চীনের সাবেক নেতা মাও সেতুংকে ব্যঙ্গ করে ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য পরিচিত শিল্পী গাও ঝেনকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির একটি আদালত। ‘জাতীয় বীর ও শহীদদের সম্মানহানি’ করার অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আটক হওয়ার প্রায় দুই বছর পর মঙ্গলবার তার সাজা ঘোষণা করা হয়।
সত্তর বছর বয়সী গাও চীনা নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা। ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট স্ত্রী ও ছেলের সঙ্গে চীনে যাওয়ার পর তাকে আটক করা হয়। পরে বেইজিংয়ের কাছে তার শিল্পকর্মের স্টুডিওতে অভিযান চালায় পুলিশ।
মাওকে ঘিরে বিতর্কিত শিল্পকর্ম
গাও ঝেনের সবচেয়ে আলোচিত শিল্পকর্মগুলোর একটি হলো মাও সেতুংকে হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থায় দেখানো ভাস্কর্য। আরেকটি কাজে সাতটি মাওয়ের মূর্তিকে রাইফেল হাতে একটি ফায়ারিং স্কোয়াডের সদস্য হিসেবে দেখানো হয়েছে, যাদের লক্ষ্য হিসেবে যিশুর প্রতিকৃতি রয়েছে।
তার পরিবারের ভাষ্য, এসব শিল্পকর্মের বেশির ভাগই তৈরি হয়েছিল এক দশকেরও বেশি সময় আগে। অথচ যে আইনের আওতায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, সেটি কার্যকর হয় ২০১৮ সালের মার্চে। চীনের আদালত অতীতে এই আইন ব্যবহার করে দেশটির ইতিহাসের সরকারি বয়ান নিয়ে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছে।

দুই বছর ধরে আটক, পরিবারেরও দুর্ভোগ
গাওয়ের স্ত্রী ঝাও ইয়ালিয়াং জানিয়েছেন, স্বামীর আটকের পর গত দুই বছর তাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর সময় কেটেছে। রায়ের পর তিনি বলেন, স্বামীকে গ্রেপ্তার ও বিচার করার ঘটনাই কখনো ঘটার কথা ছিল না।
রায় ঘোষণার সময় গাওয়ের দুই আত্মীয়কে হেবেই প্রদেশের সানহে শহরের আদালতকক্ষে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও স্ত্রী, ছেলে ও কয়েকজন বন্ধু আদালতের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন।
পরিবারের দাবি, আটক অবস্থায় গাও একবার জ্ঞান হারিয়েছিলেন। তিনি পিঠ, হাঁটু ও শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছিলেন। গ্রীষ্মকালে তার তাপজনিত অসুস্থতাও হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তার স্ত্রী। এমনকি এক পর্যায়ে তিনি মৃত্যুর খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন বলেও অনুভব করেছিলেন।
কারাগারেও থামেনি শিল্পচর্চা
আটক অবস্থায়ও গাও শিল্পচর্চা চালিয়ে গেছেন। তার তৈরি কিছু রঙিন কাগজ কাটার শিল্পকর্ম পরে প্রকাশ্যে আসে।
তার ছোট ভাই গাও চিয়াং, যিনি দীর্ঘদিন তার সঙ্গে শিল্পচর্চা করেছেন, বলেন—শরীরকে বন্দি রাখা সম্ভব হলেও মানুষের চিন্তার স্বচ্ছতা কেড়ে নেওয়া কঠিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মানসিকভাবে গাও এখনো দৃঢ় ও সজাগ রয়েছেন।
এক চিঠিতে নিজের ছোট ছেলেকে গাও লিখেছিলেন, চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো না থাকায় এবং চশমা কাছে না থাকায় তার হাতের লেখা ভালো হচ্ছে না। তিনি দ্রুত নিজের কাজ শেষ করে ছেলে ও মায়ের কাছে ফিরে আসার আশাও প্রকাশ করেন।

শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
মানবাধিকারকর্মীরা গাওয়ের সাজাকে চীনে স্বাধীন শিল্পচর্চার ওপর চাপের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, যে শিল্পকর্ম তৈরির সময় সেটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার আইনই ছিল না, সেই কাজের জন্য পরে আইন প্রয়োগ করা ন্যায়বিচারের মৌলিক প্রশ্ন তৈরি করে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের চীনবিষয়ক পরিচালক সারাহ ব্রুকসের মতে, গাওকে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে স্বাধীন শিল্পীসত্তার প্রকাশ থেকে অন্যদের বিরত রাখার কর্তৃপক্ষের মনোভাব স্পষ্ট হয়েছে।
গাওয়ের স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে এখনও চীন ছাড়তে পারেননি। মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তার স্ত্রীকে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। ছেলেটি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হলেও বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতে না পারায় সেও দেশ ছাড়তে পারছে না।
এই ঘটনা চীনে শিল্প, ইতিহাস ও রাজনৈতিক সমালোচনার সীমারেখা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে কয়েক দশক আগের শিল্পকর্মকে পরবর্তী সময়ে প্রণীত আইনের আওতায় এনে শিল্পীকে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
মাও সেতুংকে ঘিরে চীনের সরকারি ইতিহাস ও ব্যক্তিগত শিল্পীসত্তার সংঘাত যে এখনো কতটা সংবেদনশীল, গাও ঝেনের মামলাটি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















