায়ী হবে না।

তার অভিযোগ, তালেবান শিক্ষিত নারীদের ভয় পায়। কারণ শিক্ষিত ও সচেতন নারীরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রশ্ন করতে শেখাতে পারেন, আর সেটিই তালেবানের জন্য সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।

আফগানিস্তানের বর্তমান বাস্তবতা তাই এক গভীর বৈপরীত্যের ছবি তুলে ধরছে। তালেবান নিজেদের পরিবর্তিত ও দায়িত্বশীল শাসক হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও নারী স্বাধীনতা, শিক্ষা, মতপ্রকাশ এবং সামাজিক জীবনে তাদের আরোপিত বিধিনিষেধ দেশটির মানুষের জীবনকে এখনও কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বাংলাদেশ, অংশগ্রহণে আপত্তি নেই

তালেবান শাসনে আফগানিস্তান: বিবাহবিচ্ছেদ থেকে স্মার্টফোন, সর্বত্র নিয়ন্ত্রণের ছায়া

০৮:২৯:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পর দেশটির সাধারণ মানুষের জীবন কতটা বদলেছে, বিশেষ করে নারী ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিস্থিতি কী—তার এক ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে। তালেবান নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে এবং দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, শাসকদের কথায় পরিবর্তনের দাবি থাকলেও বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে আগের কঠোর নীতিই বহাল রয়েছে।

নির্যাতিত নারীর বিবাহবিচ্ছেদের আকুতি

উত্তর আফগানিস্তানের জওজান প্রদেশের গভর্নর আবদুল্লাহ সারহাদির দপ্তরে এক তরুণী তার স্বামীর কাছ থেকে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। ১৮ বছর বয়সী ওই নারী অভিযোগ করেন, স্বামী তাকে কয়েক মাস ধরে মারধর ও নির্যাতন করে আসছেন।

মুখ পুরোপুরি ঢেকে এবং চোখে কালো চশমা পরে তিনি গভর্নরের সামনে নিজের সিদ্ধান্তের কথা স্পষ্টভাবে জানান।

তিনি বলেন, একসঙ্গে সংসার করার কোনো সম্ভাবনা থাকলে তিনি সেখানে আসতেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন এবং সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়াবেন না।

কিন্তু গভর্নর তাকে বিবাহবিচ্ছেদ না করার পরামর্শ দেন। এমনকি তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিচ্ছেদের পর কে তাকে বিয়ে করবে। তার মতে, বিচ্ছেদের পর ওই নারীকে অনেক কিছুতেই আপস করতে হবে, নইলে তার সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে।

তরুণী জবাব দেন, তার সম্মান ও মর্যাদা এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।

পরে গভর্নর নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। সেখানে উপস্থিত পুরুষ কর্মকর্তা, দেহরক্ষী ও প্রবীণদের মধ্যে হাসির পরিবেশ তৈরি হয়।

তরুণীর বাবা পরে জানান, পরিবার আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের চেষ্টা করবে। তবে তালেবান নিয়ন্ত্রিত বিচারব্যবস্থায় স্বামীর সম্মতি ছাড়া একজন নারীর বিবাহবিচ্ছেদ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

নারীর শিক্ষা ও স্বাধীনতায় কঠোর বিধিনিষেধ

তালেবান ২০২১ সালে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর নারীদের জীবনযাত্রায় একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা থেকে মেয়েদের বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের পড়াশোনা বন্ধ। অধিকাংশ কর্মক্ষেত্রেও তাদের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। একা ভ্রমণ, বিনোদনকেন্দ্র কিংবা পার্কে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা বিধিনিষেধ রয়েছে।

তালেবান নেতারা অবশ্য এসব সিদ্ধান্তকে ইসলামী শরিয়াহর আলোকে ব্যাখ্যা করেন।

তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অন্যান্য বিষয়কে শরিয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে।

তার দাবি, নারীদের জন্য শিক্ষার বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং শরিয়াহভিত্তিক সমাধান খোঁজা হচ্ছে।

তবে নারীদের কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, এতে অনৈতিকতার সৃষ্টি হতে পারে এবং নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।Taliban bans smartphone use for Afghan civil servants, sparking fears over  information access

স্মার্টফোন নিয়েও কড়াকড়ি

তালেবান শাসনে শুধু নারীর জীবন নয়, কর্মকর্তাদের যোগাযোগব্যবস্থাতেও বিধিনিষেধ বাড়ানো হয়েছে।

জওজানের গভর্নর সারহাদি জানান, সরকারি কর্মকর্তাদের স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রশাসনিক কাজ ধীর হয়ে গেছে। আগে দ্রুত বার্তা পাঠানো, নথি আদান-প্রদান এবং দ্রুত উত্তর পাওয়া সম্ভব হলেও এখন সেই কাজগুলো কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে এ বিষয়ে বেশি কথা বলতে তিনি অনিচ্ছুক। তার ভাষায়, নিষেধাজ্ঞাটি নিয়ে বেশি কথা বললে তার জন্য সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের দায় স্বীকার

সারহাদি তালেবানের প্রথম শাসনামলেও সামরিক কমান্ডার ছিলেন। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী তালেবান সরকারকে উৎখাত করার পর তিনি আত্মসমর্পণ করেন এবং পরে দীর্ঘ সময় গুয়ানতানামো বে কারাগারে আটক ছিলেন।

তালেবান ২০২১ সালে আবার ক্ষমতায় ফিরলে তিনি প্রথমে বামিয়ান এবং পরে জওজান প্রদেশের গভর্নর হন।

