গ্রিসের নীল সমুদ্র, রোদঝলমলে দ্বীপ, ছোট ক্যাফেতে ধীরেসুস্থে কফি পান আর দীর্ঘ সময় ধরে রাতের খাবার—সব মিলিয়ে দেশটিকে অনেকের কাছেই মনে হতে পারে শান্ত ও নিশ্চিন্ত জীবনের আদর্শ ঠিকানা। কিন্তু বেড়াতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আর সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করার অভিজ্ঞতা যে এক নয়, সেটিই বুঝেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের বাসিন্দা ক্যাথলিন ও’ডনেল।
২০২২ সালে গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে বসবাস শুরু করেন তিনি। পরে সেখানে একটি অ্যাপার্টমেন্টও কিনেছেন। গ্রিসের জীবন তিনি ভালোবাসেন ঠিকই, তবে চার বছরের অভিজ্ঞতায় বুঝেছেন, ভূমধ্যসাগরীয় ধীরগতির জীবনের যে রোমান্টিক ছবি পর্যটকদের চোখে ধরা দেয়, বাস্তব জীবন তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
আগস্ট এলেই অনেক কিছু থেমে যায়

এথেন্সের যে এলাকায় ক্যাথলিন থাকেন, সেখানে আগস্টের শুরুতেই অনেক দোকান, ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। কারণ এই সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ ছুটি কাটাতে দ্বীপ ও গ্রামের দিকে চলে যান।
একসঙ্গে এত মানুষ ছুটিতে যাওয়ার কারণে দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়ে। সরকারি ও প্রশাসনিক কাজ অনেক আগে থেকে সেরে রাখতে হয়। বাজার করার সময়ও পরিকল্পনা করে নিতে হয়। গ্রীষ্মকালীন কম পরিবহনসূচির কারণে গণপরিবহনের জন্য অপেক্ষার সময়ও বেড়ে যায়।
তবে এই ধীরগতির জীবন সবার জন্য সমান নয়। পর্যটননির্ভর খাতে কর্মরত অনেক মানুষকে গ্রীষ্মের ব্যস্ত মৌসুমে দিনে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। ফলে কারও জন্য আগস্ট দীর্ঘ বিশ্রামের সময় হলেও, অন্য কারও জন্য এটি বছরের সবচেয়ে কঠিন কর্মব্যস্ত সময়।
ছুটির দিন মানেই সবকিছু বন্ধ
গ্রিসে রবিবারের চিত্রও ক্যাথলিনের কাছে একেবারেই আলাদা। তার এলাকায় বেশির ভাগ বিপণিবিতান, দোকান এমনকি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও রবিবার বন্ধ থাকে। শনিবারেও অনেক ছোট দোকান আগেভাগেই বন্ধ হয়ে যায়।
কাজের দীর্ঘ সপ্তাহের পর প্রয়োজনীয় সব কেনাকাটা বা অন্যান্য কাজ সেরে নেওয়ার জন্য তাই আগে থেকেই পরিকল্পনা করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় রবিবার সকালে সহজেই বাজার বা অন্য প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নেওয়া যেত। গ্রিসে সেই সুবিধাটি নেই।
তবু বিষয়টির একটি ভালো দিকও আছে। প্রায় সবাই যখন একই দিনে ছুটি পান, তখন রবিবার হয়ে ওঠে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর দিন। কাজের ব্যস্ততার বদলে বিশ্রাম, আড্ডা কিংবা একসঙ্গে সময় কাটানোই হয়ে ওঠে দিনের মূল উদ্দেশ্য।

‘আগামীকাল’ মানেই যে আগামীকাল, তা নয়
গ্রিসে বসবাসের আরেকটি বড় সাংস্কৃতিক পার্থক্য ক্যাথলিন বুঝেছেন বাড়ি সংস্কার ও বিভিন্ন সেবা নেওয়ার সময়। কেউ যদি বলেন কাজটি ‘আগামীকাল’ হবে, সেটিকে নির্দিষ্ট সময়ের প্রতিশ্রুতি হিসেবে নেওয়া ঠিক নয়।
আগামীকাল বলতে কখনো পরদিন বোঝানো হয়, আবার কখনো কয়েক দিন, এক সপ্তাহ কিংবা আরও পরে। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে সময় বদলে যেতে পারে।
এই নমনীয়তা কখনো আনন্দদায়ক হলেও অপেক্ষারত মানুষের জন্য তা বেশ বিরক্তিকর হতে পারে। নতুন অ্যাপার্টমেন্টে আলো ঠিক করার জন্য বিদ্যুৎকর্মীর অপেক্ষায় কয়েক দিন কাটানো তার জন্য এমনই এক অভিজ্ঞতা।
বোস্টনে যেখানে ‘আগামীকাল’ সাধারণত পরদিনকেই বোঝাত, গ্রিসে এসে সময় সম্পর্কে এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাকে বেশ সময় লেগেছে।
তবু ধীরগতির জীবনেই রয়েছে অন্যরকম আনন্দ

সব অসুবিধা সত্ত্বেও গ্রিসের জীবনকে তিনি ভালোবাসেন। এখানকার মানুষের সঙ্গে হঠাৎ করেই একই দিনে কফি খাওয়ার পরিকল্পনা করা যায়। এক মাস আগে সময় ঠিক করে রাখার প্রয়োজন হয় না।
উষ্ণ গ্রীষ্মের রাতে চার ঘণ্টা ধরে ধীরে ধীরে রাতের খাবার খাওয়ার অভিজ্ঞতাও তার কাছে বিশেষ আনন্দের। রেস্তোরাঁর কর্মীরা তাড়াহুড়ো করে টেবিল ছাড়তে বলেন না। আবার রবিবারের পুরোটা সময় সমুদ্রসৈকতে বসে বই পড়েও কাটিয়ে দেওয়া যায়।
ক্যাথলিনের উপলব্ধি হলো, ভূমধ্যসাগরীয় ধীরগতির জীবনের যে স্বপ্ন পর্যটকের চোখে অসাধারণ মনে হয়, সেটি বাস্তব জীবনে পুরোপুরি তেমন নয়। ছুটির দিনে যে বিষয়টি স্বর্গীয় মনে হয়, প্রতিদিনের জীবন গড়ার সময় সেটিই আবার অসুবিধার কারণ হতে পারে।
তবু তার কাছে গ্রিসে থাকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো জীবনের গতি। সবকিছু দ্রুত করার চাপ কম, মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য সময় বেশি এবং দৈনন্দিন জীবনে অবসরকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই বাস্তবতার নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও গ্রিসে নিজের জীবন নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট।
গ্রিসে বসবাসের অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত তাকে একটি সহজ সত্যই শিখিয়েছে—ভ্রমণের সময় যে জীবনকে নিখুঁত মনে হয়, সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করলে তার ভালো-মন্দ দুটো দিকই দেখতে হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















