০৩:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে পারমাণবিক ক্ষুদ্র চুল্লি, ব্যয় হবে ২২০ কোটি ডলার ইরানে ডলারের দাম ছাড়াল ২০ লাখ রিয়াল, চরম সংকটে সাধারণ মানুষের জীবন ডলারের স্থিতিশীলতা, জাপানি ইয়েনে বড় পরিবর্তন নেই—জ্যাকসন হোলের দিকে নজর বাজারের কিয়েভে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, শোনা গেল একের পর এক বিস্ফোরণ রাশিয়ার ওপর ‘স্লেজহ্যামার’ নিষেধাজ্ঞা, আগামী মাসে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে পাসের আশা কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আশায় ছিল গাড়ি নির্মাতারা, হঠাৎ দ্বিগুণ শুল্কের ধাক্কা এনভিডিয়ার আয় ৭০ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের জোয়ার আরও কয়েক বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কর্মী ছাঁটাইয়ের জাকারবার্গের বড় পরিকল্পনা যেভাবে ভেস্তে গেল ইরানের মুদ্রার ঐতিহাসিক পতন, এক ডলারে ২০ লাখ রিয়াল ছাড়াল চীনের মানবসদৃশ রোবট এখনো মানুষের চাকরি নেওয়ার মতো বুদ্ধিমান হয়নি

মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে প্রথমবার সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফলভাবে অপসারণ টিউমার

মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছে। প্রথমবারের মতো অস্ত্রোপচার চলাকালীন সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিয়ে এক রোগীর মস্তিষ্কের টিউমার সফলভাবে অপসারণ করেছেন চিকিৎসকেরা। এই প্রযুক্তি অস্ত্রোপচারের সময় মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও স্নায়ুর অবস্থান শনাক্ত করে চিকিৎসকদের নিরাপদ পথে টিউমার অপসারণে সহায়তা করেছে।

যুক্তরাজ্যের বেডফোর্ডশায়ারের বাসিন্দা ৪৮ বছর বয়সী রিস হিবার্ট এই যুগান্তকারী অস্ত্রোপচারের প্রথম রোগী। চিকিৎসকদের মতে, অস্ত্রোপচার না হলে ধীরে ধীরে তার দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা ছিল।

হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে ধরা পড়ে টিউমার

প্রায় দেড় বছর আগে পর্যন্ত হিবার্ট ছিলেন সম্পূর্ণ সুস্থ ও কর্মচঞ্চল। প্রতিদিন দুপুরে প্রায় তিন কিলোমিটার হাঁটতেন তিনি। কিন্তু একদিন হাঁটার সময় হঠাৎ রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে খিঁচুনি শুরু হয় তার।

পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা দেখতে পান, তার মস্তিষ্কের নিচের অংশে অবস্থিত পিটুইটারি গ্রন্থির ওপর প্রায় ১১ মিলিমিটার আকারের একটি অ-ক্যানসারযুক্ত টিউমার রয়েছে। মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ এই গ্রন্থি শরীরের বৃদ্ধি, বিপাকক্রিয়া, রক্তচাপ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা বিভিন্ন হরমোন নিঃসরণ করে।

সমস্যা ছিল, টিউমারটির অবস্থান ছিল মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ ধমনির পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী অপটিক স্নায়ুর খুব কাছে। সময়ের সঙ্গে টিউমারটি ওই স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করায় হিবার্টের পার্শ্বীয় দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে শুরু করে।

UCH Photo of Prof Hani Marcus and Mr Danyal Khan standing outside. Both have dark brown hair. One is wearing a white shirt and blue and white tie. The other is wearing a light coloured shirt and kaki blazer.

দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন হিবার্ট

অস্ত্রোপচার তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজন না হলেও হিবার্টের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তিনি প্রায়ই বিভিন্ন জিনিসে ধাক্কা খেতেন, মাথা ঘুরত এবং প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভব করতেন।

তবু স্বাভাবিক জীবন ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। দীর্ঘ ১৮ বছরের দাম্পত্য জীবনে প্রতিদিন সকালে স্ত্রীর জন্য কফি বানানো ছিল তার অভ্যাস। টিউমারের কারণে সেই স্বাভাবিক জীবন থেমে যাক, তা চাননি তিনি।

চিকিৎসকেরা যখন তাকে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সহায়তায় পরীক্ষামূলক অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেন, তখন তিনি রাজি হয়ে যান। তার যুক্তি ছিল, রোগীরা গবেষণায় অংশ না নিলে চিকিৎসকেরা নতুন কিছু শিখবেন কীভাবে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিই বা হবে কীভাবে।