বামিয়ানে থাকা প্রাচীন বিশাল বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের প্রসঙ্গ উঠলে প্রথমে তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে চান। পরে সরাসরি বলেন, মূর্তিটি তিনি নিজের হাতেই ধ্বংস করেছিলেন।

তার বক্তব্য, তালেবান যা করেছে এবং করছে, তা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ ও ধর্মীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই ওই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য তার কোনো অনুশোচনা নেই।

আত্মঘাতী হামলার সঙ্গে যুক্ত সাবেক যোদ্ধা এখন সরকারি কর্মকর্তা

রাজধানী কাবুলে তালেবানের আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ বদরের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি সশস্ত্র গাড়িতে চলাফেরা করেন।

বদর জানান, তালেবানের বিদ্রোহের সময় তিনি কাবুলে আত্মঘাতী হামলাকারীদের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তা ও গলিপথ সম্পর্কে তাদের বিস্তারিত তথ্য ছিল এবং হামলার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা করা হতো।

তালেবানের বিভিন্ন আত্মঘাতী হামলায় আফগানিস্তানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বহু বেসামরিক নাগরিক ছিলেন।

তবে নিজের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বদর খুব সতর্ক ছিলেন। তিনি বলেন, অতীতের এসব ঘটনা নিয়ে বেশি আলোচনা করলে মানুষের কষ্ট আবার জেগে উঠতে পারে।

বেসামরিক মানুষের মৃত্যু নিয়ে নির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হলেও তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

মেয়েদের স্কুল খোলার দাবি উঠতেই থেমে গেল কণ্ঠ

এক উপজাতীয় সমাবেশে বদরকে সম্মাননা দেওয়ার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে সুলতান মোহাম্মদ তালাই নামে এক ব্যক্তি হঠাৎ তালেবান সরকারের শিক্ষানীতির সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, ছেলে-মেয়ে সবার জন্য স্কুল ও শিক্ষা উন্মুক্ত করা হলে তা আফগানিস্তানের জন্য বড় অর্জন হবে।

এরপর পরিবেশ হঠাৎ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। উপস্থিত ব্যক্তিরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন বুঝে উঠতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর তার হাতে থাকা মাইক্রোফোন সরিয়ে নেওয়া হয়।

পরে তিনি জানান, মেয়েদের স্কুল খুলে দেওয়ার আবেদনই তিনি করেছিলেন। ইসলামে জ্ঞান অর্জন নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই কর্তব্য—এ কথাও তিনি বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে আর বেশি কথা বলতে দেওয়া হয়নি।

প্রতিবাদ করলেই কঠোর শাস্তির ভয়

আফগানিস্তানে তালেবানবিরোধী প্রকাশ্য সমালোচনার সুযোগ খুবই সীমিত। অনেক নারী জানিয়েছেন, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় তারা গভীর হতাশায় ভুগছেন। কেউ কেউ প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারাগারেও গেছেন।

সাংবাদিকদের অনেকেই জানিয়েছেন, তালেবানের গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে তাদের ডেকে পাঠানো হয়েছে অথবা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

তালেবান সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হচ্ছে, দেশের সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার কারণে কিছু সীমাবদ্ধতা প্রয়োজন।

কান্দাহারে আরও কঠোর পরিবেশ

তালেবানের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কান্দাহারে বিধিনিষেধ আরও কঠোর হয়েছে। সেখানে পুরুষদের দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বেতারকেন্দ্রগুলোতে গান বাজানো কিংবা নারীদের কণ্ঠ সম্প্রচারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

শহরের বিভিন্ন স্থানে সংবাদকর্মীদের ছবি ধারণের অনুমতিও দেওয়া হয়নি।

তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাও কান্দাহারে অবস্থান করেন। তিনি খুব কমই প্রকাশ্যে আসেন এবং এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমকে কোনো সাক্ষাৎকার দেননি।

পাঁচ বছর পরও দারিদ্র্য আর বেকারত্ব

তালেবান দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পরও আফগানিস্তানের বড় সংকটগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা।

দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের প্রয়োজন পানি, রাস্তা ও চিকিৎসাকেন্দ্র। তালেবানের স্থানীয় কর্মকর্তারাও এসব সমস্যার কথা স্বীকার করছেন।

তবে সাধারণ মানুষের একটি অংশ মনে করে, দেশের সমস্যার সমাধানের বদলে তালেবান নিজেই বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর রাস্তায় প্রতিবাদ করা এক নারী বলেন, নারীরা বর্তমান পরিস্থিতি মেনে নিতে পারছেন না। তার মতে, তালেবান যতই বিধিনিষেধ বাড়াক, এই অবস্থা চিরস্থায়ী হবে না।

তার অভিযোগ, তালেবান শিক্ষিত নারীদের ভয় পায়। কারণ শিক্ষিত ও সচেতন নারীরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রশ্ন করতে শেখাতে পারেন, আর সেটিই তালেবানের জন্য সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।

আফগানিস্তানের বর্তমান বাস্তবতা তাই এক গভীর বৈপরীত্যের ছবি তুলে ধরছে। তালেবান নিজেদের পরিবর্তিত ও দায়িত্বশীল শাসক হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও নারী স্বাধীনতা, শিক্ষা, মতপ্রকাশ এবং সামাজিক জীবনে তাদের আরোপিত বিধিনিষেধ দেশটির মানুষের জীবনকে এখনও কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেছে।