বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের পেশি দুর্বল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম এই স্বাভাবিক ক্ষয়ের গতি কমিয়ে শরীরকে আরও শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ ও কর্মক্ষম রাখতে পারে। বিশেষ করে ৬০ বছরের পর নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম দৈনন্দিন জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করার পাশাপাশি পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকিও কমাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থভাবে বার্ধক্যে পৌঁছাতে শুধু হাঁটা বা হালকা শরীরচর্চা যথেষ্ট নয়। পেশির শক্তি ধরে রাখার জন্য সপ্তাহে অন্তত দুই দিন শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও আগে থেকে থাকা শারীরিক সমস্যার ওপর ভিত্তি করে ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা নির্ধারণ করা উচিত।
বয়স বাড়লে কেন পেশির শক্তি কমে
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩০ বছর বয়সের পর প্রতি দশকে মানুষের পেশির পরিমাণ ৩ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। ৬০ বছর পার হওয়ার পর এই ক্ষয়ের গতি আরও বেড়ে যায়। বয়সের সঙ্গে পেশির এই ক্ষয়কে বলা হয় পেশিক্ষয়।
পেশি দুর্বল হয়ে গেলে হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা, চেয়ার থেকে ওঠা, ভারী জিনিস বহন করা কিংবা মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর নিজে উঠে দাঁড়ানোর মতো সাধারণ কাজও কঠিন হয়ে যেতে পারে। এর ফলে চলাফেরার স্বাধীনতা কমে এবং পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
:max_bytes(150000):strip_icc()/HDC-GettyImages-1218068202-d8a3b5d730cd42dea23e2108043e9eef.jpg)
হাড়ও হয় শক্তিশালী
শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের উপকার শুধু পেশিতে সীমাবদ্ধ নয়। পেশি যখন প্রতিরোধের বিরুদ্ধে কাজ করে, তখন হাড়ের ওপরও চাপ পড়ে। এই যান্ত্রিক চাপ হাড়ে নতুন খনিজ জমার প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করে। ফলে নিয়মিত প্রতিরোধমূলক ব্যায়াম হাড়ের ঘনত্ব ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই পেশি ও হাড়—দুটিকে একসঙ্গে শক্তিশালী রাখার জন্য শক্তিবর্ধক ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দামি যন্ত্রপাতির প্রয়োজন নেই
শক্তিবর্ধক ব্যায়াম শুরু করতে বাড়িতে আলাদা ব্যায়ামাগার বানানোর প্রয়োজন নেই। কম খরচে পাওয়া প্রতিরোধী ফিতা দিয়েই বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম করা সম্ভব।
প্রতিরোধী ফিতা ব্যবহার করে শরীরের বিভিন্ন অংশের পেশিতে নিয়ন্ত্রিত চাপ তৈরি করা যায়। এগুলো হালকা, সহজে সংরক্ষণ করা যায় এবং বিভিন্ন মাত্রার প্রতিরোধের জন্য ব্যবহার করা যায়।
যারা কিছুটা বেশি ওজন নিয়ে ব্যায়াম করতে সক্ষম, তারা হালকা ওজনের হাতের ভার বা পরিবর্তনযোগ্য ওজনের সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারেন। তবে শুরুতেই বেশি ওজন নেওয়া উচিত নয়।
কোন ব্যায়ামগুলো বেশি কার্যকর
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বাড়লেও কিছু মৌলিক নড়াচড়া নিয়মিত অনুশীলন করা উপকারী। বসা থেকে ওঠার মতো বসার ভঙ্গির ব্যায়াম, কোমর ও পায়ের পেশি কাজে লাগানো ভার তোলার অনুশীলন, শুয়ে বা বসে চাপ দেওয়ার ব্যায়াম এবং টানার ধরনের ব্যায়াম শরীরের শক্তি ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
তবে প্রতিটি ব্যায়াম নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে। প্রয়োজন হলে বসে ব্যায়াম করা, দেয়াল বা শক্ত কোনো স্থানের সহায়তা নেওয়া কিংবা হালকা প্রতিরোধ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভারসাম্য ও সমন্বয় ক্ষমতা বাড়ানোর ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে শুধু পেশির শক্তি নয়, হঠাৎ ভারসাম্য হারালে নিজেকে সামলে নেওয়ার ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আরও যেসব ব্যায়াম করা যায়
শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের পাশাপাশি চেয়ারভিত্তিক যোগব্যায়াম, ধীরগতির ভারসাম্যনির্ভর শরীরচর্চা, পানিতে ব্যায়াম, নমনীয়তা বাড়ানোর অনুশীলন এবং প্রতিরোধী ফিতা দিয়ে ব্যায়াম করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন পুরো শরীরের শক্তিবর্ধক ব্যায়াম যথেষ্ট হতে পারে। তবে প্রতিটি অনুশীলনের মধ্যে পর্যাপ্ত বিশ্রাম থাকা দরকার।
বয়সের কোনো সীমা নেই
অনেকে মনে করেন, বয়স বাড়লে ভার নিয়ে ব্যায়াম করা বিপজ্জনক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বিবেচনা করে সঠিক পদ্ধতিতে করলে বয়স্করাও ভার নিয়ে ব্যায়াম করতে পারেন।

শুরুতে প্রায় ২ কেজি ওজনের হালকা ভার ব্যবহার করে শরীরের প্রতিক্রিয়া বোঝা যেতে পারে। পরে সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে ওজন বাড়ানো যায়। ভারসাম্য নিয়ে সমস্যা থাকলে বসে ব্যায়াম করাও নিরাপদ বিকল্প হতে পারে।
নিয়মিত করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ধারাবাহিকতা। কয়েক সপ্তাহ কঠোরভাবে ব্যায়াম করে পরে বন্ধ করে দিলে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া কঠিন। বরং এমন একটি অনুশীলন বেছে নেওয়া উচিত, যা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত করা সম্ভব।
বয়স বাড়ার সঙ্গে ব্যায়ামের লক্ষ্য শুধু পেশি বড় করা নয়। বরং নিজের হাতে নাতি-নাতনিকে কোলে নেওয়া, ব্যাগ বহন করা, মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ানো, বাগানে কাজ করা, ভ্রমণ করা কিংবা সামান্য হোঁচট খেলে নিজেকে সামলে নেওয়ার মতো দৈনন্দিন সক্ষমতা ধরে রাখাই বড় উদ্দেশ্য।

ব্যায়াম শুরুর আগে সতর্কতা
নতুন করে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম শুরু করার আগে নিজের শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত ব্যায়াম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিশেষ করে ভারসাম্য, স্থিতিশীলতা এবং ওজন বহনের সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।
ব্যায়ামের সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও বাড়ির জায়গা ও বাজেট বিবেচনা করা উচিত। অনেক ক্ষেত্রেই দামি বড় যন্ত্রের বদলে কয়েকটি সহজ ও ছোট সরঞ্জাম দিয়েই কার্যকর অনুশীলন করা সম্ভব।
বয়স বাড়া মানেই শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া নয়। সঠিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে পেশি, হাড় ও ভারসাম্য অনেকটাই ধরে রাখা সম্ভব। তাই আরামদায়ক বার্ধক্যের জন্য শরীরচর্চাকে জীবনের নিয়মিত অংশ করে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















