মেয়ের প্রথম জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতে স্বামী, এক বছরের কাছাকাছি বয়সী সন্তান, দুই মা-বাবা এবং দুই পারিবারিক বন্ধুকে নিয়ে স্পেনের মালাগায় পাড়ি জমিয়েছিলেন এক পরিবার। মোট আটজনের এই বহুজাতিক প্রজন্মের পারিবারিক ভ্রমণের জন্য আগে থেকেই তৈরি করা হয়েছিল ব্যস্ত সূচি। কিন্তু বাস্তবে গিয়ে দেখা গেল, ছোট শিশুকে সঙ্গে নিয়ে সেই পরিকল্পনা অনুসরণ করা প্রায় অসম্ভব।
পরিবারটি এক সপ্তাহের জন্য চার শয়নকক্ষ ও তিনটি বাথরুমের একটি ভাড়া বাড়িতে উঠেছিল। পরিকল্পনায় ছিল কর্দোবা ও গ্রানাদায় দিনের ভ্রমণ, প্রতিদিন কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে জন্মদিন উদ্যাপন। কিন্তু শিশুর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পুরো সূচিই বদলে ফেলতে হয়।
শিশুর গতির সঙ্গে তাল মেলাতে হলো
ভ্রমণের আগে থেকেই পরিবারটি বুঝতে পেরেছিল যে ছোট শিশুকে নিয়ে ধীরগতিতে চলাই বেশি স্বস্তিদায়ক। এর আগে তারা ইউরোপে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করছিলেন এবং অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছিলেন, মাঝেমধ্যে ভাড়া বাড়িতে ফিরে শিশুকে খেলতে দেওয়া ও ঘুমের সুযোগ করে দিলে পুরো পরিবারই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে।
তাই মালাগায় যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে সবাইকে জানানো হয়, আগের পরিকল্পনা অনেকটাই সংক্ষিপ্ত করতে হবে। দিনের দীর্ঘ ভ্রমণ বাদ দেওয়া হয়, শিল্প জাদুঘরও পরিকল্পনা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিদিন তিন-চারটি জায়গা দেখার বদলে এক বা দুটি কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়।
তবে দলের অন্য সদস্যদের যে সবসময় শিশুর গতিতে চলতে হবে, এমন প্রত্যাশা ছিল না। বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের স্বাচ্ছন্দ্যই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যরা ঘুরতে গেলেও তাদের থাকতে হয়েছে বাড়িতে
পরিকল্পনা কমিয়ে আনা সহজ হলেও মানসিকভাবে বিষয়টি মেনে নেওয়া কঠিন ছিল। মালাগার অসংখ্য দর্শনীয় স্থান হাতের নাগালে থাকা সত্ত্বেও শিশুর ঘুমের সময় দেখাশোনার জন্য বাড়িতে থাকতে হচ্ছিল।
পরিবারের অন্য সদস্যরা যখন ছাদে বসে পানীয় উপভোগ করছিলেন কিংবা ষাঁড়ের লড়াইয়ের ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে যাচ্ছিলেন, তখন শিশুটির বাবা-মাকে ঘরে থেকেই তার দেখাশোনা করতে হয়েছে।
এতে কিছুটা হতাশাও তৈরি হয়। কারণ এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়া এবং নাতনির প্রথম জন্মদিন একসঙ্গে উদ্যাপন করা। কয়েক মাস ধরে পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার পর তারা আশা করেছিলেন, এই সফরে পারিবারিক সময়ই বেশি গুরুত্ব পাবে।
কিন্তু অনেক সময় দর্শনীয় স্থান ঘোরার পরিকল্পনাই যেন পারিবারিক সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছিল বলে মনে হয়েছে।
তবু জন্মদিনের সফর হয়ে উঠল স্মরণীয়
সব পরিকল্পনা বদলে গেলেও স্পেন সফর শেষ পর্যন্ত হতাশাজনক হয়নি। বরং ধীরগতির ভ্রমণ পরিবারটিকে অন্যভাবে সময় কাটানোর সুযোগ দিয়েছে।
তারা ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘুরে দেখেছেন, দুর্গে উঠেছেন, সমুদ্রসৈকতে সময় কাটিয়েছেন, পাবলো পিকাসোর জাদুঘর ঘুরেছেন এবং স্থানীয় নৃত্য-সংগীতের অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন। এমনকি এক রাতে দাদা-দাদিরা শিশুটির দেখাশোনা করায় বাবা-মাও কিছুটা রাতের সময় নিজেদের মতো করে কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন।
ভাড়া বাড়িটিও পারিবারিক সময় কাটানোর জন্য বেশ উপযোগী ছিল। শয়নকক্ষ তুলনামূলক ছোট হলেও বসার ঘর ছিল প্রশস্ত। ফলে সবাই একসঙ্গে বসতে, গল্প করতে এবং শিশুটির সঙ্গে খেলতে পারতেন।
ছোট মেয়েটিও অনেক মানুষের সঙ্গ পেয়ে আনন্দে ছিল। আর বড় খাবার টেবিলে সবাই মিলে খাওয়ার সময়গুলো হয়ে উঠেছিল ভ্রমণের অন্যতম আনন্দের অংশ।
স্থানীয় খাবারেও জমে উঠেছিল উদ্যাপন
স্পেনের স্থানীয় খাবারও পরিবারের এই সফরকে আরও আনন্দময় করে তুলেছিল। পায়েয়া, তাপাস এবং চুরোস—সবই পরিবারের সদস্যদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি সদ্য এক বছর পূর্ণ করা শিশুটিও খাবারের স্বাদ উপভোগ করেছে।
সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকে প্রতিদিন সকালে একসঙ্গে নাশতা করা, বাস্ক চিজকেকের চারপাশে বসে মেয়ের জন্মদিনের গান গাওয়া এবং বসার ঘরে একসঙ্গে লুকোচুরি ও দৌড়ঝাঁপের মতো খেলায় মেতে ওঠা।
ভ্রমণটি পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়নি। পরিবারের সবাই একসঙ্গে সব জায়গায় ঘুরতেও পারেনি। তবু শেষ পর্যন্ত সেই পরিবর্তিত পরিকল্পনাই তাদের এমন কিছু স্মৃতি দিয়েছে, যেগুলো হয়তো অনেক বেশি ব্যস্ত একটি ভ্রমণে তৈরি হতো না।
এক বছরের শিশুকে নিয়ে বড় পারিবারিক ভ্রমণের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল—সবকিছু দেখার চেয়ে একসঙ্গে থাকার মুহূর্তগুলো অনেক সময় বেশি মূল্যবান। এখন সেই পরিবারের সামনে নতুন প্রশ্ন, মেয়ের দ্বিতীয় জন্মদিনে এর চেয়েও সুন্দর আয়োজন কীভাবে করা যায়?
মেয়ের প্রথম জন্মদিন উপলক্ষে স্পেন ভ্রমণের এই অভিজ্ঞতা দেখায়, ছোট শিশুকে সঙ্গে নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে নিখুঁত সূচির চেয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা বদলানোর মানসিকতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















