ওজন কমানোর জন্য জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ ব্যবহার করছেন অনেক মানুষ। এসব ওষুধ ক্ষুধা কমিয়ে ওজন কমাতে কার্যকর হলেও এর সঙ্গে শরীরের পেশির পরিমাণ কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই ওজন কমানোর পাশাপাশি পেশি শক্তিশালী রাখতে নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত আমিষ ও সঠিক খাদ্যাভ্যাসকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
ওজন কমলেও কমতে পারে পেশি
জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ মূলত দ্বিতীয় ধরনের ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়েছিল। পরে ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও এগুলোর কার্যকারিতা দেখা যায়। তবে এসব ওষুধ ক্ষুধা কমিয়ে দেওয়ায় শুধু চর্বি নয়, শরীরের চর্বিবিহীন অংশের পরিমাণও কমতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ওজন কমার ১৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত চর্বিবিহীন পেশি হতে পারে। অর্থাৎ কেউ যদি প্রায় ২৩ কেজি ওজন কমান, তাহলে তার প্রায় ৩ থেকে ১৪ কেজি পর্যন্ত চর্বিবিহীন অংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেশি কমে গেলে দৈনন্দিন কাজেও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠা, হাঁটা কিংবা স্বাভাবিক শারীরিক কাজ আগের তুলনায় কঠিন মনে হতে পারে।

বয়স বাড়লে ঝুঁকি আরও বেশি
বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সে এমনিতেই বয়সজনিত পেশিক্ষয় হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এই অবস্থায় শরীরের চর্বিবিহীন অংশ আরও কমে গেলে পেশির শক্তি ও দৈহিক সক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পেতে পারে।
তবে শুধু বয়স্কদের জন্য নয়, যেকোনো বয়সের মানুষের জন্য অতিরিক্ত পেশিক্ষয় ক্ষতিকর হতে পারে। পেশি শরীরের শক্তি, হাড়ের দৃঢ়তা, ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত।
শুরুতে ব্যায়াম করতে হবে ধীরে
জিএলপি-১ ওষুধ গ্রহণের সময় অনেকের ক্ষুধা কমে যায়। বিশেষ করে ওষুধের মাত্রা সামঞ্জস্য করার শুরুর সময়ে বমিভাব, ক্লান্তি ও মাথা ঘোরার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এ কারণে হঠাৎ ভারী ব্যায়াম শুরু না করে তুলনামূলক কম মাত্রার ব্যায়াম দিয়ে শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে ব্যায়ামের মাত্রা ও ভার বাড়ানো উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তে তুলনামূলক ছোট পরিসরের ব্যায়াম দিয়ে শুরু করা ভালো। বসা থেকে ওঠা, স্কোয়াট ও ভার তোলার মতো এমন ব্যায়াম বেশি উপকারী হতে পারে, যেখানে শরীরের একাধিক অংশ একসঙ্গে কাজ করে।
সম্ভব হলে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের সহায়তায় ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যায়ামের পরিকল্পনা তৈরি করা সবচেয়ে ভালো। সাধারণভাবে সপ্তাহে তিন দিন শক্তিবর্ধক ব্যায়াম এবং আরও তিন দিন হাঁটা বা অন্য ধরনের সহনশীলতা বাড়ানোর ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

শুধু ব্যায়াম নয়, দরকার পর্যাপ্ত আমিষ
পেশি ধরে রাখা ও গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আমিষ গ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ২ গ্রাম আমিষ গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
যেমন, কারও ওজন যদি ৬৮ কেজি হয়, তাহলে তার প্রতিদিন প্রায় ৬৮ থেকে ৮২ গ্রাম আমিষ প্রয়োজন হতে পারে।
তবে শুধু মোট আমিষের পরিমাণই নয়, কখন তা খাওয়া হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধের কারণে ক্ষুধা কমে গেলে অনেকে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকেন। এতে শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি ও পুষ্টি না পাওয়ায় পেশিক্ষয় আরও বাড়তে পারে।
ব্যায়ামের আগে ও পরে খাবারের সময় গুরুত্বপূর্ণ
জিএলপি-১ ওষুধ হজমের গতি ধীর করতে পারে। তাই ব্যায়ামের এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ব্যায়ামের ঠিক আগে বেশি খাবার খেলে পেট ফাঁপা, বমিভাব বা পেটে ব্যথা হতে পারে।
ক্ষুধা কম থাকলে তরল খাবার তুলনামূলক সহজে গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন আমিষসমৃদ্ধ পানীয় বা ফলের সঙ্গে দইজাতীয় খাবার নেওয়া যেতে পারে।

ব্যায়াম শেষ হওয়ার পর ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যে শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ণাঙ্গ খাবার খেতে কষ্ট হলে আমিষ ও শর্করাযুক্ত ছোট খাবার নেওয়া যেতে পারে। ফলের সঙ্গে ঘন দই কিংবা দুধজাতীয় খাবার এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক সহজ বিকল্প হতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুমও জরুরি
শুধু ব্যায়াম ও খাবারের দিকে নজর দিলেই হবে না, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি হালকা হাঁটা বা সাইকেল চালানোর মতো কম মাত্রার নড়াচড়াও শরীরের কর্মক্ষমতা ও শক্তির মাত্রা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওজন কমানোর লক্ষ্য থাকলেও পেশি হারানোর বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়। কারণ শক্তিশালী পেশি শরীরের ভারসাম্য, হাড়ের স্বাস্থ্য, দৈনন্দিন চলাফেরা এবং দীর্ঘমেয়াদি জীবনমানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আরও গবেষণার প্রয়োজন
ওজন কমানোর জন্য জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে নতুন হওয়ায় এসব ওষুধ ব্যবহারকারীদের জন্য ঠিক কোন ধরনের ব্যায়াম, কতটা ব্যায়াম এবং কী ধরনের খাদ্যাভ্যাস সবচেয়ে কার্যকর—এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন কমানোর চিকিৎসার পাশাপাশি পেশি ধরে রাখার বিষয়টি শুরু থেকেই পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত। কারণ শুধু শরীরের ওজন কমানোই সুস্বাস্থ্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়; শক্তিশালী পেশি ধরে রাখাও সুস্থ ও স্বনির্ভর জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহার করলে নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ব্যায়ামের সময় ব্যথা হলে সঙ্গে সঙ্গে তা বন্ধ করতে হবে।
ওজন কমানোর সঙ্গে পেশি ধরে রাখার কৌশলই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার চাবিকাঠি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