অস্ত্রোপচারের সময়ই কাজ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

অস্ত্রোপচারে নাকের ভেতর দিয়ে একটি সরু ক্যামেরাযুক্ত যন্ত্র প্রবেশ করিয়ে মাথার খুলির নিচে থাকা টিউমারের কাছে পৌঁছানো হয়। কিন্তু টিউমারটি হাড় ও শক্ত আবরণের স্তরের আড়ালে থাকায় নিরাপদভাবে সেটি অপসারণের পথ নির্ধারণ করা ছিল বেশ কঠিন।

একেকজন মানুষের মস্তিষ্কের গঠন একেক রকম হওয়ায় অস্ত্রোপচারের আগে করা পরীক্ষার ছবির ওপর শুধু নির্ভর করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এমন অস্ত্রোপচারে পুরো টিউমার অপসারণ করা সম্ভব না হওয়ার আশঙ্কা ছিল ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ। বড় কোনো রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও ছিল শূন্য দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ।

এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

অস্ত্রোপচারের সময় একটি আলাদা পর্দায় সরাসরি ক্যামেরার ছবি বিশ্লেষণ করতে থাকে প্রযুক্তিটি। অস্ত্রোপচারের যন্ত্রগুলোর গতিবিধি অনুসরণ করার পাশাপাশি মস্তিষ্কের কোথায় গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও স্নায়ু থাকার সম্ভাবনা বেশি, তা চিহ্নিত করে দেখায় এটি।

ফলে চিকিৎসকেরা কোন অংশ দিয়ে টিউমার অপসারণ করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অতিরিক্ত তথ্য পান।

চিকিৎসকের জন্য ‘দ্বিতীয় বিশেষজ্ঞের চোখ’

এই প্রযুক্তিকে অনেকটা মোবাইল ফোনের মুখ শনাক্ত করার ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। তবে এখানে মানুষের মুখের বদলে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ ও অনেক সময় সরাসরি দেখা যায় না এমন শারীরিক গঠন শনাক্ত করা হয়েছে।

প্রযুক্তিটি তৈরি করতে শত শত পিটুইটারি টিউমার অপসারণের অস্ত্রোপচারের ভিডিও ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি ভিডিওতে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও স্নায়ুর অবস্থান আলাদাভাবে চিহ্নিত করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

চিকিৎসকদের মতে, এই ব্যবস্থাটি একজন সাধারণ শল্যচিকিৎসক জীবনে যত অস্ত্রোপচার দেখেন বা করেন, তার চেয়েও অনেক বেশি অস্ত্রোপচারের তথ্য থেকে শিখেছে। ফলে এটি প্রয়োজনে একজন অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞের চোখের মতো কাজ করতে পারে।

তবে চিকিৎসকেরা স্পষ্ট করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বে নেই। চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকদের হাতেই থাকে। প্রযুক্তির পরামর্শ গ্রহণ করবেন কি না, সেটিও চিকিৎসকেরাই ঠিক করেন।

ভবিষ্যতে চিকিৎসকের পাশে থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

গবেষক দলের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো শল্যচিকিৎসকদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা প্রয়োজনের সময় আরেকজন বিশেষজ্ঞের মতো পরামর্শ দিতে পারবে।

তবে চিকিৎসক যদি সেই পরামর্শের সঙ্গে একমত না হন, তাহলে তা উপেক্ষা করার পূর্ণ স্বাধীনতাও থাকবে। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসকের বিকল্প নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক একটি অতিরিক্ত ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।

বহু বছর ধরে পরীক্ষাগারে এই প্রযুক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পর এবার প্রথমবারের মতো বাস্তব অস্ত্রোপচারে এর ব্যবহার করা হলো। প্রাথমিক ফলাফল আশাব্যঞ্জক হওয়ায় গবেষকেরা আরও বড় পরিসরে এর কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

‘মনে হচ্ছে জীবনটা ফিরে পেয়েছি’

অস্ত্রোপচারের পর হিবার্টের শারীরিক অবস্থায় দ্রুত উন্নতি দেখা গেছে। জ্ঞান ফেরার পরই তিনি নিজের দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন টের পান।

তার ভাষায়, অস্ত্রোপচারের পর চোখ খুলে মনে হয়েছিল যেন চারপাশের সবকিছু অনেক বেশি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। প্রায় এক বছর ধরে যে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা তাকে ভুগিয়েছে, তা ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে।

অস্ত্রোপচারের পর আট সপ্তাহের মধ্যে তার দৃষ্টিশক্তি ক্রমেই ভালো হয়েছে। একই সঙ্গে ফিরে এসেছে আগের কর্মশক্তিও। অস্ত্রোপচারের আগে যে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা ছিল, সেগুলোও আর অনুভব করছেন না তিনি।

