ব্রিটেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এ৬৬ মহাসড়কে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত হওয়ার ঘটনায় সংঘবদ্ধ অপরাধের যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুই পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছেন।
ভয়াবহ সংঘর্ষে প্রাণ গেল সাতজনের
শনিবার ভোরে মিডলসব্রোর কাছে এ৬৬ মহাসড়কে দুর্ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ একটি গাড়িকে অনুসরণ করছিল। পরে ওই গাড়িটি মহাসড়কের ভুল পাশ দিয়ে চলতে শুরু করে এবং বিপরীত দিক থেকে আসা একটি পুলিশের গাড়ির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষে পুলিশের গাড়িতে থাকা দুই কর্মকর্তা টম ক্লাফ ও ম্যাথিউ ব্লেডস নিহত হন। তাঁদের বয়স ছিল যথাক্রমে ৩৮ ও ৩৭ বছর।
এ ছাড়া যে গাড়িটি ভুল পথে চলছিল, সেই গাড়িতে থাকা পাঁচ তরুণও মারা যান। তাঁরা হলেন মাইকেল রবার্ট কাহিল, জ্যাকব মাতুসিয়াক, মাকাই স্যাডিংটন, থিও রে এবং ১৭ বছর বয়সী কোল রবার্ট ওয়ার্থি।
সংঘবদ্ধ অপরাধের সন্দেহ
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার আগে দুটি গাড়িকে বিপজ্জনকভাবে চলাচল করতে দেখা গিয়েছিল। এর মধ্যে একটি গাড়ি মিডলসব্রো এলাকায় কয়েকটি স্থাপনায় ধাক্কা দিচ্ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। পরে ওই গাড়িটি উদ্ধার করা হয়েছে।
অন্য গাড়িটি, অর্থাৎ দুর্ঘটনায় জড়িত গাড়িটি, ওই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ। দুটি গাড়িতেই ভুয়া নম্বরপ্লেট ব্যবহার করা হয়েছিল। স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে গাড়ি দুটির গতিবিধি পুলিশের নজরে আসে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় নিহত পাঁচ তরুণের মধ্যে চারজনের আগের অপরাধের রেকর্ড ছিল।
১৯ থেকে ৬১ বছর বয়সী ১২ জন গ্রেপ্তার
দুর্ঘটনার তদন্তের অংশ হিসেবে টিসাইড এলাকায় ১৯ থেকে ৬১ বছর বয়সী নয়জন পুরুষ ও তিনজন নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র রাখা, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ এবং অন্যান্য অভিযোগ আনা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন এখনো পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। একজনকে মাদক সরবরাহের উদ্দেশ্যে মাদক রাখার অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং তাঁকে পরবর্তী আদালত শুনানি পর্যন্ত হেফাজতে রাখা হয়েছে।
আরেকজনের বিরুদ্ধে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজনকে শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। একজনকে কোনো শর্ত ছাড়াই জামিন দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, আগ্নেয়াস্ত্রের অনুমতিপত্র ছাড়া অস্ত্র রাখা এবং বিভিন্ন শ্রেণির মাদক রাখার অভিযোগেও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের অনুসরণ নিয়ে আলাদা তদন্ত
দুর্ঘটনার আগে পুলিশ প্রায় সাত মিনিট ধরে ওই গাড়িটিকে অনুসরণ করেছিল। পরে গাড়িটি এ৬৬ মহাসড়কে ভুল পথে চলে গেলে পুলিশ অনুসরণ বন্ধ করে দেয়।
এর প্রায় ১০ সেকেন্ড পর স্থানীয় সময় রাত ৩টা ৩৯ মিনিটে গাড়িটি পুলিশ কর্মকর্তা টম ক্লাফ ও ম্যাথিউ ব্লেডসের গাড়িতে আঘাত করে। ওই দুই কর্মকর্তা তখন মহাসড়কের সঠিক পাশ দিয়ে চলছিলেন এবং সন্দেহভাজন গাড়িটির সন্ধানে সহায়তা করছিলেন।
পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের পর কারও মৃত্যু হলে নিয়ম অনুযায়ী স্বাধীন পুলিশ অভিযোগ তদন্ত সংস্থা ঘটনাটি তদন্ত করে। এই দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও সংস্থাটি পৃথক তদন্ত শুরু করেছে।
পুলিশ বলছে, ঘটনা ছিল জটিল
ক্লিভল্যান্ড পুলিশের সহকারী প্রধান কর্মকর্তা ওয়েন ফক্স জানিয়েছেন, তদন্ত দ্রুত এগিয়ে চলছে এবং বিষয়টি অত্যন্ত জটিল।
তিনি বলেন, ওই রাতের মর্মান্তিক ঘটনা ক্লিভল্যান্ড ও স্থানীয় জনগণের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে। গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দুর্ঘটনার যে সম্পর্ক রয়েছে, তা পুরোপুরি তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা পুলিশের দায়িত্ব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও নিয়েও প্রশ্ন
দুর্ঘটনায় নিহত মাকাই স্যাডিংটনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাবে আগে বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানোর ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
এ ধরনের বিপজ্জনক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত বা উদ্যাপন করে এমন ভিডিও সরিয়ে নিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সরকার।
তবে পুলিশ বলেছে, শুক্রবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত সংঘটিত কর্মকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার উদ্দেশ্যেই ধারণ করা হয়েছিল—এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘিরে শোক
নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘিরে তাঁদের পরিবার, সহকর্মী ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে।

ম্যাথিউ ব্লেডসের স্ত্রী জানিয়েছেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্যদের নিরাপত্তা ও সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন তাঁর স্বামী। পুলিশে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ডার্লিংটনের একটি কলেজে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক ছিলেন।
তাঁর সাবেক সহকর্মীরা তাঁকে বুদ্ধিমান, সদয় ও সহজে মানুষের সঙ্গে মিশতে পারতেন এমন একজন শিক্ষক হিসেবে স্মরণ করেছেন।
অন্যদিকে সাবেক সেনাসদস্য টম ক্লাফের পরিবার তাঁকে তাঁদের ‘নায়ক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। পরিবারের ভাষ্য, প্রয়োজনের সময় তিনি সবসময় দ্রুত এগিয়ে যেতেন এবং যে কোনো মানুষকে সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকতেন।
নিহতদের স্মরণে শ্রদ্ধা
দুই পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের জন্য একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। সেখানে এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে। ক্লিভল্যান্ড পুলিশের সদর দপ্তরে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।
দুর্ঘটনাস্থলেও মানুষ ফুল, খেলনা পুলিশের গাড়ি ও হাতে লেখা বার্তা রেখে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।
অন্যদিকে দুর্ঘটনায় নিহত পাঁচ তরুণের বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতজনেরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করছেন। তাঁদের স্মরণে বেলুন উড়িয়ে শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজনও করা হয়েছে।
এ দুর্ঘটনা শুধু সাতটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং বিপজ্জনক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, সড়ক নিরাপত্তা এবং পুলিশের অনুসরণ পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তদন্ত এগিয়ে গেলে দুর্ঘটনার আগে ঠিক কী ঘটেছিল এবং এর পেছনে কারা জড়িত ছিল, সে বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
মিডলসব্রোর কাছে এ৬৬ মহাসড়কের এই মর্মান্তিক ঘটনা এখন স্থানীয় মানুষের কাছে গভীর শোকের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















