ওয়েলসের সর্বোচ্চ পর্বত ইর উইডফা, যা স্নোডন নামেও পরিচিত, তার চূড়ায় ওঠার পথে লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে পর্বতারোহী ও দর্শনার্থীদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রচণ্ড গরমের কারণে এ বছর সেখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চূড়ায় ওঠার শেষ অংশে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। অনেককে এক ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
চূড়ায় উঠতে দীর্ঘ অপেক্ষা
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৮৫ মিটার উঁচু এই পর্বতের চূড়ায় একটি ধাতব ফলক রয়েছে, যেখানে পৌঁছে ছবি তোলার জন্য অনেকেই অপেক্ষা করেন। পর্যটকের চাপ বেড়ে যাওয়ায় সেখানে পাথরের সিঁড়ির ওপর প্রায়ই দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, লাইনে অপেক্ষা করা ব্যক্তিদের সঙ্গে সারি এড়িয়ে সামনে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের তর্ক হচ্ছে।
সম্প্রতি ম্যানচেস্টারের বাসিন্দা মার্ক স্ক্রিটন সারি অতিক্রম করার সময় অন্যদের কটূক্তির মুখে পড়েন। তিনি তখন বলেন, পাহাড়ে উঠে আবার লাইনে দাঁড়ানোর কোনো প্রশ্নই আসে না।
তবে অনেক পর্বতারোহীর মতে, এই সারি শুধু শৃঙ্খলার বিষয় নয়, নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।
‘নিরাপত্তার জন্যই অপেক্ষা করা দরকার’
পর্বতে হাঁটতে আসা লুসি টেলর মনে করেন, সবাইকে নিজেদের পালার জন্য অপেক্ষা করা উচিত। তার মতে, চূড়ায় ওঠার জায়গাটি বেশ বিপজ্জনক এবং সবাই একসঙ্গে ওপরে উঠতে চাইলে পরিস্থিতি অনিরাপদ হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে ওয়েস্ট ব্রোমউইচের টিনা মিলার্ডের মত ভিন্ন। তিনি মনে করেন, পাহাড়ে ওঠার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই।
তার যুক্তি, এটি কোনো বিনোদনকেন্দ্র নয় যে কোনো একটি খেলায় অংশ নিতে মানুষ লাইনে দাঁড়াবে। এটি একটি পাহাড় এবং সবার জন্য উন্মুক্ত জায়গা।
বেডফোর্ডশায়ারের কার্ল লিঞ্চের মতে, চূড়ায় পৌঁছে প্রত্যেকের অল্প সময় অবস্থান করে অন্যদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়া উচিত।
জনপ্রিয়তা বাড়ায় তৈরি হচ্ছে জট
ইরি জাতীয় উদ্যানের জনপ্রিয়তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে পর্বতের চূড়ার কাছাকাছি সরু পথ ও সিঁড়িগুলোতে মানুষের ভিড় জমছে। বিশেষ করে ধাতব চূড়া-চিহ্নের কাছে ছবি তোলার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
জাতীয় উদ্যানের কর্মীরা দর্শনার্থীদের পরিবেশ ও অন্য মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন। দরজা বা গেট ব্যবহার করলে তা বন্ধ রাখা, নিজেদের আবর্জনা সঙ্গে নিয়ে যাওয়া এবং দাবানলের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি সারিতে অন্যদের পালার প্রতি সম্মান দেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
‘অন্যদের সময়ের মূল্যও আছে’
ইরি জাতীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষের এলাকার তত্ত্বাবধায়ক অ্যালুন জোন্স চূড়ার নির্দিষ্ট স্থানে যেতে আগ্রহীদের অন্যদের প্রতি বিবেচনাশীল হওয়ার এবং সারি অতিক্রম না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
নৈতিক দর্শনের বিশেষজ্ঞদের মতে, সেখানে লাইনে দাঁড়ানো কোনো আনুষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা নয়। কিন্তু এটি এক ধরনের অলিখিত সামাজিক নিয়ম।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের নীতিশাস্ত্রের সহকারী অধ্যাপক জোহান গো বলেন, অন্যরা যখন নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করে লাইনে অপেক্ষা করছেন, তখন কেউ সেই সারি অতিক্রম করলে কার্যত তিনি বোঝান যে অন্যদের সময়ের তুলনায় তার নিজের সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে ইর উইডফার চূড়ায় পৌঁছানোর কয়েক মিনিটের এই অপেক্ষা এখন শুধু পর্যটকদের ধৈর্যের পরীক্ষা নয়; এটি পারস্পরিক সম্মান, নিরাপত্তা ও জনসমাগমের মধ্যকার ভারসাম্য নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
ওয়েলসের জনপ্রিয় এই পর্বতে দর্শনার্থীর চাপ যত বাড়ছে, চূড়ায় ওঠার সময় অন্যের পালার প্রতি সম্মান দেখানোও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















