৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের শরীরের ওজন ও দীর্ঘায়ু নিয়ে নতুন এক গবেষণায় এমন কিছু তথ্য উঠে এসেছে, যা প্রচলিত ধারণাকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু শরীরের ওজন বা উচ্চতা-ওজনের অনুপাত দিয়ে বয়স্ক মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিচার করা যথেষ্ট নাও হতে পারে। বরং কোমরের মাপ এবং পেটের ভেতরে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি সম্পর্কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিতে পারে।
গবেষণায় প্রায় ৭ হাজার ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে শরীরের ভরসূচক এবং কোমরের পরিধির পরিবর্তনের সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়।
স্বাভাবিক ওজনের চেয়ে কিছুটা বেশি ওজনে মৃত্যুঝুঁকি কম
গবেষণায় পুরুষদের মধ্যে যাদের শরীরের ভরসূচক ২৫ থেকে ২৯ দশমিক ৯-এর মধ্যে, অর্থাৎ যাদের অতিরিক্ত ওজন হিসেবে ধরা হয়, তাদের স্বাভাবিক ওজনের পুরুষদের তুলনায় মৃত্যুঝুঁকি ৪৬ শতাংশ কম ছিল।
নারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। অতিরিক্ত ওজনের নারীদের স্বাভাবিক ওজনের নারীদের তুলনায় মৃত্যুঝুঁকি ছিল ২৭ শতাংশ কম।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বেশি চর্বি থাকা বয়স্কদের দীর্ঘজীবী করে—গবেষকরা এমন কোনো কারণ-ফল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেননি। বরং গবেষণার ফলাফলকে সতর্কতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কোমরের মাপ বলছে ভিন্ন কথা

শরীরের ভরসূচকের ফলাফলের বিপরীতে কোমরের পরিধি নিয়ে গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।
যেসব পুরুষের কোমরের পরিধি ৪০ ইঞ্চির বেশি এবং যেসব নারীর কোমরের পরিধি ৩৫ ইঞ্চির বেশি, তাদের স্বল্পমেয়াদে মৃত্যুর ঝুঁকি নির্ধারিত সীমার নিচে থাকা ব্যক্তিদের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি ছিল।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শরীরের ভরসূচির হিসাব বিবেচনায় নেওয়ার পরও কোমরের অতিরিক্ত পরিধির সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকির এই সম্পর্ক বজায় ছিল।
শরীরের ভরসূচি সবকিছু বলে না
শরীরের ভরসূচি মূলত উচ্চতা ও ওজনের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হলেও একজন মানুষের শরীরে কতটা পেশি এবং কতটা চর্বি রয়েছে, তা এই সূচক জানাতে পারে না।
একই উচ্চতা ও ওজনের দুজন মানুষের শরীরের গঠন সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। একজনের পেশির পরিমাণ বেশি ও চর্বি কম হতে পারে, অন্যজনের পেশি কম কিন্তু চর্বি বেশি থাকতে পারে। অথচ দুজনের শরীরের ভরসূচি একই হবে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বয়স্কদের সাধারণত পেশির পরিমাণ কমতে থাকে, উচ্চতাও কিছুটা কমতে পারে এবং শরীরের কোথায় চর্বি জমছে, তাতেও পরিবর্তন আসে। ফলে স্বাভাবিক ওজনের একজন বয়স্ক মানুষের শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি চর্বি এবং কম পেশি থাকতে পারে।
পেটের ভেতরের চর্বি কেন বেশি উদ্বেগের?
পেটের গভীরে অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর চারপাশে যে চর্বি জমে, তাকে অভ্যন্তরীণ চর্বি বলা হয়। এই চর্বি শরীরে প্রদাহ, ইনসুলিনের কার্যকারিতায় সমস্যা এবং বিভিন্ন বিপাকীয় পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব পরিবর্তন হৃদ্রোগ ও রক্তে শর্করার রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কোমরের পরিধি এই ধরনের অতিরিক্ত চর্বির পরিমাণ সম্পর্কে একটি সহজ ধারণা দিতে পারে। এর জন্য বিশেষ কোনো যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না। বাড়িতেও নিয়মিত কোমরের মাপ নেওয়া সম্ভব।
সঠিকভাবে মাপতে পাঁজরের নিচের অংশ ও কোমরের হাড়ের ওপরের অংশের মাঝামাঝি জায়গা দিয়ে ফিতা জড়িয়ে নিতে হয়। ফিতাটি সমতল ও শরীরের সঙ্গে লাগানো থাকবে, তবে ত্বকে চাপ দিয়ে চেপে ধরা যাবে না।
কম ওজনও হতে পারে সতর্কতার সংকেত
গবেষণায় কম ওজনের বয়স্কদের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি দেখা গেছে। স্বাভাবিক ওজনের তুলনায় কম ওজনের পুরুষ ও নারীদের স্বল্পমেয়াদি মৃত্যুঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ ছিল।
এর একটি কারণ হতে পারে দুর্বলতা ও পেশিশক্তি কমে যাওয়া। বয়স বাড়ার সঙ্গে দৈনন্দিন কাজ, চলাফেরা এবং পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে পেশিশক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে এখানেও সরাসরি কারণ নির্ধারণ করা কঠিন। দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার কারণে যেমন ওজন ও পেশি কমতে পারে, তেমনি অনিচ্ছাকৃত ওজন কমে যাওয়া কোনো অন্তর্নিহিত অসুস্থতার সংকেতও হতে পারে।
বয়স্কদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ওজন কমানো নয়
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, বয়স বাড়ার পর শরীরের ওজনের নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা অর্জনের চেয়ে শরীর কতটা সুস্থ ও কার্যক্ষম রয়েছে, সেদিকে বেশি নজর দেওয়া উচিত।

একজন মানুষ স্বাধীনভাবে দৈনন্দিন কাজ করতে পারছেন কি না, নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় আছেন কি না এবং পেশিশক্তি ধরে রাখতে পারছেন কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সাঁতারের মতো নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও উপকারী হতে পারে। পর্যাপ্ত আমিষসমৃদ্ধ খাবারসহ সুষম পুষ্টিও গুরুত্বপূর্ণ।
কোমরের মাপ বাড়ছে কি না, নজর রাখুন
ওজন বা শরীরের ভরসূচিতে খুব বেশি পরিবর্তন না এলেও কোমরের মাপ ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। এটি পেটের অতিরিক্ত চর্বি জমার ইঙ্গিত হতে পারে।
অন্যদিকে কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমতে থাকলেও বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত ওজন কমে গেলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি।
শেষ পর্যন্ত সুস্থ ওজনের মূল্যায়ন শুধু দাঁড়িপাল্লার সংখ্যার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। শরীরের গঠন, কোথায় চর্বি জমছে, পেশিশক্তি, শারীরিক সক্ষমতা, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মতো বিভিন্ন বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করলেই একজন বয়স্ক মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















