ভোক্তা পণ্য খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার ব্যবসার পরিধি ছোট করে আরও বেশি মুনাফা ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল নিয়েছে। খাবারের ব্যবসা থেকে সরে এসে সৌন্দর্য, ব্যক্তিগত পরিচর্যা ও গৃহস্থালি পণ্যে বেশি মনোযোগ দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্যের ব্যবধান কমাতে চাইছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ডাভ সাবান, অ্যাক্স সুগন্ধি ও সিফ পরিষ্কারক পণ্যের নির্মাতা ইউনিলিভারের বর্তমান বাজারমূল্য প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, মূল পরিচালন আয়ের তুলনায় ইউনিলিভারের প্রতিষ্ঠানের মূল্য প্রায় ১১ দশমিক ৫ গুণ। বিপরীতে প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলের ক্ষেত্রে তা ১৪ দশমিক ৮ গুণ, লরিয়ালের ১৭ দশমিক ৫ গুণ এবং কোকা-কোলার ২২ দশমিক ৭ গুণ।
এ ব্যবধানের অর্থ হলো, বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষাকৃত কম বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং নির্দিষ্ট খাতে শক্ত অবস্থান থাকা ভোক্তা পণ্য প্রতিষ্ঠানকে বেশি মূল্য দিতে আগ্রহী।
খাবারের ব্যবসা থেকে বড় ধরনের সরে আসা

ইউনিলিভার গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের মসলা প্রস্তুতকারক ম্যাককরমিকের সঙ্গে নিজেদের খাবারের ব্যবসা একীভূত করার জন্য প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করে। এর ফলে ইউনিলিভারের হাতে নতুন সম্মিলিত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ শতাংশ অংশীদারি থাকবে এবং ইউনিলিভারের শেয়ারধারীরা সম্মিলিত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫৫ শতাংশ মালিকানা পাবেন।
তবে এই চুক্তির ফলে তুলনামূলক বেশি মুনাফা করা খাবারের ব্যবসায় ইউনিলিভারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে। তাই সৌন্দর্য, ব্যক্তিগত পরিচর্যা ও গৃহস্থালি পণ্যের দ্রুততর প্রবৃদ্ধি দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে।
বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ এখন প্রমাণ দেখতে চাইছেন। তাদের আশঙ্কা, এর আগেও অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা পুনর্গঠনের ঘোষণা দিলেও প্রত্যাশিত পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত আসেনি। ফলে ইউনিলিভারের ক্ষেত্রেও দীর্ঘস্থায়ী উন্নতি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বাজার সতর্ক অবস্থানে থাকতে পারে।
প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল দেখিয়েছে পথ
বহু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গত কয়েক দশকে ব্যবসার কাঠামো সরল করেছে। উদ্দেশ্য ছিল অতিরিক্ত জটিলতার কারণে যে মূল্যছাড় তৈরি হয়, তা দূর করা এবং পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো।
এই প্রবণতা এখন ভোক্তা পণ্য খাতেও স্পষ্ট। একসময় বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও ব্যবসায় বিস্তৃত উপস্থিতিকে প্রতিষ্ঠানের শক্তি হিসেবে দেখা হতো। এতে ভোক্তার পছন্দ বদলে গেলেও একটি ব্যবসার অন্যটি ক্ষতি সামলে নিতে পারত। কিন্তু এখন বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট খাতে নেতৃত্ব দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল এ ক্ষেত্রে ইউনিলিভারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। টাইডের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি খাবারের ব্যবসা থেকে সরে এসে নিজেদের ব্র্যান্ডের সংখ্যা কমিয়ে কাঠামো সরল করেছিল। পরবর্তী সময়ে তারা শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলক বেশি বাজারমূল্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

ইউনিলিভারের বর্তমান নেতৃত্বও সেই পথেই এগোচ্ছে। খাবারের ব্যবসা থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে সৌন্দর্য ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার মতো তুলনামূলক দ্রুত বাড়তে থাকা খাতকে ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এক দশকের বাজারমূল্যের সংকট
ইউনিলিভারের বিক্রয় প্রবৃদ্ধির ওপর কয়েক বছর ধরেই প্যাকেটজাত খাবারের ব্যবসা চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মহামারির পর এই খাতে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়েছে।
খাবারের ব্যবসা থেকে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর অবশ্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইউনিলিভার নিয়ে আগ্রহ কিছুটা বেড়েছে। এখন তাদের মূল প্রশ্ন ব্যবসার কাঠামো বদলানো নয়, বরং নতুন কাঠামো কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েক প্রান্তিকে ইউনিলিভারের ফলাফলেও উন্নতির ইঙ্গিত মিলেছে। জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, তাদের পণ্যের বিক্রয় পরিমাণ এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তবে ম্যাককরমিকের সঙ্গে একীভূত প্রতিষ্ঠানে অংশীদারি থাকার কারণে ইউনিলিভারের বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখনো ধীরগতির খাবারের ব্যবসার সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকবেন। এ নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।
এখন ফল দেখানোর পালা
ইউনিলিভারের সামনে তাই মূল চ্যালেঞ্জ হলো নতুন ব্যবসায়িক কাঠামোকে বাস্তব সাফল্যে পরিণত করা। খাবারের ব্যবসা থেকে সরে এসে যদি সৌন্দর্য, ব্যক্তিগত পরিচর্যা ও গৃহস্থালি পণ্যে বিক্রয় এবং মুনাফার প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়ানো যায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্যও বাড়তে পারে।
ইউনিলিভারের প্রধান নির্বাহী ফের্নান্দো ফের্নান্দেসের মতে, প্রতিটি প্রান্তিকে ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল দেখাতে পারলে এবং ম্যাককরমিকের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সময় যত এগিয়ে আসবে, ততই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মূল্য বাজারের সামনে স্পষ্ট হবে।
অর্থাৎ ইউনিলিভারের নতুন দর্শন এখন অনেকটাই—ব্যবসা কম, কিন্তু মনোযোগ বেশি। সেই কৌশল বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে কি না, তার উত্তর মিলবে আগামী কয়েক প্রান্তিকের ফলাফলে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















