কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের দক্ষতা নিয়ে কর্মীদের মিথ্যা বলার প্রবণতা আগের তুলনায় কমেছে। তবে এর বদলে তৈরি হয়েছে আরও বড় একটি সমস্যা—নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, অনেক কর্মী মনে করছেন তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে যথেষ্ট দক্ষ, যদিও বাস্তবে এর ব্যবহার থেকে প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশিত সময় ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই হাজারের বেশি কর্মীর ওপর পরিচালিত এক জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। এক বছর আগে ৪৫ দশমিক ২ শতাংশ কর্মী জানিয়েছিলেন, তারা কোনো সভায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে নিজেদের জ্ঞান বাস্তবের চেয়ে বেশি দেখানোর চেষ্টা করেছেন। এ বছর সেই হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৩ শতাংশে।
একইভাবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি কাজ নিজেদের কাজ হিসেবে উপস্থাপনের কথা স্বীকার করা কর্মীর হার ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ।
আত্মবিশ্বাস বাড়লেও দক্ষতার প্রমাণ কম
জরিপের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ৯০ শতাংশ কর্মী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে নিজেদের আত্মবিশ্বাসী মনে করেন। অথচ মাত্র ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রথমবারেই তাদের প্রত্যাশামতো কাজ করে।
প্রায় অর্ধেক কর্মী জানিয়েছেন, কোনো কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দিয়ে করানোর চেষ্টা করতে গিয়ে তারা এমন সময় ব্যয় করেছেন, যত সময়ে কাজটি নিজেরাই হাতে করলে শেষ করতে পারতেন।
এক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর মতে, কর্মীরা এখন আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে দক্ষতার ভান করার প্রয়োজন বোধ করছেন না। কারণ তারা সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে তারা এটি ভালোভাবে আয়ত্ত করেছেন। ফলে মিথ্যা বলার প্রবণতা কমলেও আত্মমূল্যায়নে ভুলের ঝুঁকি বেড়েছে।
প্রতিষ্ঠানের হিসাবের সঙ্গে মিলছে না আত্মবিশ্বাস
কর্মীদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বাস্তব আর্থিক ফলাফলের বড় ধরনের ব্যবধানও দেখা যাচ্ছে।
কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি ৫০ হাজার কর্মী নিয়মিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন, তাহলে বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হওয়ার কথা। সেই হিসাবে প্রতি মাসে কয়েক লাখ কর্মঘণ্টা বাঁচার পাশাপাশি কয়েক মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ ব্যয় কমার প্রত্যাশা করা যায়। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান সেই মাত্রার সাশ্রয় দেখতে পাচ্ছে না।
কর্মীরা মনে করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের সময় বাঁচাচ্ছে। কিন্তু সেই সময় সাশ্রয় সরাসরি ব্যবসার আয়, উৎপাদনশীলতা বা ব্যয় কমানোর সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত—তার স্পষ্ট হিসাব অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছেই নেই।
এর পেছনে মানুষের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল বিচার করার প্রবণতাও কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সামান্য ভুল করলেও মানুষ সেটিকে বড় করে দেখে। অথচ একই ধরনের ভুল মানুষ আরও বেশি হারে করলেও তা অনেক সময় স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ কর্মী মনে করেন, প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো জ্যেষ্ঠ নেতা প্রকাশ্যে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কৌশলের পক্ষে কথা বলেন, সেটি তিনি নিজেই পুরোপুরি বোঝেন না।
নিজেদের জ্ঞানই তুলে দিচ্ছেন যন্ত্রের হাতে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় প্রভাব শুধু কাজের গতি বাড়ানো নয়, কর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে যন্ত্রের মধ্যে স্থানান্তর করাও।
অনেক প্রতিষ্ঠান এমন ব্যবস্থা তৈরি করছে, যেখানে কর্মীদের অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি এবং কাজের প্রক্রিয়া এক জায়গায় সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেকটা অভিজ্ঞ কর্মীর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