হিবার্টের কাছে এই অস্ত্রোপচার শুধু একটি চিকিৎসা নয়, বরং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ। তার ভাষায়, এটি যেন তাকে তার জীবনটাই ফিরিয়ে দিয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হলেও চিকিৎসকেরা একই সঙ্গে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। মস্তিষ্কের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গে এই প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করার আগে পর্যাপ্ত পরীক্ষা, নজরদারি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি ভবিষ্যতে অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকদের অদৃশ্য ঝুঁকি শনাক্ত করতে এবং আরও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে, তাহলে জটিল মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন রেখে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হয়ে উঠতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে পারমাণবিক ক্ষুদ্র চুল্লি, ব্যয় হবে ২২০ কোটি ডলার

মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে প্রথমবার সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফলভাবে অপসারণ টিউমার

০২:১৬:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬

মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছে। প্রথমবারের মতো অস্ত্রোপচার চলাকালীন সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিয়ে এক রোগীর মস্তিষ্কের টিউমার সফলভাবে অপসারণ করেছেন চিকিৎসকেরা। এই প্রযুক্তি অস্ত্রোপচারের সময় মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও স্নায়ুর অবস্থান শনাক্ত করে চিকিৎসকদের নিরাপদ পথে টিউমার অপসারণে সহায়তা করেছে।

যুক্তরাজ্যের বেডফোর্ডশায়ারের বাসিন্দা ৪৮ বছর বয়সী রিস হিবার্ট এই যুগান্তকারী অস্ত্রোপচারের প্রথম রোগী। চিকিৎসকদের মতে, অস্ত্রোপচার না হলে ধীরে ধীরে তার দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা ছিল।

হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে ধরা পড়ে টিউমার

প্রায় দেড় বছর আগে পর্যন্ত হিবার্ট ছিলেন সম্পূর্ণ সুস্থ ও কর্মচঞ্চল। প্রতিদিন দুপুরে প্রায় তিন কিলোমিটার হাঁটতেন তিনি। কিন্তু একদিন হাঁটার সময় হঠাৎ রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে খিঁচুনি শুরু হয় তার।

পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা দেখতে পান, তার মস্তিষ্কের নিচের অংশে অবস্থিত পিটুইটারি গ্রন্থির ওপর প্রায় ১১ মিলিমিটার আকারের একটি অ-ক্যানসারযুক্ত টিউমার রয়েছে। মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ এই গ্রন্থি শরীরের বৃদ্ধি, বিপাকক্রিয়া, রক্তচাপ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা বিভিন্ন হরমোন নিঃসরণ করে।

সমস্যা ছিল, টিউমারটির অবস্থান ছিল মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ ধমনির পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী অপটিক স্নায়ুর খুব কাছে। সময়ের সঙ্গে টিউমারটি ওই স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করায় হিবার্টের পার্শ্বীয় দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে শুরু করে।

UCH Photo of Prof Hani Marcus and Mr Danyal Khan standing outside. Both have dark brown hair. One is wearing a white shirt and blue and white tie. The other is wearing a light coloured shirt and kaki blazer.

দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন হিবার্ট

অস্ত্রোপচার তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজন না হলেও হিবার্টের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তিনি প্রায়ই বিভিন্ন জিনিসে ধাক্কা খেতেন, মাথা ঘুরত এবং প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভব করতেন।

তবু স্বাভাবিক জীবন ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। দীর্ঘ ১৮ বছরের দাম্পত্য জীবনে প্রতিদিন সকালে স্ত্রীর জন্য কফি বানানো ছিল তার অভ্যাস। টিউমারের কারণে সেই স্বাভাবিক জীবন থেমে যাক, তা চাননি তিনি।

চিকিৎসকেরা যখন তাকে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সহায়তায় পরীক্ষামূলক অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেন, তখন তিনি রাজি হয়ে যান। তার যুক্তি ছিল, রোগীরা গবেষণায় অংশ না নিলে চিকিৎসকেরা নতুন কিছু শিখবেন কীভাবে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিই বা হবে কীভাবে।

অস্ত্রোপচারের সময়ই কাজ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

অস্ত্রোপচারে নাকের ভেতর দিয়ে একটি সরু ক্যামেরাযুক্ত যন্ত্র প্রবেশ করিয়ে মাথার খুলির নিচে থাকা টিউমারের কাছে পৌঁছানো হয়। কিন্তু টিউমারটি হাড় ও শক্ত আবরণের স্তরের আড়ালে থাকায় নিরাপদভাবে সেটি অপসারণের পথ নির্ধারণ করা ছিল বেশ কঠিন।

