যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ডাক্সবেরিতে তিন সন্তানকে হত্যার অভিযোগে বিচারাধীন লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে জনসমর্থন ও সামাজিক আলোচনার মধ্যেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এই আলোচনায় নিহত তিন শিশুর কথা কি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে?
৩৬ বছর বয়সী লিন্ডসে ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে তাঁর তিন সন্তান কোরাহ, ডসন ও ক্যালানকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পরিবারের বাড়িতে ছয় বছরের কম বয়সী এই তিন শিশুকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাদের মৃত্যুর ঘটনায় লিন্ডসের বিরুদ্ধে তিনটি প্রথম-ডিগ্রি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার বিচারপর্বে লিন্ডসের আইনজীবীরা দাবি করছেন, সন্তানদের হত্যার সময় তিনি প্রসব-পরবর্তী মানসিক বিকারের মধ্যে ছিলেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষজ্ঞরা তাঁর মানসিক অবস্থা ও ঘটনার সময় তাঁর আচরণ বিশ্লেষণ করে তাঁকে অপরাধের জন্য দায়ী করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
‘আমরা সবাই মায়ের নাম জানি, সন্তানদের নাম জানি না’
ছয় সন্তানের মা ও লেখক বেথানি ম্যান্ডেল মনে করেন, মামলাটি নিয়ে আলোচনায় লিন্ডসে ক্ল্যান্সির নাম যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, নিহত তিন শিশুর পরিচয় ও জীবন ততটাই হারিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, লিন্ডসের নাম প্রায় সবাই জানেন, কিন্তু খুব কম মানুষই তাঁর সন্তানদের নাম জানেন।

ম্যান্ডেলের বিশেষ আপত্তি আদালতের বাইরে লিন্ডসের সমর্থনে জড়ো হওয়া শত শত মানুষকে নিয়ে। তাঁদের অনেকেই গোলাপি পোশাক পরে বা গোলাপি প্রতীক নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই সমাবেশ হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করার জন্য নয়; বরং মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্য এবং প্রসব-পরবর্তী মানসিক সমস্যায় ভোগা মায়েদের প্রতি সচেতনতা ও সহমর্মিতা প্রকাশের জন্য।
তবে ম্যান্ডেলের প্রশ্ন, নিহত শিশুদের স্মরণে একইভাবে কেন মানুষকে দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, সমর্থকদের মধ্যে খুব কম মানুষকেই এমন কোনো প্রতীক বহন করতে দেখা যায়, যেখানে তিন শিশুর মুখ রয়েছে। তাঁর মতে, মামলাটি নিয়ে কথা বলার সময়ও শিশুদের প্রসঙ্গ খুব কমই উঠে আসে।
‘মামলাটি আসলে হওয়া উচিত নিহত শিশুদের নিয়ে’
শিশু নির্যাতন ও হত্যার মামলায় অভিজ্ঞ আইনজীবী জোনাথন হাতামিও মনে করেন, মামলার কেন্দ্রবিন্দু লিন্ডসে ক্ল্যান্সির আচরণ ও মানসিক অবস্থা হয়ে উঠেছে, অথচ নিহত শিশুদের জীবন ও তাঁদের সঙ্গে কী ঘটেছিল, সেটিই মূল বিষয় হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, মামলাটি আসামিকে ঘিরে একটি প্রদর্শনীতে পরিণত হওয়া উচিত নয়। বরং আসামি কী করেছেন এবং সেই কর্মকাণ্ডে যেসব শিশু প্রাণ হারিয়েছে, তাঁদের নিয়েই মূল আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
হাতামির মতে, বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশে নিহত শিশুদের কথা যেন হারিয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, এই শিশুরাও গুরুত্বপূর্ণ এবং তাঁদের মৃত্যু বাস্তব।
মানসিক বিকার নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত
বিচারে উভয় পক্ষের বিশেষজ্ঞ সাক্ষীরা লিন্ডসের মানসিক অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত মত দিয়েছেন। বিশেষ করে তিনি হত্যাকাণ্ডের সময় মানসিক বিকারের মধ্যে ছিলেন কি না, সেটিই হয়ে উঠেছে মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ফরেনসিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ফিলিপ রেজনিক বলেন, হত্যাকাণ্ডের দিন দিনের বড় একটি সময় লিন্ডসে স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিলেন। এমনকি সন্তানদের সঙ্গে তুষারের মানুষও বানিয়েছিলেন। পরে তিনি এমন এক ধরনের ভ্রম ও অনুভূতির মধ্যে পড়েন বলে বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা, যেখানে তাঁর মনে হচ্ছিল তাঁর শরীর তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই এবং তিনি যেন অন্য কারও নিয়ন্ত্রিত পুতুলে পরিণত হয়েছেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষজ্ঞ শিশু ও ফরেনসিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আভ্রাম ম্যাক বলেন, সেদিন লিন্ডসের কর্মকাণ্ড ছিল পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল। তাঁর মতে, সন্তানদের মৃত্যুর জন্য লিন্ডসেকে অপরাধমূলকভাবে দায়ী করা উচিত।
ম্যাকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অপরাধমূলক দায়বদ্ধতার সক্ষমতা লিন্ডসের ছিল।
মানসিক কারণে দায়মুক্তি হলেও মুক্তি নয়
মামলায় লিন্ডসে যদি মানসিক অসুস্থতার কারণে দোষী নন বলে রায় পান, তবুও এর অর্থ সরাসরি মুক্তি নয়। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে রাখা হতে পারে এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর তাঁর অবস্থা পর্যালোচনা করা হবে।
এদিকে মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শুরু হতে পারে সোমবার বা মঙ্গলবার। এরপর বিচারক মণ্ডলী রায় দেওয়ার জন্য আলোচনা শুরু করবেন।
তবে বিচারপ্রক্রিয়া যতই শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, মামলাটিকে ঘিরে একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—লিন্ডসের মানসিক অবস্থা, তাঁর প্রতি জনসমর্থন এবং আদালতের নাটকীয়তার বাইরে কোরাহ, ডসন ও ক্যালানের জন্য আলোচনায় কতটা জায়গা থাকবে?
তিনটি শিশুর মৃত্যু যে এই মামলার কেন্দ্রীয় সত্য, সেই বিষয়টি যেন আলোচনার ভিড়ে হারিয়ে না যায়—এমনই দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
লিন্ডসে ক্ল্যান্সি হত্যা মামলা, তিন শিশুর মৃত্যু, প্রসব-পরবর্তী মানসিক বিকার ও মায়ের প্রতি জনসমর্থন নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















