যুক্তরাষ্ট্রে তিন সন্তান হত্যার মামলায় লিন্ডসে ক্ল্যান্সির মানসিক অবস্থা নিয়ে বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন এক ফরেনসিক মনোবিজ্ঞানী। তাঁর দাবি, সন্তানদের হত্যার সময় ক্ল্যান্সি তীব্র মানসিক বিকারে আক্রান্ত ছিলেন না। বরং তিনি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সন্তানদের একা রেখে যেতে চাননি বলেই তাদের হত্যা করেছিলেন।
‘কণ্ঠস্বর শোনার’ দাবি নিয়ে প্রশ্ন
ফরেনসিক মনোবিজ্ঞানী কার্ক হেইলব্রুন আদালতে বলেন, ক্ল্যান্সি দাবি করেছিলেন, একটি অচেনা কণ্ঠস্বর তাঁকে সন্তানদের হত্যা করে পরে নিজেকেও হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু হেইলব্রুন সেই বক্তব্য বিশ্বাস করেননি।
তাঁর মতে, ক্ল্যান্সি যে ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, তা ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক। তিনি জানান, ওই কণ্ঠস্বর ক্ল্যান্সি আগে কখনো শোনেননি এবং হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৮ মিনিট সময়েই শুধু এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। এরপর আর কখনো একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়নি।
হেইলব্রুনের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন নির্দিষ্ট ও স্বল্পস্থায়ী অভিজ্ঞতাকে সন্তান হত্যার সময় তীব্র মানসিক বিকারের কারণে সৃষ্ট নির্দেশমূলক ভ্রম হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন।
সন্তানদের একা রেখে যেতে চাননি ক্ল্যান্সি
হেইলব্রুনের মূল্যায়ন হলো, ক্ল্যান্সি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানদের পৃথিবীতে একা রেখে যাওয়ার বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারেননি। এ কারণেই সন্তানদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন বলে মনোবিজ্ঞানী মনে করেন।
আদালতে তিনি জানান, সন্তানদের শ্বাসরোধ করার সময় ক্ল্যান্সি প্রত্যেককে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বরের কাছে যাও, সোনা।’ হেইলব্রুনের ব্যাখ্যায়, ক্ল্যান্সি বিশ্বাস করছিলেন তিনি ও তাঁর সন্তানরা মৃত্যুর পর ঈশ্বরের সঙ্গে স্বর্গে একসঙ্গে থাকবেন।
তবে ক্ল্যান্সির ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রসঙ্গ আদালতে আসার পর তাঁর আইনজীবী বিচার বাতিলের আবেদন করেন। বিচারক সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেও পরে বিচারকদের নির্দেশ দেন, আসামির বেড়ে ওঠার ধর্ম সম্পর্কে ওই বক্তব্যকে বিবেচনায় না নিতে।
মানসিক অসুস্থতা ছিল, কিন্তু মানসিক বিকার নয়—অভিযোগপক্ষ
মামলার অন্যতম প্রধান প্রশ্ন হলো, হত্যার সময় ক্ল্যান্সি নিজের কাজের সঠিকতা বোঝার মতো মানসিক সক্ষমতা রাখতেন কি না।
অভিযোগপক্ষের আরেক বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসক অ্যাভরাম ম্যাক শুক্রবার আদালতে বলেন, হত্যাকাণ্ডের আগে ক্ল্যান্সির মধ্যে উন্মত্ততা বা তীব্র উন্মত্ততার পর্যায়ের কোনো প্রমাণ তিনি পাননি। একইভাবে মানসিক বিকারেরও প্রমাণ মেলেনি।
তাঁর মতে, ক্ল্যান্সি গুরুতর মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেটি ছিল কয়েক মাস ধরে চলা বিষণ্নতার ধারাবাহিকতা। একই সঙ্গে তিনি নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল তা বুঝতে সক্ষম ছিলেন।

তবে হেইলব্রুনের মূল্যায়নে ক্ল্যান্সির দ্বিতীয় ধরনের দ্বিমেরু মানসিক ব্যাধি ছিল। এ ধরনের ব্যাধিতে বিষণ্নতার পাশাপাশি তুলনামূলক কম তীব্র উচ্ছ্বসিত মানসিক অবস্থার পর্যায় দেখা দিতে পারে। বিভিন্ন নথিতে একাধিক রোগ নির্ণয় ও নানা ধরনের উপসর্গ থাকায় ক্ল্যান্সির প্রকৃত মানসিক অবস্থা নির্ণয় করা কঠিন ছিল বলেও তিনি জানান।
প্রতিরক্ষার দাবি, তিনি সন্তান হত্যার সময় ‘সম্পূর্ণ মানসিক বিকারে’ ছিলেন
ক্ল্যান্সির আইনজীবীরা অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের দাবি, সন্তান হত্যার সময় ক্ল্যান্সি প্রসব-পরবর্তী তীব্র মানসিক বিকারে আক্রান্ত ছিলেন। সন্তান জন্মের পর হরমোনের পরিবর্তন, ঘুমের ঘাটতি ও প্রচণ্ড মানসিক চাপের সঙ্গে এই বিরল রোগের সম্পর্ক রয়েছে।
প্রতিরক্ষার বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসক ফিলিপ রেসনিক আদালতে বলেন, হত্যার দিন ক্ল্যান্সি স্পষ্টতই মানসিক বিকারে আক্রান্ত ছিলেন এবং নিজের কাজের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তাঁর বর্ণনায়, ক্ল্যান্সিকে যেন এমন এক পুতুলের মতো মনে হচ্ছিল, যার সুতো অন্য কেউ টানছে।
প্রতিরক্ষার আরেক মনোবিজ্ঞানী পল জাইজেলও বলেন, ক্ল্যান্সি তাঁর কাজের অন্যায় বা অপরাধমূলক চরিত্র উপলব্ধি করতে সক্ষম ছিলেন না।
পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ
অভিযোগপক্ষের দাবি, সাবেক প্রসব ও সন্তান জন্মদানের নার্স ক্ল্যান্সি আগে থেকেই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছিলেন। স্বামীকে বাড়ির বাইরে পাঠাতে তিনি তাঁদের এক সন্তানের ওষুধ এবং পরিবারের রাতের খাবার আনতে তাঁকে বাইরে যেতে বলেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ক্ল্যান্সির তিন সন্তান—ক্যালান, ডসন ও কোরা—হত্যার শিকার হয়। তাদের বয়স ছিল আট মাস থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে।
৩৬ বছর বয়সী ক্ল্যান্সি হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তবে সন্তানদের হত্যার ঘটনা যে ঘটেছে, তা তাঁর প্রতিরক্ষা পক্ষ অস্বীকার করছে না। তাদের মূল বক্তব্য হলো, গুরুতর মানসিক অসুস্থতার কারণে ওই সময় তাঁর অপরাধের জন্য আইনগতভাবে দায়ী করা উচিত নয়।
সন্তানদের হত্যার পর ক্ল্যান্সি দোতলার জানালা দিয়ে লাফ দেন। এতে কোমরের নিচ থেকে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। মামলার সমাপনী যুক্তিতর্ক চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে হওয়ার কথা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