একেকজন মানুষের মস্তিষ্কের গঠন একেক রকম হওয়ায় অস্ত্রোপচারের আগে করা পরীক্ষার ছবির ওপর শুধু নির্ভর করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এমন অস্ত্রোপচারে পুরো টিউমার অপসারণ করা সম্ভব না হওয়ার আশঙ্কা ছিল ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ। বড় কোনো রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও ছিল শূন্য দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ।

এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

অস্ত্রোপচারের সময় একটি আলাদা পর্দায় সরাসরি ক্যামেরার ছবি বিশ্লেষণ করতে থাকে প্রযুক্তিটি। অস্ত্রোপচারের যন্ত্রগুলোর গতিবিধি অনুসরণ করার পাশাপাশি মস্তিষ্কের কোথায় গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও স্নায়ু থাকার সম্ভাবনা বেশি, তা চিহ্নিত করে দেখায় এটি।

ফলে চিকিৎসকেরা কোন অংশ দিয়ে টিউমার অপসারণ করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অতিরিক্ত তথ্য পান।

চিকিৎসকের জন্য ‘দ্বিতীয় বিশেষজ্ঞের চোখ’

এই প্রযুক্তিকে অনেকটা মোবাইল ফোনের মুখ শনাক্ত করার ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। তবে এখানে মানুষের মুখের বদলে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ ও অনেক সময় সরাসরি দেখা যায় না এমন শারীরিক গঠন শনাক্ত করা হয়েছে।

প্রযুক্তিটি তৈরি করতে শত শত পিটুইটারি টিউমার অপসারণের অস্ত্রোপচারের ভিডিও ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি ভিডিওতে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও স্নায়ুর অবস্থান আলাদাভাবে চিহ্নিত করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

চিকিৎসকদের মতে, এই ব্যবস্থাটি একজন সাধারণ শল্যচিকিৎসক জীবনে যত অস্ত্রোপচার দেখেন বা করেন, তার চেয়েও অনেক বেশি অস্ত্রোপচারের তথ্য থেকে শিখেছে। ফলে এটি প্রয়োজনে একজন অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞের চোখের মতো কাজ করতে পারে।

তবে চিকিৎসকেরা স্পষ্ট করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বে নেই। চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকদের হাতেই থাকে। প্রযুক্তির পরামর্শ গ্রহণ করবেন কি না, সেটিও চিকিৎসকেরাই ঠিক করেন।

ভবিষ্যতে চিকিৎসকের পাশে থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

গবেষক দলের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো শল্যচিকিৎসকদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা প্রয়োজনের সময় আরেকজন বিশেষজ্ঞের মতো পরামর্শ দিতে পারবে।

তবে চিকিৎসক যদি সেই পরামর্শের সঙ্গে একমত না হন, তাহলে তা উপেক্ষা করার পূর্ণ স্বাধীনতাও থাকবে। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসকের বিকল্প নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক একটি অতিরিক্ত ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।

বহু বছর ধরে পরীক্ষাগারে এই প্রযুক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পর এবার প্রথমবারের মতো বাস্তব অস্ত্রোপচারে এর ব্যবহার করা হলো। প্রাথমিক ফলাফল আশাব্যঞ্জক হওয়ায় গবেষকেরা আরও বড় পরিসরে এর কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

‘মনে হচ্ছে জীবনটা ফিরে পেয়েছি’

অস্ত্রোপচারের পর হিবার্টের শারীরিক অবস্থায় দ্রুত উন্নতি দেখা গেছে। জ্ঞান ফেরার পরই তিনি নিজের দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন টের পান।

তার ভাষায়, অস্ত্রোপচারের পর চোখ খুলে মনে হয়েছিল যেন চারপাশের সবকিছু অনেক বেশি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। প্রায় এক বছর ধরে যে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা তাকে ভুগিয়েছে, তা ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে।

অস্ত্রোপচারের পর আট সপ্তাহের মধ্যে তার দৃষ্টিশক্তি ক্রমেই ভালো হয়েছে। একই সঙ্গে ফিরে এসেছে আগের কর্মশক্তিও। অস্ত্রোপচারের আগে যে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা ছিল, সেগুলোও আর অনুভব করছেন না তিনি।

হিবার্টের কাছে এই অস্ত্রোপচার শুধু একটি চিকিৎসা নয়, বরং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ। তার ভাষায়, এটি যেন তাকে তার জীবনটাই ফিরিয়ে দিয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হলেও চিকিৎসকেরা একই সঙ্গে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। মস্তিষ্কের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গে এই প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করার আগে পর্যাপ্ত পরীক্ষা, নজরদারি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি ভবিষ্যতে অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকদের অদৃশ্য ঝুঁকি শনাক্ত করতে এবং আরও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে, তাহলে জটিল মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন রেখে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হয়ে উঠতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।