কিন্তু এখানেই কর্মীদের জন্য তৈরি হচ্ছে বড় ঝুঁকি। কোনো প্রতিষ্ঠানে আগে একটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে যদি ১০ জন কর্মীর প্রয়োজন হতো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই দলের সম্মিলিত জ্ঞান আয়ত্ত করার পর হয়তো তিনজন কর্মী দিয়েই একই কাজ করা সম্ভব হবে।
অর্থাৎ কর্মীরা যত বেশি নিজেদের জ্ঞান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শেখাবেন, ভবিষ্যতে নিজেদের প্রয়োজনীয়তা ততটাই কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব কাজ তুলনামূলকভাবে নিয়মতান্ত্রিক এবং সহজে স্বয়ংক্রিয় করা যায়, সেসব পেশায় থাকা কর্মীদের জন্য এই পরিবর্তন আরও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে সমাধান হবে না
প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ভালোভাবে শেখাতে প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেয়। কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী কর্মীরা নিজেদের আরও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে বলে মনে নাও করতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন নতুন কর্মীকে যেমন প্রতিষ্ঠানের কাজ, নিয়ম ও সংস্কৃতি বুঝতে কয়েক মাস সময় দেওয়া হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও তেমনভাবে প্রতিষ্ঠানের বাস্তব কাজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় দিতে হবে।
জরিপে কর্মীরাও আলাদা প্রশিক্ষণের চেয়ে দৈনন্দিন ব্যবহৃত কর্মপ্রযুক্তির সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরও ভালো সমন্বয়কে বেশি কার্যকর বলে মনে করেছেন। পাশাপাশি কাজের সময় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সরাসরি ব্যবহৃত ব্যবস্থার মধ্যেই পাওয়া গেলে তা বেশি উপকারী হবে বলে তারা মনে করেন।
কারণ অনেক ক্ষেত্রে প্রদর্শনীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থা চমৎকারভাবে কাজ করলেও বাস্তবে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, অনুমতি ও তথ্য ব্যবহারের নিয়মের কারণে সেটি আটকে যায়।
ফলে একটি কাজের জন্য একটি ব্যবস্থা, আরেকটি কাজের জন্য অন্য ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। এতে কর্মীদের সামনে তৈরি হয় জটিল ও বিচ্ছিন্ন প্রযুক্তির পরিবেশ। শেষ পর্যন্ত অনেকে পুরোনো পদ্ধতিতেই ফিরে যান।

তরুণ প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসই সবচেয়ে বেশি
প্রজন্মভিত্তিক তথ্যেও আত্মবিশ্বাস ও প্রকৃত দক্ষতার ব্যবধান স্পষ্ট।
তরুণ প্রজন্মের ৯৪ দশমিক ১ শতাংশ কর্মী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে আত্মবিশ্বাসী। একই সঙ্গে এই প্রজন্মের ৪৫ শতাংশ স্বীকার করেছেন, তারা নিজেদের প্রকৃত দক্ষতার চেয়ে বেশি দক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
প্রবীণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১৩ শতাংশ।
তরুণদের অতিরিক্ত দক্ষতার দাবি শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাদের ৩১ শতাংশ জানিয়েছেন, অতিরঞ্জিত দক্ষতার কারণে কর্মক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ভুল, কাজের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়া, ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা সহকর্মীদের আস্থা হারানোর মতো ঘটনাও রয়েছে। প্রবীণ কর্মীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ৭ শতাংশ।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এটি মানুষকে কতটা দক্ষ করে তুলবে—তা নয়; বরং মানুষ নিজের দক্ষতা সম্পর্কে কতটা বাস্তব ধারণা রাখতে পারবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি একই কাজ কমসংখ্যক কর্মী দিয়ে করিয়ে দিতে পারে, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী কমাবে, নাকি একই সংখ্যক কর্মী দিয়ে আরও বেশি পণ্য ও সেবা তৈরি করবে—তার উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে একটি বিষয় ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শুধু প্রযুক্তি শেখাই যথেষ্ট নয়। কোন কাজ যন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়া নিরাপদ, কোথায় মানুষের সিদ্ধান্ত অপরিহার্য এবং নিজের দক্ষতার সীমা কোথায়—এই তিনটি বিষয় বুঝতে পারাটাই কর্মীদের জন্য ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কর্মীরা হয়তো এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আগের মতো মিথ্যা বলছেন না। কিন্তু নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে অতিরিক্ত বিশ্বাস তৈরি হলে সেই আত্মবিশ্বাসই ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















