নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ রয়েছেন ৮২৬ জন। নিখোঁজদের মধ্যে পাঁচ শতাধিক পর্যটক রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, অব্যাহত বৃষ্টি ও কাদামাটিতে রাস্তা ঢেকে যাওয়ায় উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নিখোঁজের সংখ্যা ৮২৬, পর্যটকই ৫২৯-এর বেশি
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাবে, ভোতেকোশি-ত্রিশূলী নদীর ভয়াবহ বন্যার পর ৮২৬ জনের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের মধ্যে নিরাপত্তাকর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটক রয়েছেন।
নিখোঁজ পর্যটকের সংখ্যা ৫২৯-এর বেশি। তাঁদের মধ্যে ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। সীমান্তবর্তী রাস্তা ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে থাকা বহু বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।

টানেলে আটকে থাকা সাতজনকে জীবিত উদ্ধার
উদ্ধার অভিযানে কিছুটা স্বস্তির খবরও এসেছে। নেপালি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, রাসুয়া জেলার হাকু এলাকায় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে থাকা সাতজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আরও তিনটি টানেলে আটকে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারে অভিযান চলছে।
সেনাবাহিনীর হিসাবে, রাসুয়ার তিমুরে এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত ৯৫ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ২১ জন ভারতীয় পর্যটকও রয়েছেন, যাঁদের সঙ্গে আগের দিন থেকে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না।
নেপালি সেনাবাহিনী স্থল ও আকাশপথে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে প্রায় দুই হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া ও নুওয়াকোট এলাকায় তাদের বড় একটি অংশ কাজ করছে।
তীর্থযাত্রীদের একটি দলের ৪৭ জন নিখোঁজ
বন্যার কবলে পড়া একটি পর্যটন প্রতিষ্ঠানের ৪৭ সদস্যের একটি দলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। দলটিতে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নেপাল, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও রুশ-মার্কিন দ্বৈত নাগরিকত্বধারী একজন ছিলেন।

তাঁরা কৈলাস পর্বত ও মানসসরোবর হ্রদে তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন। বুধবার তিব্বতে প্রবেশের কথা ছিল তাঁদের। সীমান্তের নেপাল অংশে থাকা কয়েকজনের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আরেকটি পর্যটন প্রতিষ্ঠানের ২৭ জন পর্যটক ও চার কর্মীও নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক রয়েছেন।
অন্তত ১৩৩ ভারতীয় নিখোঁজ
নেপালের ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ১৩৩ ভারতীয় নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের অনেকেই কৈলাস পর্বতকে কেন্দ্র করে আয়োজিত তীর্থযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন।
হিমালয়ের উচ্চভূমিতে অবস্থিত কৈলাস পর্বত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। করোনাভাইরাস মহামারি এবং পরবর্তী সময়ে ভারত-চীন উত্তেজনার কারণে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি এই তীর্থযাত্রা আবার শুরু হয়েছিল।
তিব্বতেও নিখোঁজের সংখ্যা বেড়েছে
চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং জেলায় ভয়াবহ কাদাধসের ঘটনায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৮ হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানানো হয়েছে। সেখানে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
গিরং সীমান্ত চীন ও নেপালের মধ্যে পর্যটক ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ। পাহাড়ি সড়ক কাদা ও ধ্বংসস্তূপে ঢেকে যাওয়ায় উদ্ধারকারী দল এবং ভারী যন্ত্রপাতি দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছে।

ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসেই বিপর্যয়ের সূত্রপাত
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে এই আকস্মিক বন্যা ও ধসের সৃষ্টি হয়েছে। তবে পরবর্তী বিশ্লেষণে সেই ধারণা বদলে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার বিশ্লেষণ বলছে, কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি। বরং হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও পলিমাটি নিচের দিকে নেমে এসে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করে।
বিজ্ঞানীরা এখনো ঘটনাগুলোর সঠিক ধারাবাহিকতা নির্ধারণের চেষ্টা করছেন। কোনো হিমবাহ হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে এসেছিল কি না, নদীর কোনো অংশ ধসে গিয়ে আটকে গিয়েছিল কি না এবং সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিপাত কতটা ভূমিকা রেখেছে—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সামনে আরও একটি বন্যার আশঙ্কা
পর্বতাঞ্চল থেকে বিপুল ধ্বংসাবশেষ নদীতে গিয়ে পড়ায় নতুন বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ত্রিশূলী নদীর সরু কোনো অংশে ধ্বংসাবশেষ জমে সাময়িক বাঁধ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
এমন বাঁধ ভেঙে গেলে আকস্মিকভাবে বিপুল পানি নিচের দিকে নেমে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। সম্ভাব্য বাধার অবস্থান, আকার ও স্থায়িত্ব নিয়ে এখন পর্যবেক্ষণ চলছে।

বৃষ্টিই বাড়াচ্ছে উদ্ধারকাজের জটিলতা
তিব্বতের দুর্গম এলাকায় কাদাধসের স্তর কোথাও প্রায় দেড় মিটার গভীর। সীমান্ত চৌকি থেকে ধ্বংসস্তূপের বিস্তৃতি প্রায় আড়াই কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে আগামী তিন দিনও ওই অঞ্চলে বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। পাহাড়ের সরু সড়ক দিয়ে ভারী যান ও উদ্ধার সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া কঠিন হওয়ায় প্রতিটি মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছাতে শুরু করেছে
দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সহায়তার হাত বাড়িয়েছে। নেপালে জরুরি আশ্রয়, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রীর জন্য যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, প্রায় আট টন ত্রাণসামগ্রী সেনাবাহিনীর আটটি ট্রাকে করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। এসব সামগ্রীর মধ্যে মশারি, কম্বল, সৌরবাতি, সৌর প্যানেল ও শোয়ার সরঞ্জাম রয়েছে।
জাতিসংঘও নেপাল ও চীনের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তা কার্যক্রম শুরু করেছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগে ধ্বংস হয়ে গেছে বহু বাড়িঘর, সড়ক ও সেতু। কোথাও পুরো বসতি কাদা ও পানির নিচে চলে গেছে। উদ্ধারকারীরা এখনো দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা মানুষদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। তবে নিখোঁজের বিপুল সংখ্যা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেপালের এই বিপর্যয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়েও বিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করছেন। হিমালয় অঞ্চলে দ্রুত হিমবাহ গলার প্রবণতা বাড়লেও এই নির্দিষ্ট দুর্যোগে জলবায়ু পরিবর্তন কতটা দায়ী, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
নেপালের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত পৌঁছে নিখোঁজদের উদ্ধার করা এবং সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার বন্যা ঠেকানো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















